হাইলাইটস:
- ১৯৮৬ বিশ্বকাপে আজতেকায় ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচের প্রত্যক্ষদর্শী স্মৃতিচারণ।
- ‘হ্যান্ড অব গড’ গোলকে এখনও বিতর্কিত প্রতারণা বলেই মনে করেন লেখক।
- মারাদোনার দ্বিতীয় গোলকে তিনি জীবনে মাঠে দেখা সর্বকালের সেরা গোল বলে অভিহিত করেছেন।
- সেই ইংল্যান্ড দলের পরিবেশ, প্রস্তুতি ও বিশ্বকাপের বদলে যাওয়া বাস্তবতার তুলনাও উঠে এসেছে লেখায়।
ডেভিড প্লিট
১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে প্রথমবার টেলিভিশনের কাজে আইটিভির হয়ে গিয়েছিলাম। তখন কল্পনাও করিনি, এমন একটি ম্যাচের সাক্ষী হব, যা একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ‘আমি সেখানে ছিলাম’ মুহূর্ত হয়ে উঠবে।
মেক্সিকো সিটির আজতেকা স্টেডিয়ামে এক লাখেরও বেশি দর্শকের সামনে ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনার সেই কোয়ার্টার ফাইনালকে অমর করে রেখেছিলেন একজনই—ডিয়েগো মারাদোনা। প্রথমে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত গোল, তারপর আমার জীবনে মাঠে বসে দেখা সর্বকালের সেরা গোল।
ম্যাচের আগের ঘটনাগুলিও এখনও স্পষ্ট মনে আছে। মেক্সিকো সিটির যানজট ছিল অসহনীয়। অল্প পথ পাড়ি দিতেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লেগে যেত। তার ওপর ভাগ্য খারাপ হলে দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ গাড়ি থামিয়ে অযথা ঝামেলা করত এবং ঘুষের ইঙ্গিত দিত।
খেলা শুরুর বহু আগেই দর্শকে ভরে গিয়েছিল স্টেডিয়াম। হাজার হাজার মানুষের অবিরাম গুঞ্জন যেন বিশাল মৌচাকের শব্দ। ধারাভাষ্যকার মার্টিন টাইলারের সঙ্গে আমাদের অনেক ওপরে ধারাভাষ্য কক্ষে উঠতে হয়েছিল।
ইংল্যান্ডের দলে তখন শক্ত ভিত ছিল। গোলে পিটার শিলটন, রক্ষণে টেরি বুচার, মাঝমাঠে গ্লেন হডল এবং সামনে গ্যারি লিনেকার। অথচ প্রতিভাবান দুই উইঙ্গার ক্রিস ওয়াডল ও জন বার্নস নিয়মিত দলে জায়গা পাচ্ছিলেন না।
উচ্চতায় খেলা হওয়ায় আমার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল মাঝমাঠের খেলোয়াড়দের ফিরে এসে রক্ষণ সামলানোর গতি। ওই পরিবেশে একবার সামনে উঠে গেলে দ্রুত ফিরে আসা খুব কঠিন। তাই বলকেই বেশি কাজ করাতে হয়।
প্রথমার্ধে ইংল্যান্ড ভালোই লড়াই করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই এল সেই দুই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।
‘হ্যান্ড অব গড’ গোল নিয়ে অধিকাংশের মত, মারাদোনা ইচ্ছাকৃতভাবেই হাত ব্যবহার করেছিলেন। আমার ধারণা, শিলটনের ধাক্কা এড়াতে তিনি হাত তুলেছিলেন, যদিও বল হাতে লেগে জালে জড়িয়ে যায়। লাইনসম্যানের পতাকা উঠল না, রেফারিও বাঁশি বাজালেন না। এরপর তিনি আনন্দের সঙ্গে এমন একটি গোলের কৃতিত্ব নিলেন, যা নিঃসন্দেহে প্রতারণার ফল।
ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা সঙ্গে সঙ্গেই রেফারি আলি বেন নাসেরের দিকে ছুটে যান প্রতিবাদ জানাতে। টিউনিসিয়ার সেই রেফারি আর কখনও বিশ্বকাপে ম্যাচ পরিচালনার সুযোগ পাননি। তবে ম্যাচের বলটি তিনি স্মারক হিসেবে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিলেন।
