কিরণ পাহাল, প্রাচী চৌধুরী, এম আর পুভাম্মা এবং ভিথ্যা রামরাজ—চার জনের পথ ছিল আলাদা। সেই পথ এসে মিলল এক গন্তব্যে: ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমসে অ্যাথলেটিক্সে ভারতের একমাত্র সোনা।

দেশের চার প্রান্ত থেকে উঠে আসা চার নারী। প্রত্যেকের কাঁধে আলাদা প্রত্যাশার ভার। মঙ্গলবার নাগোয়ার মিজুহো পার্কে তাঁরাই ভারতকে এনে দিলেন এবারের এশিয়ান গেমসের ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে প্রথম এবং একমাত্র সোনার পদক। ৩ মিনিট ২৯.৬৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করে মেয়েদের ৪×৪০০ মিটার রিলের খেতাব পুনরুদ্ধার করল ভারত।

গত বার হাংঝৌয়ে ভারতকে হারিয়ে সোনা জিতেছিল চিন। এ বার এই চার জন দেখিয়ে দিলেন, কেন এশিয়ান গেমসের মেয়েদের ৪×৪০০ মিটার রিলেতে ভারতকে বরাবর সোনা জয়ের অন্যতম দাবিদার ধরা হয়। এই ইভেন্টে এশিয়াডের সপ্তম সোনা এল ভারতের ঘরে।

এখনও পর্যন্ত এবারের গেমসে ভারতের সবচেয়ে সফল দিনটিকে পূর্ণতা দিল এই জয়।

মাত্র দশ দিন আগেও অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন নীরু ধান্দা। এ দিন মেয়েদের ট্র্যাপ শুটিংয়ে সোনা জিতলেন তিনি। মিক্সড ৪×১০০ মিটার রিলেতে প্রথম বার পদক পেল ভারত। আগেই দু’টি রুপো জেতা গুলবীর সিংহ তাঁর সংগ্রহে যোগ করলেন একটি ব্রোঞ্জ। হাইজাম্প থেকেও এল ব্রোঞ্জ। গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়ে ফাইনালে পৌঁছলেন ভারতীয় বক্সাররাও।

বৃষ্টিতে ভিজে গিয়েছিল ট্র্যাক। কিন্তু ভারতের চার নারীকে ছুটতে হত সোনার লক্ষ্যে। সেই সোনায় পৌঁছনোর পথ অবশ্য মোটেই সহজ ছিল না।

শুরুতে কিরণের গতি ছিল কিছুটা মন্থর। তৃতীয় স্থানে থেকে তিনি ব্যাটন তুলে দেন পুভাম্মার হাতে। ব্যাটন নিয়েই ব্যবধান কমানোর কাজে নেমে পড়েন পুভাম্মা। তাঁর কথায়, প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠছিল সাম্প্রতিক লড়াইয়ের নানা ছবি। ডোপিংয়ের জন্য নির্বাসন। মানসিক অবসাদ। একা একা ফিরে আসার সংগ্রাম।

মনে পড়ছিল স্বামীর কথা। নিজের চাকরি সামলেও যিনি তাঁর অনুশীলনের কর্মসূচি দেখভাল করেছেন, তাঁর জন্য রান্না করেছেন। মনে পড়ছিল মায়ের কথা। মেয়ে যাতে অন্য কোনও চিন্তা ছাড়াই অনুশীলন করতে পারেন, সে জন্য মা চলে এসেছিলেন পুণেতে।

পুভাম্মা বললেন, “যখন ওই সমস্যাগুলোর মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন আমি ভীষণ অবসাদে ভুগতাম। কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে গিয়েছি, বলে বোঝাতে পারব না। আমার পরিবার আর আমার স্বামীই পাশে ছিল।”

২০১৪ এবং ২০১৮ সালের এশিয়ান গেমসে রিলেতে সোনা জিতেছিলেন এই অভিজ্ঞ দৌড়বিদ। এক দশকেরও বেশি সময়ের অভিজ্ঞতাকে সম্বল করে তিনি ভারতকে টেনে আনলেন পদকের লড়াইয়ে। বুঝিয়ে দিলেন, ৩৬ বছর বয়সেও তাঁর গতি কমেনি।

প্রাচী যখন ব্যাটন হাতে নিলেন, ভারত তখন এগিয়ে। সেই ব্যবধান ধরে রেখে তিনি ছুটলেন সোনার দিকে। আর সেই সোনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ডিএসপি হওয়ার স্বপ্নের দিকে।

