বাংলাস্ফিয়ার: নালসার বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬ সালের কোনও স্নাতককে আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্ত না করার বিতর্কিত নির্দেশ প্রত্যাহার করেও সমালোচনা এড়াতে পারল না বার কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া। ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের তীব্র ভর্ৎসনার পরে এবার সংস্থাটির ভূমিকার নিন্দা করে খোলা চিঠি দিলেন নালসারের প্রাক্তনীরা। তাঁদের অভিযোগ, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে বার কাউন্সিল যে ভাষায় কথা বলেছে, তা কেবল অসংবেদনশীল নয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন এবং মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের উপর সরাসরি আঘাত।

বিতর্কের সূত্রপাত নালসারের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তকে আমন্ত্রণ জানানোর বিরোধিতা ঘিরে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১,৪০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৪৫০ জন ওই আমন্ত্রণের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন। সেই প্রতিবাদের প্রতিক্রিয়ায় বৃহস্পতিবার বার কাউন্সিল রাজ্য বার কাউন্সিলগুলিকে নির্দেশ দিয়েছিল, পরবর্তী নির্দেশ না আসা পর্যন্ত নালসারের ২০২৬ সালের কোনও স্নাতককে আইনজীবী হিসাবে নথিভুক্ত করা যাবে না। অর্থাৎ, প্রতিবাদে কার ভূমিকা কতটা, তা যাচাই না করেই গোটা স্নাতক ব্যাচের পেশাগত ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে দেওয়া হয়েছিল।

তীব্র সমালোচনার মুখে বার কাউন্সিল দ্রুত নির্দেশটি প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু নালসারের প্রাক্তনীরা মনে করছেন, নির্দেশ প্রত্যাহারই যথেষ্ট নয়। খোলা চিঠিতে তাঁরা লিখেছেন, শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলির স্বশাসনের প্রশ্নে বার কাউন্সিল যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েছে, তাঁরা তার নিন্দা করছেন। তাঁদের মতে, সংস্থাটির পদক্ষেপে শিক্ষার্থীদের প্রতি সহমর্মিতার অভাব, তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি উদাসীনতা এবং মতপ্রকাশের মৌলিক অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা স্পষ্ট হয়েছে।

প্রাক্তনীদের বক্তব্য, এই বিষয়ে চিঠি বা নির্দেশ জারি করার কোনও আইনি এক্তিয়ারই বার কাউন্সিলের ছিল না। আরও উদ্বেগজনক হল, প্রথম চিঠির ভাষা। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের চাপ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা ফুটে উঠেছিল। মতপ্রকাশ রুদ্ধ করার লক্ষ্যে শাস্তির হুমকি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ-তরুণীদের উপর প্রবল মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে বলেও তাঁরা সতর্ক করেছেন।

খোলা চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, প্রধান বিচারপতিকে সমাবর্তনে আমন্ত্রণ জানানো নিয়ে মতপার্থক্য নালসারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আইনি পেশা এবং আইনশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি বিধিবদ্ধ সংস্থা সেই সুযোগে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ‘ডাইনি-খোঁজা’ অভিযান শুরু করতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত প্রশ্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিসরের বিষয়; সেখানে বার কাউন্সিলের হস্তক্ষেপের অধিকার নেই।

প্রাক্তনীরা বিশেষভাবে আপত্তি তুলেছেন বার কাউন্সিলের প্রথম চিঠিতে ব্যবহৃত শব্দ ও অভিযোগ নিয়ে। সেখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ‘দলাদলি’, ‘নোংরা রাজনীতি’, ‘কুৎসিত রাজনীতি’ এবং শিক্ষার্থীদের ‘উসকানি ও ভুল পথে চালিত করার’ মতো অভিযোগ আনা হয়েছিল। তাঁদের বক্তব্য, কোনও প্রমাণ ছাড়া এমন শব্দ ব্যবহার কেবল অরুচিকর নয়; আইনি পেশার মর্যাদা রক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে আইনজীবীদের ভূমিকার কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন নালসারের প্রাক্তনীরা। তাঁদের বক্তব্য, ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মতাদর্শের আইনজীবীরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রয়োগ করে একত্রিত হয়েছিলেন। বর্তমানের আইন শিক্ষার্থীরা সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী। ছাত্রজীবনই নতুন ভাবনা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রশ্ন তোলা এবং প্রতিষ্ঠিত মতকে চ্যালেঞ্জ করার সময়। সেই পরিসরকে ভয় দেখিয়ে সংকুচিত না করে সুরক্ষিত ও লালন করা প্রয়োজন।

এর আগে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত নিজেই বার কাউন্সিলের পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেন। প্রত্যাহৃত নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দায়ের হওয়া একটি আবেদনের শুনানিতে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা তাঁকে চিঠি লিখেছেন এবং বিষয়টি তাঁর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের সরাসরি সংলাপ। এর মধ্যে বার কাউন্সিলের ঢোকার কোনও কারণ নেই। শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে বলেও তিনি স্পষ্ট করে দেন। বার কাউন্সিলের পদক্ষেপকে তিনি ‘সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়’ এবং ‘একেবারেই অনভিপ্রেত’ বলে বর্ণনা করেন।

এই ঘটনায় বার কাউন্সিলের সমালোচনায় সরব হয়েছে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদও। সংগঠনটির বক্তব্য, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত ভূমিকা নির্ধারণ না করে গোটা স্নাতক ব্যাচের উপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হলে এমন বহু শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও পেশাগত ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যাঁদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিবাদের কোনও যোগই নেই।

বিদ্যার্থী পরিষদ বলেছে, ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ না করে সম্মিলিত শাস্তি দেওয়া ন্যায়সঙ্গত নয়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে ক্ষমতা প্রয়োগের সময় যথাযথ প্রক্রিয়া, ন্যায্যতা এবং স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতি মেনে চলতেই হবে। ফলে নালসার-বিতর্ক এখন আর শুধু একটি সমাবর্তন অনুষ্ঠান বা প্রধান বিচারপতিকে ঘিরে প্রতিবাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বশাসন, শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদের অধিকার এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতার সীমা—এই তিনটি মৌলিক প্রশ্নই এখন বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে।