বাংলাস্ফিয়ার: ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ এবং পরীক্ষাব্যবস্থার সর্বাত্মক সংস্কারের আশ্বাসের পর অবশেষে পরিসমাপ্তি ঘটল রাজধানীর যন্তর-মন্তরে টানা আন্দোলন চালানো জেন-জেড ছাত্র-যুবদের অবস্থান কর্মসূচির। প্রায় এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা এই আন্দোলনের শেষ দিনে আবেগ, আনন্দ, অশ্রু, আলিঙ্গন এবং সামাজিক মাধ্যমে স্মৃতি ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য দৃশ্যের সাক্ষী থাকল দিল্লি।

সকাল থেকেই যন্তর-মন্তরের পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর। কেউ হাতে জাতীয় পতাকা, কেউ বা আন্দোলনের প্রতীকী পতাকা নিয়ে হাজির হন। একে অপরকে লাড্ডু খাইয়ে শুভেচ্ছা জানান আন্দোলনকারীরা। অনেকে স্লোগান তোলেন— “এই লড়াই শেষ নয়, নতুন পথচলার শুরু।” আবার কেউ বলেন, “আমরা জিতেছি, কারণ আমরা হাল ছাড়িনি।”

আন্দোলনের অন্যতম মুখ অভিজিৎ দিপকে সহ আন্দোলনের নেতৃত্বে থাকা তরুণেরা মঞ্চ থেকে সমর্থকদের ধন্যবাদ জানান। তাঁরা বলেন, এই সাফল্য কোনও ব্যক্তি বা সংগঠনের নয়, দেশের লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রীর। পরীক্ষায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিই ছিল এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য, এবং সেই দাবিকে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসাই তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন।

সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত আসে আন্দোলনের শিবির গুটিয়ে নেওয়ার সময়। দীর্ঘদিন একসঙ্গে থাকা বহু ছাত্রছাত্রী চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। কেউ কেউ আলিঙ্গন করে বিদায় নেন। এক তরুণী বলেন, “এখানে এসে আমি শুধু আন্দোলন করিনি, নতুন একটা পরিবার পেয়েছি।” আর এক ছাত্রের কথায়, “এখান থেকে বাড়ি ফিরছি ঠিকই, কিন্তু প্রয়োজন হলে আবার ফিরে আসব।”

আন্দোলনের অন্যতম জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ‘ককরোচ’। নিজেদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ’ বলে পরিচয় দেওয়া এই তরুণেরা শেষ দিনেও সেই পরিচয়কেই গর্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। বিদায়ের সময় অনেকেই বলেন, “সহযোদ্ধা ককরোচদের সঙ্গে আবার দেখা হবে।” এই উক্তিই দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

শেষ দিনের আর এক বিশেষ আকর্ষণ ছিল অসংখ্য রিল ও ভিডিও তৈরি। যন্তর-মন্তরের বিভিন্ন কোণে দাঁড়িয়ে ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনের স্মৃতি, রাত জেগে কাটানো দিন, গান, স্লোগান এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘাতের মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও নিয়ে ছোট ছোট চলচ্চিত্র তৈরি করেন। অনেকেই লেখেন, “এই কয়েকটা দিন আমাদের জীবন বদলে দিয়েছে।” কিছু ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষাধিক দর্শক পায়।

আন্দোলনকারীদের জন্য স্থানীয় মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা সমর্থকদের ভূমিকার কথাও উঠে আসে বক্তৃতায়। কেউ খাবার দিয়েছেন, কেউ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন, কেউ আবার রাত জেগে নিরাপত্তার দায়িত্ব নিয়েছেন। তাঁদের প্রত্যেককে প্রকাশ্যে ধন্যবাদ জানানো হয়।

তবে নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আন্দোলন প্রত্যাহার মানেই দাবি শেষ হয়ে যাওয়া নয়। পরীক্ষা সংস্কারের জন্য ঘোষিত টাস্ক ফোর্সের কাজ, নতুন আইন বাস্তবায়ন এবং ভবিষ্যতে পরীক্ষা পরিচালনার স্বচ্ছতা— সবকিছুর উপর নজর রাখা হবে। প্রয়োজনে ফের রাস্তায় নামার বার্তাও দেন তাঁরা।

শেষ বিকেলে যখন ব্যানার খুলে নেওয়া হচ্ছিল, তখন অনেকেই স্মারক হিসেবে পোস্টার, ব্যাজ বা পতাকা সংগ্রহ করে রাখেন। কেউ মাটির একমুঠো ধুলোও সঙ্গে নিয়ে যান, স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে। আন্দোলনের দেওয়ালে লেখা স্লোগানের সামনে দাঁড়িয়ে অসংখ্য ছবি তোলেন অংশগ্রহণকারীরা।

অনেক অভিভাবকও শেষ দিনে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মতে, এই আন্দোলন শুধু পরীক্ষা-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ছিল না, এটি ছিল যুবসমাজের আত্মসম্মান ও ভবিষ্যতের লড়াই। একজন অভিভাবকের কথায়, “আমার ছেলে এখানে এসে শুধু প্রতিবাদ করতে শেখেনি, গণতন্ত্রের মূল্যও শিখেছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে যে সামাজিক মাধ্যমের প্রজন্মও প্রয়োজনে দীর্ঘমেয়াদি, শান্তিপূর্ণ এবং সংগঠিত গণআন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম। ডিজিটাল প্রচার ও মাটির লড়াই— দুইয়ের সমন্বয়ে এই আন্দোলন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

যন্তর-মন্তরের সেই অস্থায়ী শিবির শেষ পর্যন্ত গুটিয়ে গেল। কিন্তু বিদায়বেলায় ছাত্রছাত্রীদের কণ্ঠে একটাই প্রতিশ্রুতি বারবার শোনা গেল— “লড়াই শেষ নয়। প্রয়োজনে আবার ফিরব, সহযোদ্ধা ককরোচদের সঙ্গে।” সেই অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই আপাতত পর্দা নামল সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ছাত্র আন্দোলনের।