Home International ‘সম্মানের’ নামে ২০ বছরের খালিদাকে হত্যা, কাঠগড়ায় দাদু-মামা

‘সম্মানের’ নামে ২০ বছরের খালিদাকে হত্যা, কাঠগড়ায় দাদু-মামা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
10 views 4 minutes read
A+A-
Reset

রাতের শিফটে কাজ করছিলেন মোহাম্মদ রমজান। করাচির উপকণ্ঠের একটি সিমেন্ট কারখানায় কর্মরত সেই বাবার কাছে গভীর রাতে এল ফোন। জানানো হল, তাঁর ২০ বছরের মেয়ে খালিদা চান্দিওকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে পাকিস্তানের দক্ষিণাঞ্চলীয় সিন্ধ প্রদেশের খাইরপুর জেলার টান্ডো মাস্তি গ্রামে। বাড়ি ফিরে স্ত্রী নাবুলকে নিয়ে এখনও সেই রাতের আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পারেননি রমজান।

নাবুলের অভিযোগ, গভীর রাতে বাড়ি থেকে খালিদাকে টেনে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর বাড়ি থেকে কয়েকশো মিটার দূরে গুলি করে হত্যা করা হয় তাঁকে।

পুরো হত্যাকাণ্ডের ভিডিও করা হয়েছিল। পরে সেই ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অসহায় বাবা-মাকেও সেই ভিডিও দেখতে হয়েছে।

“ওর চিৎকার এখনও আমার কানে বাজে। আমরা ওকে বাঁচাতে পারিনি,” কাঁদতে কাঁদতে বলেন নাবুল।

‘কারি’ ঘোষণা করেই কি হত্যা?

পুলিশের দাবি, খালিদাকে ‘কারি’ ঘোষণা করা হয়েছিল। সিন্ধি সমাজে এই শব্দটি এমন এক নারীর ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়, যার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পর্কের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বহু ক্ষেত্রে এই অভিযোগই তথাকথিত ‘সম্মানরক্ষার’ নামে হত্যার অজুহাত হয়ে দাঁড়ায়।

তদন্তকারীদের অভিযোগ, এক প্রভাবশালী উপজাতীয় নেতার নির্দেশে খালিদার দাদু এবং তাঁর মামা গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করেন। ঘটনায় ইতিমধ্যেই তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আরও একজনের খোঁজ চলছে। মামলাটি এখন আদালতে বিচারাধীন।

খালিদার বাবা রমজানের প্রশ্ন, তাঁর মেয়ে যদি সত্যিই কোনও অপরাধ করে থাকতেন, তাহলে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হল না কেন?

“সে আজও বেঁচে থাকত। আমাদের সঙ্গে থাকতে পারত, অথবা কোনও সুরক্ষা কেন্দ্রে আশ্রয় পেত,” বলেন তিনি।

স্বামী নিখোঁজ, ফিরেছিলেন বাবা-মায়ের বাড়িতে

প্রায় পাঁচ বছর আগে খালিদার বিয়ে হয়েছিল তাঁরই এক খুড়তুতো ভাইয়ের সঙ্গে। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে তাঁর স্বামী নিখোঁজ হয়ে যান। করাচির একটি কারখানায় কাজ করা ওই ব্যক্তির দীর্ঘদিন কোনও খোঁজ না মেলায় খালিদা বাবা-মায়ের বাড়িতে ফিরে আসেন।

হত্যার প্রায় পাঁচ মাস আগে তিনি গ্রামে ফিরে এসেছিলেন বলে জানা গিয়েছে।

তদন্তকারীদের বক্তব্য, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল রাতে গ্রামের কয়েকজন পুরুষ আত্মীয় এবং বাসিন্দা খালিদার বিরুদ্ধে অন্য এক পুরুষের সঙ্গে সম্পর্ক থাকার অভিযোগ তোলেন। এরপর বিষয়টি স্থানীয় উপজাতীয় সালিশি সভা বা ‘জিরগা’র সামনে নিয়ে যাওয়া হয়।

সেখানেই খালিদাকে ‘কারি’ ঘোষণা করা হয় বলে অভিযোগ।

তদন্তকারীদের দাবি, এর পরই তিন ব্যক্তি তাঁকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেন।

