পিত্তথলি নেই, তবু কেন ছুটতে হয় শৌচাগারে?

যা জানা জরুরি
- পিত্তথলি বাদ দেওয়ার অস্ত্রোপচারের পর অনেকেরই হঠাৎ বদলে যায় পেটের স্বাভাবিক ছন্দ।
- খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শৌচাগারে ছুটতে হয়, মল হয়ে যায় নরম বা জলীয়, কখনও আবার মলত্যাগের তাগিদ এতটাই প্রবল হয় যে সামলানো কঠিন।
- অস্বস্তিকর হলেও এই সমস্যা একেবারে অস্বাভাবিক নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পিত্তথলি বাদ দেওয়ার অস্ত্রোপচারের পর অনেকেরই হঠাৎ বদলে যায় পেটের স্বাভাবিক ছন্দ। খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই শৌচাগারে ছুটতে হয়, মল হয়ে যায় নরম বা জলীয়, কখনও আবার মলত্যাগের তাগিদ এতটাই প্রবল হয় যে সামলানো কঠিন। অস্বস্তিকর হলেও এই সমস্যা একেবারে অস্বাভাবিক নয়। এর পিছনে রয়েছে পিত্তরসের প্রবাহে অস্ত্রোপচারের পর হওয়া পরিবর্তন।
পিত্তথলি যকৃতের নীচে থাকা ছোট একটি অঙ্গ, যেখানে যকৃতে তৈরি পিত্তরস জমা ও ঘন হয়। বিশেষ করে চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী সেই পিত্তরস ক্ষুদ্রান্ত্রে পৌঁছয়। খাবারের চর্বি ভাঙা এবং শরীরে তা শোষণে পিত্তরস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
পিত্তথলি বাদ গেলেও যকৃত পিত্তরস তৈরি করা বন্ধ করে না। তবে সেটি জমিয়ে রাখার জায়গা আর থাকে না। ফলে পিত্তরস অপেক্ষাকৃত অবিরাম ভাবে অন্ত্রে প্রবেশ করে। কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পিত্ত-অম্ল বৃহদন্ত্রে পৌঁছে যায়। সেখানে তা অন্ত্রের দেওয়ালকে উত্তেজিত করে জল নিঃসরণ বাড়াতে এবং অন্ত্রের চলাচল দ্রুত করতে পারে। ফল—জলীয় মল, পেটে মোচড় এবং হঠাৎ শৌচাগারে যাওয়ার তীব্র তাগিদ।
এই সমস্যাকে বলা হয় ‘পোস্ট-কোলেসিস্টেকটমি ডায়রিয়া’, অর্থাৎ পিত্তথলি অপসারণের পর হওয়া অতিসার। বেঙ্গালুরুর সাইটকেয়ার হাসপাতালের জিআই এবং এইচপিবি সার্জারি বিভাগের প্রবীণ পরামর্শদাতা চিকিৎসক আদিত্য ভি নারাগুন্ডের মতে, দীর্ঘস্থায়ী অতিসার সবার হয় না, তবে এটি চিকিৎসকদের পরিচিত একটি সমস্যা।
তবে কারও অস্ত্রোপচারের পর কোনও সমস্যা হয় না, আবার কারও কেন বারবার পেট খারাপ হয়—তার একটিমাত্র কারণ নেই। অন্ত্রে পৌঁছনো পিত্ত-অম্লের পরিমাণ, তা পুনরায় শোষণের ক্ষমতা, অন্ত্রের সংবেদনশীলতা, খাদ্যাভ্যাস এবং অন্ত্রের জীবাণুসমাজ—সবই এতে ভূমিকা রাখতে পারে। আগে থেকেই ইরিটেবল বাওয়েল সিনড্রোম বা অন্য হজমের সমস্যা থাকলে অস্বস্তি আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।
স্বস্তির প্রথম ধাপ খাবারে বদল
