হাইলাইটস
- ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে গোল করে ৬৮ মিনিট এগিয়ে ছিল কঙ্গো।
- রাজধানী কিনশাসাজুড়ে হাজারো সমর্থকের উল্লাসে উৎসবের আবহ তৈরি হয়।
- ১৯৭৪ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপে ফিরে নকআউটে ওঠাকেই বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন কঙ্গোর মানুষ।
- শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে হারলেও দলকে ঘিরে গর্ব ও উদযাপনের আবহ অটুট থাকে।
- আফ্রিকার ফুটবলের উত্থানের প্রতীক হয়ে উঠেছে কঙ্গোর বিশ্বকাপ অভিযান।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের স্বপ্ন টিকেছিল ৬৮ মিনিট। আর সেই ৬৮ মিনিটেই গোটা রাজধানী কিনশাসা যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছিল।
ম্যাচের সপ্তম মিনিটে কঙ্গো গোল করতেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে তৈরি হওয়া বড় পর্দার দর্শককেন্দ্রগুলোতে হাজার হাজার সমর্থক উল্লাসে ফেটে পড়েন। কেউ চিৎকার করছেন, কেউ গলায় জড়ানো স্কার্ফ ঘুরিয়ে নাচছেন, কেউ লাফিয়ে উঠছেন আনন্দে। যানজটে অভ্যস্ত কিনশাসার রাস্তায় গাড়ির হর্নও সেদিন বিরক্তির নয়, আনন্দের ভাষা হয়ে ওঠে। রেডিও ধারাভাষ্যকারদের উত্তেজিত কণ্ঠস্বর গাড়ির জানালা পেরিয়ে রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
কঙ্গো নদীর ওপার থেকেও শোনা যাচ্ছিল উল্লাসধ্বনি। নদীতে মাছ ধরতে থাকা জেলেরা নৌকা বেয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, আর তীরজুড়ে চলছিল বিশ্বকাপ দেখার আসর। মনে হচ্ছিল, প্রায় দুই কোটি মানুষের শহরের অধিকাংশ বাসিন্দাই কোনো না কোনো দর্শককেন্দ্রে জড়ো হয়েছেন। বাকিরা যানজট ঠেলে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।
রাস্তার ধারে একটি বড় বিজ্ঞাপনে লেখা ছিল, “ইংল্যান্ডকে হারানো অসম্ভব নয়।” ম্যাচের এক ঘণ্টারও বেশি সময় পর্যন্ত সেই বিশ্বাস বাস্তব বলেই মনে হচ্ছিল। সমর্থকেরা নিশ্চিন্তে আরও বিয়ারের অর্ডার দিচ্ছিলেন, দলের প্রতিটি ভালো আক্রমণে হাততালি আর উল্লাসে মেতে উঠছিলেন।
কঙ্গো শেষবার বিশ্বকাপ খেলেছিল ১৯৭৪ সালে, তখন দেশের নাম ছিল জাইরে। সেই বিশ্বকাপে একটি গোলও করতে পারেনি দলটি। যুগোস্লাভিয়ার কাছে ৯-০ গোলে বিধ্বস্ত হওয়ার পর তৎকালীন শাসক মোবুতু সেসে সেকো নাকি ফুটবলারদের দেশে ফিরতে না দেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন।
সেই দলের সদস্য দিয়োদোনে মওয়াপে স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখনকার দল ছিল অপেশাদার। বিদ্যুৎ না থাকায় তিনি এদিনের ম্যাচের প্রথমার্ধ প্রতিবেশীর বাড়িতে দেখে দ্বিতীয়ার্ধে নিজের বাড়িতে ফিরে যান। তাঁর মতে, বর্তমান কঙ্গো দল সম্পূর্ণ ভিন্ন। অধিকাংশ ফুটবলার ইউরোপের নামী ক্লাবে খেলেন, আধুনিক প্রশিক্ষণ ও উন্নত সুযোগ-সুবিধা পান।
কিনশাসার একটি দর্শককেন্দ্রে উপস্থিত অধিকাংশ মানুষেরই জন্ম ১৯৭৪ সালের পর। ৬৩ বছর বয়সি ভ্যালেন্তিন কিনজেয়া বলেন, সেই সময় খুব কম মানুষের বাড়িতে টেলিভিশন ছিল, তাই তিনি বিশ্বকাপ দেখতেই পারেননি। আর ৬০ বছর বয়সি জ্যাঁ-মার্ক মান্দালা জানান, তাঁর গ্রামে তখন টেলিভিশনই ছিল না; সবাই রেডিওতে খেলা শুনতেন। তাঁর কথায়, “তখন শুধু বিশ্বকাপে উঠতেই আমরা খুশি ছিলাম। এখন নকআউটে পৌঁছানোই আমাদের জন্য বিশাল আনন্দ।”
এবারের বিশ্বকাপে কঙ্গোর সাফল্য শুধু তাদের নিজেদের নয়, পুরো আফ্রিকার ফুটবলেরও উত্থানের প্রতীক। ইতিহাসে প্রথমবার আফ্রিকার ১০টি প্রতিনিধির মধ্যে ৯টি দল নকআউটে উঠেছে। ইতিমধ্যেই নেদারল্যান্ডসের মতো শক্তিশালী দল বিদায় নিয়েছে।
কিনশাসার দর্শককেন্দ্রগুলোর বড় পর্দা মাঝেমধ্যে নিভে যাচ্ছিল। অনেক জায়গায় একটি ল্যাপটপ থেকেই বড় পর্দায় সম্প্রচার চলছিল। পর্দা বন্ধ হয়ে গেলে দর্শকেরা নিজেদের প্লাস্টিকের চেয়ার তুলে অন্য পর্দার সামনে চলে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তাতেও উৎসাহে ভাটা পড়েনি।
এরপর ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। এক ঘণ্টার কিছু পরে ইংল্যান্ড সমতা ফেরায়। হতাশ এক সমর্থক চিৎকার করে বলেন, “হ্যারি কেইনকে একা ছেড়ে দিলে তো আরেকটা গোল হবেই!”
অল্প সময়ের মধ্যেই সেটাই সত্যি হয়। ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন দ্বিতীয় গোল করে দলকে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে দেন। মুহূর্তের জন্য নেমে আসে নিস্তব্ধতা। বোঝা যায়, কঙ্গোর পক্ষে আর ফেরা কঠিন।
কিন্তু সেই নীরবতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কেউ একজন আবার শিঙা বাজাতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে হাততালি ফিরে আসে। আবার ভরে ওঠে পানীয়ের গ্লাস। কারণ ফল যাই হোক, কিনশাসার মানুষ জানতেন—এই বিশ্বকাপ তাঁদের গর্বের গল্প লিখে দিয়েছে।
এক সমর্থকের কথাতেই ধরা পড়ে সেই অনুভূতি: “হারলেও আমরা উদযাপন করব। কারণ এই দল আমাদের আনন্দ ফিরিয়ে দিয়েছে।”