হাইলাইটস
- এগিয়ে যাওয়ার পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছে না আর্জেন্টিনা।
- কাতার বিশ্বকাপ থেকে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসছে।
- প্রতিপক্ষকে অতিরিক্ত বলের দখল ছেড়ে দেওয়ায় চাপ বাড়ছে।
- আক্রমণে মেসির জাদু থাকলেও দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ঘাটতি স্পষ্ট।
- স্কালোনির মতে, দল এখন আগের চেয়ে অভিজ্ঞ হলেও এই দুর্বলতা কাটানো জরুরি।
বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে নিয়ে এমন কথা শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে—তারা নাকি নিজেদের কাজ নিজেরাই কঠিন করে তোলে। সাধারণত মাঝারি বা নিচের সারির ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রে এমন মন্তব্য শোনা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আর্জেন্টিনার খেলা দেখলে এই কথাই যেন সত্যি বলে মনে হয়।
কাতার বিশ্বকাপ থেকেই এই প্রবণতা স্পষ্ট। সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ১-০ এগিয়ে থেকেও ২-১ গোলে হার, নেদারল্যান্ডসের বিরুদ্ধে ২-০ লিড নষ্ট করে শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারে জয়, ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনালে ২-০ এগিয়ে থেকেও ম্যাচকে অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যাওয়া—সবই একই সমস্যার উদাহরণ। এমনকি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও সহজ জয়কে শেষ মুহূর্তে কঠিন করে তুলেছিল স্কালোনির দল।
শুক্রবার কেপ ভার্দের বিপক্ষেও সেই পুরোনো ছবিই দেখা গেল। তিনবার এগিয়ে গেল আর্জেন্টিনা, দু’বার সমতা ফেরাল কেপ ভার্দে। শেষ দিকে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস অসাধারণ সেভ না করলে হয়তো তৃতীয়বারও গোল হজম করতে হতো। ম্যাচ শেষে কোচ লিওনেল স্কালোনি স্বীকার করেন, দল একাধিক কঠিন ধাক্কা সামলেছে। অনেকেই ম্যাচটিকে সহজ ভেবেছিলেন, কিন্তু তাদের কাছে তা কখনও সহজ মনে হয়নি।
প্রশ্ন উঠছে, এই সমস্যার মূল কারণ কী? আত্মতুষ্টি, ক্লান্তি, নাকি কৌশলগত সীমাবদ্ধতা?
মনে হয়েছে, আর্জেন্টিনা যেন পুরো শক্তি দিয়ে খেলতে চাইছে না। দীর্ঘ নকআউট পর্বের কথা মাথায় রেখে শক্তি সঞ্চয় করার পরিকল্পনা অবশ্যই যৌক্তিক। কিন্তু সেই চেষ্টা যখন অতিরিক্ত হয়ে যায়, তখন খেলার গতি কমে যায়, ভুল বাড়ে এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে অতিরিক্ত সময় খেলতে হয়।
স্কালোনি অবশ্য খেলোয়াড়দের বিশ্রামের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, পরের ম্যাচের আগে মাত্র তিন দিন সময় পাওয়া কঠিন। যদিও প্রথম একাদশকে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বিশ্রাম দেওয়া হয়েছিল।
আরও একটি বড় বিষয় হলো আর্জেন্টিনার খেলার ধরন। ইউরোপের অনেক শক্তিশালী দলের মতো তারা পুরো ম্যাচ জুড়ে উচ্চগতির চাপ সৃষ্টি করে না। বরং নির্দিষ্ট মুহূর্তে হঠাৎ গতি বাড়িয়ে আক্রমণ গড়ে তোলে। প্রথম গোলের সময় যেমন লিসান্দ্রো মার্তিনেসের লম্বা পাস ধরে দুর্দান্ত নিয়ন্ত্রণে গোল করেন লিওনেল মেসি।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণে উঠে আসে। তখন আর্জেন্টিনা অনেকটাই নিজেদের অর্ধে নেমে যায়। দীর্ঘ সময় ধরে রক্ষণ সামলাতে সামলাতে একসময় ফাঁক তৈরি হয়। ডেরয় দুয়ার্তের সমতাসূচক গোল কিংবা সিডনি কাবরালের অসাধারণ দূরপাল্লার শট—দুটিই সেই বাস্তবতার প্রমাণ।
মেসিও ম্যাচ শেষে কৌশলগত দুর্বলতার কথা অকপটে স্বীকার করেন। তাঁর মতে, দল ঠিকমতো চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। দুই লাইনের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ায় প্রতিপক্ষ সবসময় একজন অতিরিক্ত খেলোয়াড় পেয়েছে। ফলে বলের দখল ধরে রেখে আর্জেন্টিনাকে দৌড় করাতে সক্ষম হয়েছে।

আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো দ্রুত পাল্টা আক্রমণ। আর্জেন্টিনার দুই প্রান্তের খেলোয়াড়রা প্রচণ্ড গতির দৌড়বিদ নন; তারা ভেতরে ঢুকে ছোট পাসে খেলা গড়তে বেশি স্বচ্ছন্দ। মেসিও আগের মতো দীর্ঘ দৌড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে পারেন না। ফলে তাঁর পাশে থাকা স্ট্রাইকার—লাউতারো মার্তিনেস বা হুলিয়ান আলভারেস—প্রায়ই রক্ষণাত্মক দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হন। এতে প্রতিআক্রমণের ধার কমে যায়।
তবে ইতিবাচক দিকও ছিল। দুইবার সমতা ফেরানোর পরও আর্জেন্টিনা ভেঙে পড়েনি। ধৈর্য ধরে বলের দখল রেখেছে এবং শেষ পর্যন্ত দুই সেন্টার-ব্যাকের গোলেই জয় নিশ্চিত করেছে। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের শক্তিশালী শট এবং ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর হেডার থেকে আত্মঘাতী গোল—দুটিই ছিল ধারাবাহিক চাপের ফল।
স্কালোনির মতে, কাতারের অতিরিক্ত সময়ে গড়ানো ম্যাচগুলোর মতোই এবারও দল লড়াই চালিয়ে গেছে। সৌদি আরবের বিপক্ষে হারের সঙ্গে তুলনা টেনে তিনি বলেন, তখন দল ভেঙে পড়েছিল, কিন্তু এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি অভিজ্ঞ এবং প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম।
কেপ ভার্দের কোচ বুবিস্তার মন্তব্য ছিল সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ—আর্জেন্টিনা দেখিয়ে দিয়েছে কেন তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। একই সঙ্গে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছে, কেন বিশ্বকাপ জিততে তাদের দুটি টাইব্রেকারের আশ্রয় নিতে হয়েছিল।