সাহারানপুরের এক কৃষকের মেয়ে প্রাচী চৌধুরী। উত্তরপ্রদেশ পুলিশে ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট অব পুলিশ বা ডিএসপি পদে চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন তাঁকে বরাবর এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছে। নাগোয়া রওনা হওয়ার আগেই উর্দির জন্য নিজের মাপ দিয়ে এসেছিলেন তিনি—আশা ছিল, এ বার স্বপ্ন সত্যি হবে।

“গত বার শুধু রুপো জিতেছিলাম বলে সুযোগটা হাতছাড়া হয়েছিল,” বললেন প্রাচী। “নাগোয়া আসার আগে উর্দির জন্য মাপ দিয়ে এসেছি।”

প্রাচীকে নিজের দিকে ছুটে আসতে দেখে ভিথ্যার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গিয়েছিল। এই গেমসেই মেয়েদের ৪০০ মিটার হার্ডলসে পি টি ঊষার চার দশক পুরনো জাতীয় রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি। ৫৪.৭৫ সেকেন্ড সময় করে জিতেছেন ব্রোঞ্জ। ৪×৪০০ মিটার মিক্সড রিলেতে পেয়েছেন রুপো। এ বার আরও একটি দায়িত্ব শেষ করতে হবে।

এগিয়ে থাকা অবস্থাতেই শেষ ল্যাপে দৌড় শুরু করলেন ভিথ্যা। কিন্তু তত ক্ষণে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করেছেন বাহরিনের সালওয়া ঈদ নাসের। সবার শেষে ব্যাটন হাতে পেয়েও দুরন্ত গতিতে একের পর এক প্রতিদ্বন্দ্বীকে পিছনে ফেলছিলেন নাসের। কমিয়ে আনছিলেন ব্যবধান।

চাপ বাড়ছিল। বাহরিনের দৌড়বিদ যে ক্রমেই কাছে চলে আসছেন, তা বুঝতে পারছিলেন ভিথ্যা। মনে ঢুকে পড়ছিল সংশয়।

“নিজেকে বললাম, ‘ভিথ্যা, এটাই এই মরসুমে তোমার শেষ দৌড়। ঝাঁপিয়ে পড়ো। যা-ই হোক, ভিথ্যা, ফিনিশ লাইন পর্যন্ত তোমাকে লড়ে যেতেই হবে। ওরা তিন জনই ভাল করেছে, এ বার তোমার পালা।’ তাই সর্বশক্তি দিয়ে ছুটলাম,” বললেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত এগিয়েই থাকলেন ভিথ্যা।

নাসের যত কাছে আসছিলেন, ভিথ্যা ততই নিজেকে ঠেলে দিচ্ছিলেন ফিনিশ লাইনের দিকে। হার মানতে রাজি ছিলেন না। বৃষ্টি পড়ছিল তখনও। ব্যবধানও কমছিল। কিন্তু ভারতকে ৩ মিনিট ২৯.৬৯ সেকেন্ডে দৌড় শেষ করিয়ে সোনা এনে দেওয়ার মতো শক্তি অবশিষ্ট ছিল ভিথ্যার। বাহরিন দ্বিতীয় হল, চিন তৃতীয়।

চার নারীর ক্রীড়াজীবন গড়ে উঠেছে চার রকমের সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। ফিনিশ লাইনে এসে তাঁরা পেলেন এক অভিন্ন পুরস্কার। কেরিয়ারের সবচেয়ে কঠিন সময় পেরিয়ে ফিরে এসেছেন পুভাম্মা। কিরণের আশা, এই পদক পরিবারের জন্য তাঁর কাঁধে থাকা দায়িত্বের ভার কিছুটা লাঘব করবে। দীর্ঘদিনের স্বপ্নের দিকে আরও এক ধাপ এগোলেন প্রাচী। আর প্রবল চাপের মুখেও লড়ে যাওয়ার আরও একটি মুহূর্ত খুঁজে পেলেন ভিথ্যা।

চার নারী। চারটি যাত্রাপথ। একটি রিলে তাঁদের এক সুতোয় বাঁধল। আর ভারতকে ফিরিয়ে আনল এশিয়ান গেমসের রিলে পোডিয়ামের শীর্ষে।