ফুটপাত থাকবে পথচারীদের জন্যই—দখলদার বা গাড়ির জন্য নয়। দেশের সব সড়কে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত, নিরাপদ এবং দখলমুক্ত হাঁটার জায়গা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে কড়া নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট।
শীর্ষ আদালতের বক্তব্য, নিরাপদে হাঁটার অধিকার শুধু নাগরিক সুবিধা নয়, সংবিধানপ্রদত্ত মৌলিক অধিকারের অংশ। তাই নগর পরিকল্পনা থেকে শুরু করে রাস্তা নির্মাণ এবং ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা—সব ক্ষেত্রেই পথচারীদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
দুই সপ্তাহের মধ্যে পদক্ষেপ
দেশের বিভিন্ন শহরে ফুটপাত দখল করে দোকান, অবৈধ পার্কিং, নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা কিংবা নানা ধরনের স্থায়ী-অস্থায়ী কাঠামো তৈরির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ফলে বহু জায়গায় পথচারীদের ফুটপাত ছেড়ে মূল রাস্তায় নেমে হাঁটতে হয়।
আর তাতেই বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।
এই পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্ট সরকারগুলিকে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে।
আদালতের নির্দেশ, প্রতিটি সড়কে পথচারীদের জন্য নির্দিষ্ট অংশ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। সেই হাঁটার জায়গা কোনওভাবেই যানবাহনের চলাচলের সঙ্গে মিশে যেতে দেওয়া যাবে না।
নিরাপদে হাঁটা ‘অধিকার’
এর আগে জুন মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, নির্দিষ্ট ফুটপাথে নিরাপদে হাঁটার অধিকার সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত জীবনের অধিকারেরই অংশ।
এবার সেই রায়কে বাস্তবে কার্যকর করার দিকেই আরও এক ধাপ এগোল শীর্ষ আদালত।
আদালতের পর্যবেক্ষণ, শহরের উন্নয়ন মানেই শুধু গাড়ির গতি বাড়ানো নয়। সাধারণ মানুষের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ চলাচল নিশ্চিত করাও নগর উন্নয়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
শিশু, প্রবীণ, নারী—সবার কথা মাথায়
ফুটপাত বা রাস্তার নকশা তৈরির সময় সমাজের সব অংশের মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা করার কথাও বলেছে আদালত।
বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ, নারী এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নিরাপদ ও সহজে ব্যবহারযোগ্য হাঁটার পরিকাঠামো তৈরি করতে হবে।
অর্থাৎ ফুটপাত শুধু ‘রাস্তার পাশের একটা ফাঁকা জায়গা’ নয়। এটি শহরের পরিবহণ ব্যবস্থারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
ফুটপাত আছে, হাঁটার জায়গা নেই!
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অধিকাংশ শহরে পথচারীদের জন্য পর্যাপ্ত পরিকাঠামো নেই। কোথাও ফুটপাতই নেই, কোথাও থাকলেও তা ভাঙাচোরা। আবার বহু জায়গায় ফুটপাত দখল হয়ে রয়েছে দোকান, গাড়ি বা নির্মাণসামগ্রীর দখলে।
ফলে বাধ্য হয়ে মানুষকে মূল সড়কে হাঁটতে হয়। আর ব্যস্ত রাস্তায় গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটার সেই বাধ্যবাধকতাই দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ কার্যকর হলে এই পরিস্থিতিতে বদল আসতে পারে। নগর পরিকল্পনায় ফের গুরুত্ব পেতে পারে ‘পথচারী আগে’ নীতি।
নির্দেশের পর আসল পরীক্ষা বাস্তবায়নে
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আদালতের নির্দেশ দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না।
ফুটপাত দখলমুক্ত রাখা, নিয়মিত নজরদারি চালানো, স্থানীয় প্রশাসনকে জবাবদিহির আওতায় আনা এবং বেআইনি দখলের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
একই সঙ্গে নাগরিকদেরও ফুটপাত দখল না করা এবং নির্ধারিত হাঁটার পথ ব্যবহারের বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
আদালতের এই নির্দেশ তাই শুধু ফুটপাত নিয়ে নয়—শহর কাদের জন্য, সেই বড় প্রশ্নও সামনে এনে দিল।
রাস্তা যদি শুধু গাড়ির জন্য হয়, তবে শহর মানুষের জন্য নয়। সুপ্রিম কোর্টের বার্তা স্পষ্ট—শহরের রাস্তায় পথচারীর জায়গা নিশ্চিত করতেই হবে।