বাংলাস্ফিয়ার: দেশের ৮০তম স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লার প্রাচীর থেকে প্রায় ৭৫ মিনিটের ভাষণ দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সময়ের নিরিখে গত চার বছরের মধ্যে এটিই তাঁর সংক্ষিপ্ততম স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতা। গত বছর ১০৩ মিনিটের ভাষণ দিয়ে নিজের আগের রেকর্ড ভেঙেছিলেন তিনি। তার তুলনায় এ বারের বক্তব্য ছিল অনেকটাই সংহত। তবে ভাষণের পরিসর ছোট হলেও আত্মনির্ভরতা, যুবশক্তি, প্রযুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্য—সব ক’টি পরিচিত বিষয়ই ছুঁয়ে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এ দিন টানা ১৩তম বার লালকেল্লায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন মোদী। জওহরলাল নেহরুর পরে তিনিই দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী, যিনি টানা ১৩টি স্বাধীনতা দিবসে লালকেল্লা থেকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। বক্তব্যে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের শ্রদ্ধা জানানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির প্রতিও সমবেদনা জানান তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশের তরুণ প্রজন্ম। তিনি যুবকদের বড় স্বপ্ন দেখতে এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দৃঢ় সংকল্প নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। আগামী এক বছরে এক কোটি তরুণকে কৃত্রিম মেধা ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেন মোদী। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের জন্য বিনামূল্যে অন্তর্জাল-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালুর কথাও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, ভারতের ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে বড় শক্তি হবে দেশের যুবসমাজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা।

দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রশ্নে ফের ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘স্থানীয় পণ্যের পক্ষে সওয়াল’-এর ডাক দেন প্রধানমন্ত্রী। প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম, বৈদ্যুতিন পণ্য, রেল কামরা, খাদি এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে গত এক দশকে উৎপাদন বৃদ্ধির পরিসংখ্যান তুলে ধরেন তিনি। বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কমিয়ে ভারতকে উৎপাদন ও উদ্ভাবনের আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে পরিণত করার লক্ষ্যও পুনর্ব্যক্ত করেন।

শক্তি নিরাপত্তার প্রসঙ্গে আগামী কয়েক বছরে পাঁচ থেকে আটটি অর্ধপরিবাহী নির্মাণকেন্দ্র এবং ২০৪৭ সালের মধ্যে ১০০ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেন মোদী। বিশ্বের প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথে ভারত এগোচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর মতে, আত্মনির্ভরতা মানে বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়; বরং নিজের শক্তি বাড়িয়ে সমমর্যাদায় বিশ্বের সঙ্গে লেনদেন করা।

জাতীয় নিরাপত্তা নিয়েও কঠোর বার্তা দেন প্রধানমন্ত্রী। সশস্ত্র মাওবাদী কার্যকলাপ অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে এলেও ‘মস্তিষ্কের মাওবাদী’দের চিহ্নিত করে সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন করার কথা বলেন তিনি। এই শব্দবন্ধ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কের সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বিরোধীদের একাংশের মতে, সরকারের সমালোচকদের নতুন করে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে এই মন্তব্যে।

এ দিনের অনুষ্ঠানে প্রথমবার লালকেল্লায় ‘বন্দে মাতরম’ পরিবেশিত হয়। গানটির ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে জাতীয় উৎসবের অনুষ্ঠানে বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ ২২টি ভাষায় কৃত্রিম মেধার সাহায্যে তাৎক্ষণিক অনুবাদের ব্যবস্থাও রাখা হয়। প্রায় পাঁচ হাজার বিশেষ অতিথি অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।

অন্য দিকে, লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী এবং কংগ্রেস সভাপতি তথা রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খাড়গের অনুপস্থিতি ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক বাধে। দু’জনেই লালকেল্লার মূল অনুষ্ঠানে যোগ দেননি। যদিও কংগ্রেসের স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনে তাঁরা অংশ নেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

রাহুলকে এ বার সরকারি পদমর্যাদা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের পরেই বসানো হবে বলে অনুষ্ঠানের আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছিল। আগের অনুষ্ঠানে তাঁকে পিছনের সারিতে বসানোর অভিযোগ তুলে কংগ্রেস ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। ফলে এ বারও তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কংগ্রেস আনুষ্ঠানিক ভাবে অনুপস্থিতির নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি।

বিজেপি অবশ্য দুই বিরোধী নেতার সিদ্ধান্তকে জাতীয় উৎসবের প্রতি অসম্মান বলে আক্রমণ করেছে। কংগ্রেসের পাল্টা বক্তব্য, স্বাধীনতা দিবস কোনও একটি সরকার বা দলের একচেটিয়া অনুষ্ঠান নয়। এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই মোদীর সংক্ষিপ্ত ভাষণ যেন দিনের দ্বিতীয় আলোচ্য হয়ে উঠেছে—সময়ের হিসাবে ছোট, কিন্তু ঘোষণা ও রাজনৈতিক বার্তার হিসাবে যথেষ্ট ঘন।