সমস্যা সামলানোর শুরুটা সাধারণত খাবারের প্লেট থেকেই। একবারে অনেকটা না খেয়ে অল্প অল্প করে বারবার খাওয়া যেতে পারে। অতিরিক্ত তেল, ঘি, মাখন, ভাজাভুজি, চর্বিযুক্ত মাংস এবং ভারী খাবার কমানোও উপকারী। বেশি চর্বি হজম করতে বেশি পিত্তরসের প্রয়োজন হয়, যা কিছু মানুষের ক্ষেত্রে অন্ত্রের গতিবিধি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ওটস, কলা, আপেল এবং ইসবগুলের ভুসির মতো দ্রবণীয় আঁশ মলের ঘনত্ব বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। এই আঁশ অন্ত্রের অতিরিক্ত জল শোষণ করার পাশাপাশি কিছুটা পিত্ত-অম্লও বেঁধে রাখতে পারে। তবে একসঙ্গে অনেকটা আঁশ খাওয়া ঠিক নয়। তাতে উল্টো পেট ফাঁপা বা অস্বস্তি বাড়তে পারে। ধীরে ধীরে পরিমাণ বাড়ানো এবং পর্যাপ্ত জল পান করাই ভাল।
কফি ও অন্যান্য ক্যাফিনযুক্ত পানীয়, অতিরিক্ত ঝাল খাবার এবং বেশি দুগ্ধজাত খাবারও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মলত্যাগের তাগিদ বাড়াতে পারে। কোন খাবারের পর সমস্যা বাড়ছে, তা বুঝতে কয়েক সপ্তাহের জন্য খাবার ও উপসর্গের একটি ডায়েরি রাখলে কারণ চিহ্নিত করা সহজ হতে পারে।
ওষুধ লাগতে পারে কখন?
খাদ্যাভ্যাস বদলানোর পরও সমস্যা না কমলে চিকিৎসক পিত্ত-অম্ল আবদ্ধকারী ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিতে পারেন। এগুলি অন্ত্রে অতিরিক্ত পিত্ত-অম্লকে বেঁধে তার উত্তেজক প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। ফলে মল কিছুটা ঘন হতে পারে এবং হঠাৎ মলত্যাগের তাগিদও কমতে পারে।
তবে এই ধরনের ওষুধ অন্য ওষুধের শোষণে বাধা দিতে পারে এবং কারও ক্ষেত্রে কোষ্ঠকাঠিন্যও ঘটাতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে এমন ওষুধ শুরু করা উচিত নয়।
প্রোবায়োটিক বা প্রিবায়োটিক খাবার নিয়েও অনেক কথা হয়। তবে এগুলির উপকার ব্যক্তি বিশেষে আলাদা হতে পারে। কোনও পরিপূরক নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
কখন আর অপেক্ষা নয়?
অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের ধরন ও দৈনন্দিন অভ্যাসে পরিবর্তন আনলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সমস্যা কমে যায়। কিন্তু অতিসার ছয় থেকে আট সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, দিনে বারবার হলে অথবা ঘুম, পুষ্টি ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
আর ওজন কমে যাওয়া, শরীর শুকিয়ে যাওয়া, মলে রক্ত, জ্বর, তীব্র পেটব্যথা, রাতে ঘুম ভেঙে অতিসার কিংবা পুষ্টির ঘাটতির লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া উচিত। কারণ সব সময় এর কারণ পিত্তথলি বাদ দেওয়ার অস্ত্রোপচার নাও হতে পারে; সংক্রমণ, অন্ত্রের প্রদাহ বা অন্য কোনও সমস্যাও থাকতে পারে।
পিত্তথলি না থাকলেও স্বাভাবিক জীবনযাপন সম্ভব। তবে অস্ত্রোপচারের পর বারবার শৌচাগারে ছুটতে হলে সেটিকে শুধু ‘স্বাভাবিক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ ভেবে চুপ করে থাকার দরকার নেই। কারণটা চিহ্নিত করা গেলে খাবার, জীবনযাপন এবং প্রয়োজনে চিকিৎসার সাহায্যে এই অস্বস্তিকর সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা যায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



