কারাগার পেরিয়ে লেখা

যা জানা জরুরি
- ইরানের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মদি তাঁর আত্মকথা কোনও নিরাপদ ঘরে বসে একটানে লেখেননি।
- কারাগারে পাওয়া অল্প সময়, কাগজ আর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লিখেছেন বইটির টুকরো টুকরো অংশ।
- পরে সেগুলি আলাদা আলাদা পথে কারাগারের বাইরে পৌঁছেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইরানের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মদি তাঁর আত্মকথা কোনও নিরাপদ ঘরে বসে একটানে লেখেননি। কারাগারে পাওয়া অল্প সময়, কাগজ আর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লিখেছেন বইটির টুকরো টুকরো অংশ। পরে সেগুলি আলাদা আলাদা পথে কারাগারের বাইরে পৌঁছেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদি জানিয়েছেন, এই স্মৃতিকথায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বন্দিত্ব এবং ইরানে নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস—তিনটিকেই একসঙ্গে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বইটির নাম ‘আ উওম্যান নেভার স্টপস ফাইটিং—মাই স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’। ইংরেজি ও ফারসি সংস্করণ ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হওয়ার কথা। পাণ্ডুলিপির আন্তর্জাতিক অধিকার পরিচালনাকারী সংস্থা জানিয়েছে, কারাগার থেকে লেখার অংশগুলি বাইরে পৌঁছে দিতে মোহাম্মদি এবং তাঁর সহযোগীদের যথেষ্ট ঝুঁকি নিতে হয়েছে।
প্রকৌশলী থেকে আন্দোলনের মুখ
পেশায় প্রকৌশলী মোহাম্মদি পরে সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হন। মৃত্যুদণ্ড, বাধ্যতামূলক হিজাব এবং দীর্ঘ একাকী বন্দিত্বের বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরব। ইরানের ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টারের উপপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৩ সালে কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। নরওয়ের অসলোতে পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে তাঁর হয়ে বার্তা পড়ে শোনান তাঁর দুই সন্তান।
সাম্প্রতিক চিকিৎসাজনিত মুক্তির সময় দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদি তাঁর সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর মারধর এবং পরে জীবনসংশয়ী একাকী বন্দিত্বের অভিযোগ করেছেন। এগুলি তাঁর নিজের বক্তব্য এবং তাঁর সহযোগী সংগঠনের বিবরণ। ওই প্রতিবেদনে ইরানি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি; অভিযোগগুলির স্বাধীন বিচারিক পরীক্ষার তথ্যও প্রকাশিত হয়নি।
একই ঘটনার দুই বয়ান
মোহাম্মদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার, সমাবেশে অংশগ্রহণ এবং সংগঠন পরিচালনার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি অবশ্য ইরানের বিচারব্যবস্থাকেই রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনভঙ্গের যুক্তি তুলে ধরে।
এই দুই বয়ানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। এক দিকে রয়েছে রাষ্ট্র এবং তার কারাগারব্যবস্থা; অন্য দিকে এমন এক বন্দি, যিনি চিকিৎসাজনিত মুক্তির সময়ও পুনরায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
যুদ্ধ থেকে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’
মোহাম্মদির আত্মকথার পটভূমিতে রয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের তাঁর শৈশব, পরবর্তী রাজনৈতিক দমন এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন।
