হাইলাইটস
- জনসংখ্যা হ্রাস ও জন্মহার কমে যাওয়ায় নতুন উদ্যোগ নিল ভুটান।
- তৃতীয় সন্তান এবং তার পরের প্রতিটি সন্তানের জন্য মাসিক ১০,০০০ নুলট্রাম প্রণোদনা দেওয়া হবে।
- শিশুর বয়স তিন বছর না হওয়া পর্যন্ত পরিবার এই অর্থ পাবে।
- ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভুটানে বার্ষিক জন্মসংখ্যা প্রায় ২৬ শতাংশ কমেছে।
- কর্মসংস্থানের খোঁজে বিদেশে, বিশেষত অস্ট্রেলিয়ায়, যুবকদের ব্যাপক অভিবাসন নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার।
ভুটানকে সাধারণত সুখের দেশ হিসেবেই চেনে বিশ্ব। “গ্রস ন্যাশনাল হ্যাপিনেস” বা জাতীয় সুখ সূচকের জন্য আন্তর্জাতিক পরিচিতি পাওয়া এই ছোট্ট হিমালয় রাষ্ট্র এবার এক ভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে—সন্তান জন্মের হার দ্রুত কমে যাচ্ছে। আর সেই কারণেই সরকার এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা একসময় ইউরোপ ও পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশে দেখা গিয়েছিল। সন্তান জন্ম দিতে পরিবারগুলিকে সরাসরি আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভুটান সরকার।
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ৪ জুন থেকে তৃতীয় সন্তান এবং তার পরবর্তী প্রতিটি সন্তানের জন্য পরিবারকে মাসে ১০,০০০ নুলট্রাম (প্রায় ১০৫ মার্কিন ডলার) করে দেওয়া হবে। শিশুর বয়স তিন বছর পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত এই সহায়তা চালু থাকবে। শুধু নতুন জন্ম নেওয়া শিশু নয়, যেসব তৃতীয় বা তার পরবর্তী সন্তান ইতিমধ্যেই জন্মেছে কিন্তু এখনও তিন বছর বয়স পূর্ণ করেনি, তারাও এই সুবিধার আওতায় আসবে।
ভুটানের মন্ত্রিপরিষদ সচিব কেসাং ডেকি স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এই সুবিধা কেবল তৃতীয় সন্তানের জন্য নয়; দ্বিতীয় সন্তানের পর যত সন্তানই জন্মাক, প্রত্যেকের ক্ষেত্রেই একই প্রণোদনা প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ কোনও পরিবার চাইলে তিন, চার, পাঁচ কিংবা আরও বেশি সন্তান নিলেও সরকারি সহায়তা পাবে।
কেন এমন সিদ্ধান্ত?
কারণ পরিসংখ্যান ভুটান সরকারের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ২০১৫ সালে দেশে মোট জন্মসংখ্যা ছিল ১১,০০১। ২০২৪ সালে তা নেমে এসেছে ৮,১৫৩-এ। অর্থাৎ এক দশকেরও কম সময়ে জন্মহার প্রায় ২৬ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে মোট উর্বরতার হার বা একজন নারীর গড় সন্তানসংখ্যা নেমে এসেছে প্রতিস্থাপন স্তরের কাছাকাছি, অর্থাৎ ২.১-এর আশপাশে। এই হার দীর্ঘদিন বজায় থাকলে ভবিষ্যতে জনসংখ্যা স্থবির হয়ে পড়তে পারে কিংবা কমতেও শুরু করতে পারে।
ভুটান সরকারের মতে, ক্রমহ্রাসমান ও বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যাওয়া জনসংখ্যা দেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং সামাজিক কাঠামোর জন্য দীর্ঘমেয়াদে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে গেলে উৎপাদনশীলতা, কর আদায় এবং সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার উপর চাপ বাড়বে।
তবে শুধু কম জন্মহারই সমস্যা নয়। আরেকটি বড় উদ্বেগ হল যুবসমাজের দেশত্যাগ। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বহু তরুণ-তরুণী উন্নত শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সন্ধানে বিদেশে চলে যাচ্ছেন। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ভুটানি যুবকদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হয়ে উঠেছে। ফলে একদিকে জন্মহার কমছে, অন্যদিকে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর একটি অংশ দেশ ছাড়ছে। এই দ্বৈত চাপ ভবিষ্যতের জনসংখ্যা কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সরকার।
বিশ্বজুড়ে একই প্রবণতা
ভুটান একা নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, হাঙ্গেরি, সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বহু দেশই কম জন্মহারের সমস্যায় ভুগছে। এসব দেশের অনেকেই নগদ অর্থ, করছাড়, মাতৃত্বকালীন ও পিতৃত্বকালীন ছুটি, শিশুসেবা ভর্তুকি এবং আবাসন সহায়তার মতো নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু গবেষণা বলছে, শুধু অর্থ দিলেই জন্মহার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায় না। সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে কর্মসংস্থান, আবাসন, শিক্ষা ব্যয়, কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবনের ভারসাম্যসহ নানা বিষয় জড়িত থাকে।
ভুটান সরকারও এই বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন। চলতি বছরের মার্চ মাসে সরকার জানিয়েছিল, শুধু নগদ প্রণোদনা যথেষ্ট নয়; কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যুবকদের দেশে ধরে রাখা, শিশু পরিচর্যা ব্যবস্থা এবং পরিবারবান্ধব সামাজিক নীতির মতো বৃহত্তর বিষয়গুলিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরে অবশ্য প্রয়োজনীয় অর্থের ব্যবস্থা করে প্রণোদনা প্রকল্প চালু করা হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই উদ্যোগ কতটা সফল হবে? তার উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সন্তান জন্মদানকে আর কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না ভুটান। দেশের ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, অর্থনীতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে বিষয়টি সরাসরি জড়িত বলে মনে করছে সরকার। আর সেই কারণেই সুখের দেশ ভুটান আজ নাগরিকদের আরও বেশি সন্তান নেওয়ার জন্য সরাসরি অর্থ দিতে প্রস্তুত।