কয়েক মিনিট পরই মারাদোনা এমন একটি গোল করলেন, যার বিরুদ্ধে কোনও আপত্তির সুযোগই ছিল না। একের পর এক ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়কে কাটিয়ে, ঘুরে দাঁড়িয়ে, টেরি বুচার ও টেরি ফেনউইককে পেছনে ফেলে শিলটনকে পরাস্ত করলেন তিনি। সেটি ছিল অনবদ্য শিল্পকর্ম। আমার চোখে সেটিই মাঠে বসে দেখা সর্বকালের সেরা গোল। ২০১৮ সালে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে গ্যারেথ বেলের বাইসাইকেল কিক কিংবা সনের বার্নলির বিরুদ্ধে একক দৌড়ের গোলও তার পরে।
পরে ববি রবসন ওয়াডল ও বার্নসকে নামান। বার্নসের দুর্দান্ত ক্রস থেকে লিনেকার একটি গোল শোধ করেন। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ইংল্যান্ড বিদায় নেয় ক্ষোভ নিয়ে। সাধারণত ভদ্র ও সংযত ববি রবসনও ম্যাচ শেষে রেফারির ওপর প্রচণ্ড রাগ ঝাড়েন।
আমার নিজেরও একটি বিব্রতকর মুহূর্ত ছিল। মারাদোনা একবার কর্নার লাইনের কাছ থেকে বল তুলে দেন দূরের পোস্টে। ধারাভাষ্যে আমি এমন একটি বাক্য বলেছিলাম, যা পরে দ্ব্যর্থবোধক অর্থে অনেকের হাসির কারণ হয়েছিল।
আজ ফিরে তাকালে আরেকটি বিষয় চোখে পড়ে। সেই কোয়ার্টার ফাইনালে ছিল ব্রাজিল, মেক্সিকো, স্পেন, বেলজিয়াম, ফ্রান্স ও পশ্চিম জার্মানির মতো শক্তিশালী দল। এবারের বিশ্বকাপে আফ্রিকার দলগুলো শেষ আটে উঠবে কি না জানা নেই, তবে গত চার দশকে তাদের মান যে অনেক বেড়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
আরও অনেক কিছু বদলে গেছে। ১৯৮৬ সালে আমরা টেলিভিশন কর্মীরা ইংল্যান্ড দলের একই আবাসনে থাকতাম। প্রতিদিন খেলোয়াড়দের সঙ্গে দেখা হতো, অনুশীলনও কাছ থেকে দেখা যেত। এখন এমনটা কল্পনাই করা যায় না।
সেই সময় আজকের মতো বিলাসবহুল অনুশীলন মাঠ, বিশ্বমানের খাবার বা অত্যাধুনিক সুযোগ-সুবিধাও ছিল না। কয়েকজন ইংল্যান্ড ফুটবলার ঘোড়দৌড়ের ভীষণ অনুরাগী ছিলেন। তাই আইটিভির কর্মীদের দিয়ে তারা ডার্বি প্রতিযোগিতার সম্প্রচার দেখার ব্যবস্থা করেছিলেন। অনেকে আবার আমেরিকার ঘোড়দৌড়ের ভিডিও দেখে বাজিও ধরতেন।
শুরুর দিকে অবশ্য মনে হচ্ছিল, ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ অভিযান খুব তাড়াতাড়িই শেষ হয়ে যাবে। পর্তুগালের কাছে হার, মরক্কোর সঙ্গে ড্র—সব মিলিয়ে ইংরেজ সংবাদমাধ্যম দেশে ফেরার প্রস্তুতিই নিচ্ছিল। দ্বিতীয় ম্যাচের পর এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকরা প্রায় ধরে নিয়েছিলেন সফর শেষ হতে চলেছে।
কিন্তু ববি রবসন ও তাঁর সহকারী ডন হাও কৌশল বদলান। অনেকেই বলেন, খেলোয়াড়দের উদ্যোগেই এই পরিবর্তন এসেছিল। যিনিই উদ্যোগ নিয়ে থাকুন না কেন, পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে গ্যারি লিনেকারের হ্যাটট্রিকে ৩-০ জয় ইংল্যান্ডকে নতুন জীবন দেয়।
তারপর প্যারাগুয়েকে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস আরও বাড়ে। কিন্তু মারাদোনার অসাধারণ নৈপুণ্যের সামনে সব স্বপ্ন থেমে যায়। এবারের ইংল্যান্ড দল যদি আবার আজতেকায় ফিরে মেক্সিকোকে হারিয়ে মারাদোনার সেই স্মৃতির ভার কিছুটা হলেও ঝেড়ে ফেলতে পারে, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।