তাঁর মতে, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় দমনের সম্মিলিত চাপের সবচেয়ে বড় দাম দিচ্ছেন সাধারণ ইরানিরাই। রাস্তায় দৃশ্যমান প্রতিবাদ কমে গেলেই প্রতিরোধ শেষ হয়ে যায়—এই ধারণাও তিনি মানেন না।
তবে তাঁর গল্পের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অধ্যায় রাজনীতির বাইরেও। তাঁর পরিবার এখন নির্বাসনে। সন্তানদের থেকে দীর্ঘ বিচ্ছেদ, অসুস্থতা, কারাগারের দৈনন্দিন ভয়—এই অভিজ্ঞতাগুলিও আত্মকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোনও রাজনৈতিক বন্দিকে শুধু একটি প্রতীকে পরিণত করলে সেই ব্যক্তিগত ক্ষতিগুলি সহজেই আড়ালে চলে যেতে পারে। আবার ব্যক্তিগত কষ্টের বর্ণনাই তাঁর রাজনৈতিক দাবিগুলির স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়। সেখানেই প্রয়োজন নথি, সাক্ষ্য এবং স্বাধীন তদন্তের।
স্মৃতিকথা, ইতিহাস নয়
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা এই পাণ্ডুলিপি একসঙ্গে সাহিত্যিক দলিল এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির নথি। একে আদালতের পূর্ণাঙ্গ নথি কিংবা নিরপেক্ষ ইতিহাস হিসেবে পড়া ঠিক হবে না। কারণ আত্মকথা স্বভাবতই লেখকের নিজের দেখা, মনে থাকা এবং বেছে নেওয়া অভিজ্ঞতার বিবরণ।
তবু রাষ্ট্র যখন তথ্য, সাক্ষাৎ এবং প্রকাশনার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখে, তখন বন্দির প্রথম-ব্যক্তির বয়ান এমন অনেক অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করতে পারে, যার অন্য কোনও নথি সহজে পাওয়া যায় না।
বইটি প্রকাশ পেতে এখনও প্রায় এক বছর বাকি। তাই এখনই তার সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু বা ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আপাতত গুরুত্বপূর্ণ খবর হল—কারাগারের মধ্যেও মোহাম্মদি লিখেছেন, আর সেই লেখা কোনও না কোনও পথে বাইরে পৌঁছেছে।
শরীরকে বন্দি করা যায় বারবার। লেখা আটকে রাখা যায় কতটা—সেই প্রশ্নই যেন রেখে যাচ্ছে নার্গিস মোহাম্মদির ছিন্নপত্র।
কারাগার পেরিয়ে লেখা
ইরানের নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নার্গিস মোহাম্মদি তাঁর আত্মকথা কোনও নিরাপদ ঘরে বসে একটানে লেখেননি। কারাগারে পাওয়া অল্প সময়, কাগজ আর সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লিখেছেন বইটির টুকরো টুকরো অংশ। পরে সেগুলি আলাদা আলাদা পথে কারাগারের বাইরে পৌঁছেছে। ১৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদি জানিয়েছেন, এই স্মৃতিকথায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বন্দিত্ব এবং ইরানে নারী ও মানবাধিকার আন্দোলনের ইতিহাস—তিনটিকেই একসঙ্গে ধরার চেষ্টা করেছেন।
বইটির নাম ‘আ উওম্যান নেভার স্টপস ফাইটিং—মাই স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম, ডেমোক্রেসি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ইন ইরান’। ইংরেজি ও ফারসি সংস্করণ ২০২৭ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হওয়ার কথা। পাণ্ডুলিপির আন্তর্জাতিক অধিকার পরিচালনাকারী সংস্থা জানিয়েছে, কারাগার থেকে লেখার অংশগুলি বাইরে পৌঁছে দিতে মোহাম্মদি এবং তাঁর সহযোগীদের যথেষ্ট ঝুঁকি নিতে হয়েছে।
প্রকৌশলী থেকে আন্দোলনের মুখ
পেশায় প্রকৌশলী মোহাম্মদি পরে সাংবাদিকতা এবং মানবাধিকার আন্দোলনে যুক্ত হন। মৃত্যুদণ্ড, বাধ্যতামূলক হিজাব এবং দীর্ঘ একাকী বন্দিত্বের বিরুদ্ধে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সরব। ইরানের ডিফেন্ডার্স অব হিউম্যান রাইটস সেন্টারের উপপ্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
২০২৩ সালে কারাগারে থাকা অবস্থাতেই তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। নরওয়ের অসলোতে পুরস্কার গ্রহণের অনুষ্ঠানে তাঁর হয়ে বার্তা পড়ে শোনান তাঁর দুই সন্তান।
সাম্প্রতিক চিকিৎসাজনিত মুক্তির সময় দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদি তাঁর সর্বশেষ গ্রেপ্তারের পর মারধর এবং পরে জীবনসংশয়ী একাকী বন্দিত্বের অভিযোগ করেছেন। এগুলি তাঁর নিজের বক্তব্য এবং তাঁর সহযোগী সংগঠনের বিবরণ। ওই প্রতিবেদনে ইরানি কর্তৃপক্ষের পূর্ণ প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি; অভিযোগগুলির স্বাধীন বিচারিক পরীক্ষার তথ্যও প্রকাশিত হয়নি।
একই ঘটনার দুই বয়ান
মোহাম্মদির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার, সমাবেশে অংশগ্রহণ এবং সংগঠন পরিচালনার মতো অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি অবশ্য ইরানের বিচারব্যবস্থাকেই রাজনৈতিক দমনের হাতিয়ার বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অন্যদিকে, ইরানি কর্তৃপক্ষ সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা এবং আইনভঙ্গের যুক্তি তুলে ধরে।
এই দুই বয়ানের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ। এক দিকে রয়েছে রাষ্ট্র এবং তার কারাগারব্যবস্থা; অন্য দিকে এমন এক বন্দি, যিনি চিকিৎসাজনিত মুক্তির সময়ও পুনরায় গ্রেপ্তারের আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন।
যুদ্ধ থেকে ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’
মোহাম্মদির আত্মকথার পটভূমিতে রয়েছে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময়ের তাঁর শৈশব, পরবর্তী রাজনৈতিক দমন এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর ছড়িয়ে পড়া ‘নারী, জীবন, স্বাধীনতা’ আন্দোলন।
তাঁর মতে, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, মূল্যবৃদ্ধি এবং রাষ্ট্রীয় দমনের সম্মিলিত চাপের সবচেয়ে বড় দাম দিচ্ছেন সাধারণ ইরানিরাই। রাস্তায় দৃশ্যমান প্রতিবাদ কমে গেলেই প্রতিরোধ শেষ হয়ে যায়—এই ধারণাও তিনি মানেন না।
তবে তাঁর গল্পের সবচেয়ে ব্যক্তিগত অধ্যায় রাজনীতির বাইরেও। তাঁর পরিবার এখন নির্বাসনে। সন্তানদের থেকে দীর্ঘ বিচ্ছেদ, অসুস্থতা, কারাগারের দৈনন্দিন ভয়—এই অভিজ্ঞতাগুলিও আত্মকথার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
কোনও রাজনৈতিক বন্দিকে শুধু একটি প্রতীকে পরিণত করলে সেই ব্যক্তিগত ক্ষতিগুলি সহজেই আড়ালে চলে যেতে পারে। আবার ব্যক্তিগত কষ্টের বর্ণনাই তাঁর রাজনৈতিক দাবিগুলির স্বয়ংক্রিয় প্রমাণ নয়। সেখানেই প্রয়োজন নথি, সাক্ষ্য এবং স্বাধীন তদন্তের।
স্মৃতিকথা, ইতিহাস নয়
কারাগার থেকে বেরিয়ে আসা এই পাণ্ডুলিপি একসঙ্গে সাহিত্যিক দলিল এবং ব্যক্তিগত স্মৃতির নথি। একে আদালতের পূর্ণাঙ্গ নথি কিংবা নিরপেক্ষ ইতিহাস হিসেবে পড়া ঠিক হবে না। কারণ আত্মকথা স্বভাবতই লেখকের নিজের দেখা, মনে থাকা এবং বেছে নেওয়া অভিজ্ঞতার বিবরণ।
তবু রাষ্ট্র যখন তথ্য, সাক্ষাৎ এবং প্রকাশনার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখে, তখন বন্দির প্রথম-ব্যক্তির বয়ান এমন অনেক অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করতে পারে, যার অন্য কোনও নথি সহজে পাওয়া যায় না।
বইটি প্রকাশ পেতে এখনও প্রায় এক বছর বাকি। তাই এখনই তার সম্পূর্ণ বিষয়বস্তু বা ঐতিহাসিক মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। আপাতত গুরুত্বপূর্ণ খবর হল—কারাগারের মধ্যেও মোহাম্মদি লিখেছেন, আর সেই লেখা কোনও না কোনও পথে বাইরে পৌঁছেছে।
শরীরকে বন্দি করা যায় বারবার। লেখা আটকে রাখা যায় কতটা—সেই প্রশ্নই যেন রেখে যাচ্ছে নার্গিস মোহাম্মদির ছিন্নপত্র।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