নিষিদ্ধ হলেও জিরগার প্রভাব অটুট

পাকিস্তানের আদালত বহু আগেই জিরগাকে ফৌজদারি মামলায় রায় দেওয়া থেকে নিষিদ্ধ করেছে। কিন্তু মানবাধিকার সংগঠনগুলির অভিযোগ, বিশেষ করে সিন্ধের গ্রামীণ এলাকায় নারী-সংক্রান্ত বিরোধ মেটাতে এই অনানুষ্ঠানিক উপজাতীয় পরিষদের প্রভাব এখনও প্রবল।

খালিদার হত্যাকাণ্ড সেই বাস্তবতারই আরেকটি নির্মম উদাহরণ বলে মনে করছেন অধিকারকর্মীরা।

পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন এবং নারী অধিকার সংগঠন সিন্ধ সুহাই সাথের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২০ জুন পর্যন্ত শুধু সিন্ধ প্রদেশেই ১১২ জন নারী তথাকথিত ‘সম্মানরক্ষার’ নামে হত্যার শিকার হয়েছেন।

পুলিশের তথ্য উদ্ধৃত করে মানবাধিকার কমিশন জানিয়েছে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে অন্তত ৪৭০টি এই ধরনের হত্যাকাণ্ড নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১২৬টি ঘটেছে সিন্ধে।

তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বহু হত্যাকাণ্ড আত্মহত্যা বা দুর্ঘটনা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ায় প্রকৃত চিত্র অনেক সময় সামনে আসে না।

‘কারি’ অভিযোগ কি সম্পত্তির লড়াইয়ের হাতিয়ার?

ঘোটকি, কাশমোর ও জ্যাকোবাবাদ জেলার প্রাক্তন পুলিশ প্রধান এবং বর্তমানে ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল আসাদ রাজা মনে করেন, এই ধরনের হত্যার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর মধ্যে।

তাঁর মতে, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের পুরুষ আত্মীয়দের সম্পত্তি হিসেবে দেখা হয়। ‘কারি’ অভিযোগ তখন শুধু তথাকথিত সম্মানরক্ষার বিষয় থাকে না—জমি, উত্তরাধিকার বা উপজাতীয় বিরোধ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

রাজা বলেন, বহু ক্ষেত্রে কোনও প্রমাণ ছাড়াই একজন নারীকে ‘কারি’ ঘোষণা করা হয়। এর ফলে তাঁকে হত্যা করে সম্পত্তি দখল বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ তৈরি হয়।

তাঁর আরও অভিযোগ, একই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা কখনও কখনও অপরাধ তদন্তেও প্রভাব ফেলে। ভুক্তভোগী নারী, অভিযুক্ত পুরুষ, অভিযোগকারী পুরুষ, সালিশকারীরা পুরুষ—এমনকি তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তারাও অনেক সময় একই সামাজিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠেন।

তাই নারী নির্যাতনের মামলায় আরও বেশি নারী পুলিশ কর্মকর্তা ও তদন্তকারীকে যুক্ত করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

“শুধু শাস্তি কঠোর করলেই হবে না। আইন যাতে প্রতিটি ক্ষেত্রে কার্যকরভাবে প্রয়োগ হয়, সেটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন রাজা।

পরিবারই যখন অভিযুক্ত

নারী অধিকার বিষয়ক আইনজীবী শাজিয়া নিজামানির মতে, অভিযুক্তরা যদি পরিবারেরই সদস্য হন, তাহলে বিচারপ্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে ওঠে।

অনেক সাক্ষী পরে আদালতে সাক্ষ্য দিতে অনীহা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি মামলা তুলে নেওয়া, আপস করা বা গ্রাম্য সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে ফেলার জন্য পরিবারের ওপরও প্রবল চাপ তৈরি হয়।

খালিদা চান্দিওর হত্যাকাণ্ড তাই শুধু একটি পরিবারের трагেডি নয়—‘সম্মান’-এর নামে নারীর জীবন, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করার দীর্ঘস্থায়ী সামাজিক কাঠামোরও এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles