মামলার পাহাড়ে আদালত

যা জানা জরুরি
- খাবারের পছন্দ, কবিতা আবৃত্তি, স্লোগান, সামাজিক-মাধ্যমে মন্তব্য, প্রতিবাদে যোগ দেওয়া কিংবা কৌতুক পরিবেশনের মতো ঘটনায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম…
- ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ‘ফৌজদারি মামলায় নৈতিকতা’ বিষয়ক এক আলোচনায় তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়েই বোঝা যায় অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল বা অযৌক্তিক।
- তবু অভিযুক্তকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
খাবারের পছন্দ, কবিতা আবৃত্তি, স্লোগান, সামাজিক-মাধ্যমে মন্তব্য, প্রতিবাদে যোগ দেওয়া কিংবা কৌতুক পরিবেশনের মতো ঘটনায় ফৌজদারি মামলা দায়েরের প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভুঁইয়া। ১৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে ‘ফৌজদারি মামলায় নৈতিকতা’ বিষয়ক এক আলোচনায় তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই প্রাথমিক পর্যায়েই বোঝা যায় অভিযোগের ভিত্তি দুর্বল বা অযৌক্তিক। তবু অভিযুক্তকে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
বিচারপতি ভুঁইয়ার দেওয়া হিসাবে, দেশের আদালতগুলিতে ৪.২৭ কোটির বেশি ফৌজদারি মামলা বিচারাধীন। এর প্রায় ৯৫ শতাংশই জেলা ও অধস্তন আদালতে। সংখ্যাটি প্রতিদিনই বদলায়, তবে জাতীয় বিচারিক তথ্যভান্ডারের পরিসংখ্যানও দেখায়, নিম্ন আদালতের বিচারাধীন মামলার বড় অংশই ফৌজদারি।
এই বিপুল চাপ কমাতে গুরুতর নয় এমন মামলার ক্ষেত্রে এককালীন ক্ষমা বা বিশেষ নিষ্পত্তি-অভিযানের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে বলে মত দিয়েছেন বিচারপতি ভুঁইয়া। তাঁর যুক্তি, এতে হত্যা, যৌন সহিংসতা, সংগঠিত অপরাধ এবং বড় আর্থিক অপরাধের মতো গুরুতর মামলায় আদালত আরও বেশি সময় দিতে পারবে।
তবে এটি কোনও বিচারিক আদেশ নয়, বরং একটি জনসমক্ষে দেওয়া নীতিগত মত। তাই তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে পুলিশ, সরকার বা নিম্ন আদালত এখনই ছোটখাটো সব মামলা তুলে দিতে পারে না। কোন অপরাধকে ‘তুচ্ছ’ বলা হবে, ভুক্তভোগীর আপত্তি কী ভাবে বিবেচিত হবে এবং ক্ষমার সীমা নির্ধারণের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে—আইনসভা, সরকার না আদালত—এসব পৃথক আইনি প্রশ্ন।
হেফাজতেও অধিকার থাকে
পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন এবং বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিচারপতি ভুঁইয়া। অভিযুক্তকে পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর সময় বিচারকদের আরও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের আচরণ, পেশাদার প্রশিক্ষণ এবং বলপ্রয়োগের মাত্রা নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলেও রাষ্ট্রের হেফাজতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তার অধিকার শেষ হয়ে যায় না।
প্রসিকিউশনের কাজ কী?
সরকারি কৌঁসুলিদের ভূমিকা নিয়েও স্বাধীনতার প্রশ্ন তুলেছেন বিচারপতি। তাঁর মতে, তাঁদের কাজ যে কোনও মূল্যে অভিযুক্তের দণ্ড নিশ্চিত করা নয়; আদালতের সামনে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ নিরপেক্ষ ভাবে তুলে ধরা।
একই ভাবে, প্রতিরক্ষা আইনজীবীর দায়িত্ব আইনসম্মত পথে মক্কেলের অধিকার রক্ষা করা। প্রমাণ গোপন করা, সাক্ষীকে প্রভাবিত করা কিংবা ইচ্ছাকৃত ভাবে বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা সেই দায়িত্বের অংশ নয়।
আলোচনায় প্রাক্তন বিচারপতি অভয় এস ওকা এবং দিল্লি হাই কোর্টের বিচারপতি অমিত শর্মাও উপস্থিত ছিলেন।
মামলা কমবে, ন্যায় কমবে না
মামলার সংখ্যা কমানোর নামে নির্বিচারে ক্ষমা বা মামলা প্রত্যাহার করা হলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার অভিযোগের ভাষা যতই গুরুতর হোক, প্রমাণ দুর্বল হলে বছরের পর বছর হাজিরা ও আইনি খরচ অভিযুক্তের জন্য নিজেই এক ধরনের শাস্তিতে পরিণত হতে পারে।
তাই মামলা ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে শুধু ধারায় সর্বোচ্চ সাজা কত, তা দেখলেই হবে না। অপরাধের ক্ষতির মাত্রা, প্রমাণের শক্তি, অভিযুক্তের ভূমিকা এবং ভুক্তভোগীর অবস্থান—সবকিছুকেই বিবেচনায় আনার প্রয়োজন রয়েছে।
তবে আদালতের জট কমানোর কাজ শুধু পুরনো মামলা বন্ধ করলেই শেষ হবে না। থানায় অভিযোগ নথিভুক্তির মান, প্রসিকিউশনের স্বাধীন পর্যালোচনা এবং বিচারকের শূন্যপদ পূরণের মতো কাঠামোগত সমস্যাগুলিও সমাধান করতে হবে। নইলে পুরনো মামলা সরলেও নতুন মামলার স্রোতে একই জট আবার তৈরি হবে।
বিচারপতি ভুঁইয়ার বক্তব্যের কেন্দ্রে তাই শুধু মামলার সংখ্যা কমানোর প্রশ্ন নয়। ফৌজদারি আইন যেন মতভেদ সামলানোর সহজ হাতিয়ার না হয়ে ওঠে—তা নিশ্চিত করার প্রশ্নও রয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



