ডারউইনে ইতিহাস: অস্ট্রেলিয়া বধ ৯ উইকেটে!

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: ডারউইনের মারারা ক্রিকেট মাঠে রচিত হল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়।
- অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই দেশে প্রথমবার টেস্টে হারাল বাংলাদেশ।
- চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় অধিবেশন পর্যন্তও ম্যাচ গড়াল না।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: ডারউইনের মারারা ক্রিকেট মাঠে রচিত হল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এক উজ্জ্বলতম অধ্যায়। অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই দেশে প্রথমবার টেস্টে হারাল বাংলাদেশ। চতুর্থ দিনের দ্বিতীয় অধিবেশন পর্যন্তও ম্যাচ গড়াল না। মাত্র ৫৭ রানের লক্ষ্য এক উইকেট হারিয়ে পেরিয়ে গিয়ে নয় উইকেটের স্মরণীয় জয় তুলে নিল সফরকারীরা। এই জয়ের দুই প্রধান কারিগর হাসান মাহমুদ ও মেহিদী হাসান মিরাজ। প্রথম ইনিংসে মাহমুদের আগুনে গতির পর দ্বিতীয় ইনিংসে মেহিদীর ঘূর্ণিতেই ভেঙে পড়ল অস্ট্রেলিয়া।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটি বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট জয়। শুধু তা-ই নয়, টেস্ট ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর নজিরও আগে ছিল না বাংলাদেশের। দুই টেস্টের সিরিজে এখন ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল তারা। বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের নিরিখেও এই জয়ের গুরুত্ব অপরিসীম।
অস্ট্রেলিয়া টসে জিতে প্রথমে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু শুরু থেকেই তাদের হিসাব এলোমেলো করে দেন হাসান মাহমুদ। নিখুঁত লাইন, নিয়ন্ত্রিত গতি এবং সামান্য নড়াচড়ায় তিনি একের পর এক অস্ট্রেলীয় ব্যাটারকে ফিরিয়ে দেন। মাত্র ৫৫ রান দিয়ে ছয় উইকেট নেন বাংলাদেশের ডানহাতি পেসার। তাঁর টেস্ট জীবনের সেরা বোলিংয়ে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস শেষ হয়ে যায় মাত্র ১৯৮ রানে।
বাংলাদেশের জবাব ছিল আরও চমকপ্রদ। অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বমানের বোলিং আক্রমণের সামনে কোনও রকম সংকোচ না দেখিয়ে ৪২৬ রান তোলে তারা। ওপেনার তানজিদ হাসান করেন ১০১ রান। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে কোনও বাংলাদেশি ব্যাটারের এটিই প্রথম টেস্ট শতরান। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত করেন ৮৪ এবং মেহিদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকে আসে মূল্যবান ৬৫ রান। জশ হ্যাজলউড ছয় উইকেট নিলেও বাংলাদেশকে ২২৮ রানের বিরাট প্রথম ইনিংসের অগ্রগতি নেওয়া থেকে আটকাতে পারেননি।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া প্রতিরোধ গড়ার চেষ্টা করেছিল। বিশেষত ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের ইনিংস ম্যাচে স্বাগতিকদের আশা বাঁচিয়ে রেখেছিল। কিন্তু অপর প্রান্তে নিয়মিত ব্যবধানে উইকেট পড়তে থাকে। প্রথম ইনিংসে পেসের সামনে বিপর্যস্ত অস্ট্রেলিয়া এবার মেহিদীর ঘূর্ণির উত্তর খুঁজে পায়নি।
মেহিদী ৬৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নেন। তাঁর শিকারদের মধ্যে ছিলেন স্টিভ স্মিথ, অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স এবং নাথান লায়ন। ক্যারি ৩০ রান করার পর মেহিদীর বলে লিটন দাসের হাতে ধরা পড়েন। ওয়েবস্টারকে বোল্ড করার পর কামিন্সকেও দ্রুত ফেরান বাংলাদেশের অলরাউন্ডার। শেষ ব্যাটার লায়নকে এলবিডব্লিউ করে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস ২৮৪ রানে শেষ করেন তিনিই। মেহিদীর দ্বিতীয় ইনিংসের পাঁচ উইকেট নিশ্চিত করে দেয় বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য থাকবে মাত্র ৫৭ রান।
হাসান মাহমুদ দ্বিতীয় ইনিংসে আরও তিনটি উইকেট নেন। ম্যাচে তাঁর মোট শিকার নয়টি। গ্রিনকে ১০৪ রানে বোল্ড করে অস্ট্রেলিয়ার শেষ প্রতিরোধও ভেঙে দেন তিনি। প্রথম ইনিংসের ছয় উইকেটের সঙ্গে দ্বিতীয় ইনিংসের তিন উইকেট যোগ করে ম্যাচসেরার সম্মানও পান মাহমুদ।
ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে অবশ্য সামান্য ধাক্কা খেয়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসের শতরানকারী তানজিদ শূন্য রানে হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হন। তখন বাংলাদেশের রান চার। মিচেল স্টার্ক ও হ্যাজলউড চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করলেও শাদমান ইসলাম এবং মোমিনুল হক কোনও অঘটন ঘটতে দেননি। ধৈর্য ধরে নতুন বলের বিপদ কাটিয়ে তাঁরা দলকে জয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান।
শেষ পর্যন্ত বিউ ওয়েবস্টারের বল পয়েন্টের পিছন দিয়ে চার মেরে ঐতিহাসিক জয় নিশ্চিত করেন মোমিনুল। বাংলাদেশ শিবির তখন উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে। ডারউনের গ্যালারিতে উপস্থিত বাংলাদেশের সমর্থকদের উৎসবও ছিল দেখার মতো। অস্ট্রেলীয় ক্রিকেটারেরা এগিয়ে এসে বিজয়ীদের অভিনন্দন জানালেও তাঁদের মুখে ছিল গভীর হতাশা।
এটি কোনও আকস্মিক অঘটন নয়। চার দিন ধরে ব্যাটিং, বোলিং এবং মানসিক দৃঢ়তা—তিন ক্ষেত্রেই অস্ট্রেলিয়াকে ছাপিয়ে গেছে বাংলাদেশ। মাহমুদের গতি, মেহিদীর ঘূর্ণি, তানজিদের শতরান এবং শান্ত–মোমিনুলদের সংযম মিলিয়ে এসেছে এই জয়। ডারউনের ইতিহাস তাই শুধু একটি টেস্ট জয়ের কাহিনি নয়; বিদেশের কঠিন পরিবেশে নির্ভীক ও পরিণত বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশের ঘোষণাও।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



