ফিফার অন্দরেই কি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধে সমর্থনের ভিত নড়তে শুরু করেছে? প্রশ্নটা এখন আর শুধুই জল্পনা নয়। সভাপতি ইনফান্তিনোর বিরুদ্ধেই এবার প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন ফিফার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদাধিকারী, মহাসচিব ম্যাটিয়াস গ্রাফস্ট্রোম। ব্যর্থ বিশ্বকাপ বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনাকে তিনি বলেছেন “দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনা”।
শুধু গ্রাফস্ট্রোম নন, ফিফার গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট প্রধান এবং আর্সেনালের প্রাক্তন কোচ আর্সেন ভেঙ্গারও বিতর্কিত প্রকল্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তকে বলেছেন “সম্পূর্ণ প্রয়োজনীয় এবং প্রশ্নাতীত”।
ফিফার শীর্ষ স্তরে এতদিন যে অস্বস্তি চাপা ছিল, একের পর এক মন্তব্য ও পদত্যাগে তা এখন প্রকাশ্যে আসছে।
মহাসচিবের বার্তায় কড়া ইঙ্গিত
ফিফার কর্মীদের উদ্দেশে পাঠানো এক ই-মেলে গ্রাফস্ট্রোম গত সপ্তাহকে বর্ণনা করেছেন “অসাধারণ এবং কঠিন” সময় হিসেবে।
তিনি সরাসরি ইনফান্তিনোর নাম নেননি। কিন্তু বিশ্বকাপ আয়োজনের সাফল্য যেন সাম্প্রতিক “দুঃখজনক ও নিন্দনীয় ঘটনাবলি”কে আড়াল না করে, সেই সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
গ্রাফস্ট্রোম লিখেছেন, ফিফার কর্মীরা এমন একটি অস্থির পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছেন, যা বোঝা এবং মেনে নেওয়া কঠিন। তবে তাঁর আবেদন, ফুটবল, ফিফার ২১১টি সদস্য সংস্থা এবং সংস্থার সংবিধি ও নিয়ম মেনে চলার মূল লক্ষ্য থেকে যেন কেউ বিচ্যুত না হন।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ তাঁর আশ্বাস—
“প্রশাসনের সদস্য হিসেবে আপনাদের আমি রক্ষা করব।”
তিনি কর্মীদের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ব্যক্তি বা অস্থির সময় আসে-যায়, কিন্তু প্রতিষ্ঠান, তার দায়িত্ব এবং বিশ্ব ফুটবলের প্রতি অঙ্গীকার অটুট থাকে।
রাজনৈতিক বার্তার ভাষা না ব্যবহার করেও এই বক্তব্যে যে বার্তা স্পষ্ট—ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠান বড়।
ভেঙ্গারও পাশে নেই
ফিফার গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট প্রধান আর্সেন ভেঙ্গারও বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা থেকে দূরত্ব স্পষ্ট করেছেন।
২০১৯ সাল থেকে ফিফায় কাজ করা প্রাক্তন আর্সেনাল কোচ জানান, এই কৌশলগত পরিকল্পনার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন না এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকেই প্রথম প্রকল্পটির কথা জানতে পারেন।
তাঁর বক্তব্য, প্রকল্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ সঠিক এবং অনিবার্য।
ভেঙ্গার আরও বলেন, তিনি এমন একটি স্বাধীন ফিফায় বিশ্বাস করেন, যা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সততার সঙ্গে বিশ্ব ফুটবলের সেবা করবে।
অর্থাৎ, ইনফান্তিনোর নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের জন্য যে সময়টা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে, ভেঙ্গারের মন্তব্যেও সেই অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট।
ঘনিষ্ঠরাও সরে যাচ্ছেন?
এর আগে ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরোর পদত্যাগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
ফিফার প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা কেভিন লামুরও অভিযোগ করেছিলেন, প্রশাসনকে সভাপতি “বিভ্রান্ত” করেছিলেন।
একদিকে ঘনিষ্ঠ সহযোগীর পদত্যাগ, অন্যদিকে শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রকাশ্য সমালোচনা—সব মিলিয়ে ফিফার সর্বোচ্চ স্তরে ইনফান্তিনোর অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিশেষ করে তাঁর ডেপুটি বা মহাসচিবের এমন মন্তব্য ফিফার অভ্যন্তরে সভাপতির ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
বাইরেও সমর্থন কমছে
চাপ শুধু ফিফার সদর দফতরেই সীমাবদ্ধ নেই।
সোমবার ইউরোপের একাধিক ফুটবল ফেডারেশন ইনফান্তিনোর পুনর্নির্বাচনের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করেছে। আগামী দিনে আরও কয়েকটি জাতীয় ফুটবল সংস্থা একই পথে হাঁটতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফলে এখন প্রশ্ন শুধু একটি বিতর্কিত বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে নয়।
প্রশ্নটা আরও বড়—ইনফান্তিনোর নেতৃত্বের প্রতি যে সমর্থনের প্রাচীর এতদিন শক্ত বলে মনে হচ্ছিল, সেটাই কি এবার ভাঙতে শুরু করেছে?
ফিফার ভেতরে একের পর এক কণ্ঠস্বর যখন প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির কথা বলছে, তখন ইনফান্তিনোর সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়তো আর বাইরের সমালোচনা নয়।
নিজের ঘরের সমর্থন ধরে রাখাই এখন তাঁর আসল পরীক্ষা।