মায়ের কান্না, কোলে ভাই: হিমাংশির শৈশব

যা জানা জরুরি
- শৈশব তাঁর কাছে ছিল না নিশ্চিন্ত বিকেল, পরিবারের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কিংবা নিরাপদ ঘর।
- বরং সেই সময়ের স্মৃতিতে মিশে আছে ক্ষুধা, আতঙ্ক, অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা আর মাকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা।
- অভিনেত্রী ও গায়িকা হিমাংশি খুরানা সম্প্রতি নিজের জীবনের সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
শৈশব তাঁর কাছে ছিল না নিশ্চিন্ত বিকেল, পরিবারের সঙ্গে হাসিখুশি সময় কিংবা নিরাপদ ঘর। বরং সেই সময়ের স্মৃতিতে মিশে আছে ক্ষুধা, আতঙ্ক, অন্ধকারে লুকিয়ে থাকা আর মাকে বাঁচানোর মরিয়া চেষ্টা। অভিনেত্রী ও গায়িকা হিমাংশি খুরানা সম্প্রতি নিজের জীবনের সেই ভয়াবহ অধ্যায়ের কথা প্রকাশ্যে এনেছেন। তাঁর দাবি, মদ্যপ বাবা প্রায়ই মাকে মারধর করতেন। বাড়িতে অশান্তি শুরু হলেই ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে পালিয়ে যেতেন তিনি।
পারস ছাবড়ার পডকাস্টে হিমাংশি জানান, ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের অশান্ত দাম্পত্যের সাক্ষী ছিলেন তিনি। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরেই অনেক সময় দেখতে পেতেন, ঘরে তুমুল ঝামেলা চলছে। কোনও দিন রান্না হয়েছে, কোনও দিন হয়নি। কখনও আবার বাড়িতে প্রয়োজনীয় বাজারটুকুও থাকত না। ফলে তাঁকে এবং তাঁর ছোট ভাইকে না খেয়েই থাকতে হত।
হিমাংশির কথায়, “আমরা অনেক দিন টিফিন ছাড়াই স্কুলে যেতাম। কখনও মা কিছু টাকা দিলে ক্যান্টিনে খেতাম। আবার স্কুল থেকে ফিরে দেখতাম, বাড়িতে খাবার নেই—কারণ বাজারই করা হয়নি।”
তবে অভাবের থেকেও ভয়াবহ ছিল মায়ের উপর শারীরিক নির্যাতন। হিমাংশির অভিযোগ, তাঁর বাবা প্রায়ই মদ্যপ থাকতেন। কখন পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে উঠবে, তার কোনও নিশ্চয়তা ছিল না। তাঁর দাবি, “বাবা মাকে এত মারতেন যে মা কখনও অচেতন হয়ে পড়তেন। একবার তাঁর হাতও ভেঙে দিয়েছিলেন।”
মারধর শুরু হলেই শিশুকন্যা হিমাংশির সামনে যেন একটাই দায়িত্ব এসে দাঁড়াত—মাকে বাঁচানো এবং ভাইকে নিরাপদে রাখা। ছোট ভাইকে কোলে নিয়ে তিনি ছুটে বেরিয়ে যেতেন বাড়ি থেকে। রাস্তায় যাঁকেই পেতেন, তাঁকেই ডেকে এনে মাকে সাহায্য করার অনুরোধ করতেন। কখনও আবার ভাইকে নিয়ে বাড়ির কোনও অন্ধকার কোণে চুপ করে বসে থাকতেন।
যে বয়সে একটি শিশুর নিজের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার কথাই নয়, সেই বয়সেই হিমাংশিকে ভাইয়ের দেখাশোনা করতে এবং মায়ের জন্য সাহায্য খুঁজতে হয়েছিল। শৈশবেই যেন তাঁর কাঁধে এসে পড়েছিল এক প্রাপ্তবয়স্কের দায়িত্ব।
তবে এই যন্ত্রণার কথা বহু বছর প্রকাশ্যে বলেননি তিনি। পুরনো সাক্ষাৎকারে বরং নিজেকে ‘খুব ভালো পরিবার’ থেকে আসা বলে বর্ণনা করতেন। পরিবারের ভেতরের কষ্টকে আড়াল করাই তখন তাঁর কাছে সহজ ছিল।
কিন্তু সেই শৈশবই পরবর্তী জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় স্বপ্নটিকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল—একটি শান্ত, নিরাপদ বাড়ি। হিমাংশি জানিয়েছেন, ছোটবেলায় প্রায়ই ভাবতেন, একদিন তাঁর নিজের একটি বাড়ি হবে, যেখানে কোনও চিৎকার থাকবে না, কোনও হিংসা থাকবে না। তাঁর কথায়, “তখন ভাবতাম, এক দিন আমার নিজের একটা বাড়ি হবে, যেখানে শান্তি থাকবে। আজ সেই বাড়ি আমার রয়েছে।”
তবু পুরনো ক্ষত যে পুরোপুরি শুকোয়নি, তাঁর কথাতেই তার ইঙ্গিত মেলে। এখনও উচ্চস্বরে কথা বলা, ঝগড়া কিংবা চিৎকার তিনি সহ্য করতে পারেন না। নিজের বাড়িতেও মৃদু আলো ও নীরবতা পছন্দ করেন। কারণ, ছোটবেলায় এত শব্দ, হিংসা ও আতঙ্কের মধ্যে বড় হয়েছেন যে এখন কারও গলা সামান্য উঁচু হলেই তাঁর অস্বস্তি শুরু হয়ে যায়।
কিশোরী বয়সেই মডেলিংয়ে পা রাখেন হিমাংশি। ‘মিস লুধিয়ানা’ খেতাব জয়ের পর পঞ্জাবি ছবি ও গানের ভিডিয়োয় পরিচিতি তৈরি করেন। পরে ‘বিগ বস ১৩’-এ অংশ নিয়ে সারা দেশের দর্শকের কাছে আরও পরিচিত হয়ে ওঠেন।
সাফল্যের ঝলমলে জীবনের আড়ালে যে এত গভীর শৈশবের ক্ষত লুকিয়ে ছিল, এত বছর পর সেই গল্প নিজেই সামনে আনলেন হিমাংশি। তাঁর কাছে তাই নিজের বাড়ি শুধু একটি ঠিকানা নয়—শৈশবের আতঙ্ককে পেরিয়ে নিজের হাতে তৈরি করা এক টুকরো নিরাপদ পৃথিবী।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



