জাপানে শতায়ু আজ লক্ষাধিক

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ারঃ জাপানের শতায়ু মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।
- সুস্থ ভাবে বয়স বাড়ার বিষয়ে এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
- তবে দীর্ঘায়ুর সমস্ত কৃতিত্ব শুধু খাবার বা খাদ্যাভ্যাসকে দিলে ভুল হবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ারঃ জাপানের শতায়ু মানুষের সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। সুস্থ ভাবে বয়স বাড়ার বিষয়ে এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। তবে দীর্ঘায়ুর সমস্ত কৃতিত্ব শুধু খাবার বা খাদ্যাভ্যাসকে দিলে ভুল হবে। একশো বছর বেঁচে থাকার পিছনে একসঙ্গে কাজ করে অনেকগুলি বিষয়—বংশগতি, পুষ্টি, শারীরিক সক্রিয়তা, চিকিৎসার সুযোগ, ঘুম, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক সম্পর্ক এবং সামগ্রিক জীবনযাপন। খাদ্যাভ্যাস অবশ্যই তার একটি প্রধান স্তম্ভ। আর এ ক্ষেত্রে জাপানিদের বড় গুণ হল ধারাবাহিকতা: দশকের পর দশক ধরে তাঁরা কিছু খাদ্যাভ্যাস মেনে চলেছেন।
জাপানের ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে দীর্ঘায়ুর সম্পর্ক নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়। এই খাদ্যতালিকায় থাকে নানা ধরনের শাকসবজি, মাছ, সয়াবিন থেকে তৈরি খাবার, ভাত এবং গাঁজন প্রক্রিয়ায় তৈরি খাবার। সাধারণত এক-এক বারে খাওয়ার পরিমাণও তুলনায় কম থাকে।
তবে এই খাদ্যাভ্যাসের সুফল পেতে ভারতীয়দের জাপানিদের মতো খাওয়া শুরু করার প্রয়োজন নেই। তাঁদের খাওয়াদাওয়ার মূল নীতিগুলি নিজেদের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিলেই চলে। নীতিগুলি সহজ: যতটা সম্ভব কম প্রক্রিয়াজাত, বৈচিত্র্যময় খাবার খাওয়া; খাদ্যতালিকায় উদ্ভিজ্জ খাবার বেশি রাখা; পর্যাপ্ত প্রোটিন খাওয়া; পরিমাণে সংযম রাখা; এবং অতিরিক্ত চিনি,লবণ, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো।
আশার কথা, সুস্থ বার্ধক্যে সহায়ক বহু উপাদান আমাদের ঐতিহ্যবাহী খাবারেই রয়েছে। ডাল, রাজমা, ছোলা, অঙ্কুরিত শস্য, শাকসবজি, ফল, গোটা শস্য, জোয়ার-বাজরার মতো দানাশস্য, বাদাম, বিভিন্ন বীজ, দই এবং প্রথাগত গাঁজানো খাবার থেকে পাওয়া যায় খাদ্যআঁশ, প্রোটিন, ভিটামিন, খনিজ ও অন্যান্য উপকারী পুষ্টি উপাদান। যাঁরা প্রাণিজ খাবার খান, তাঁদের প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে ডিম, মাছ, মুরগির মাংস এবং কম চর্বিযুক্ত অন্যান্য প্রোটিনের উৎসও সহায়ক হতে পারে।
একই সঙ্গে মনে রাখা দরকার, আধুনিক জীবনে আমাদের খাওয়াদাওয়া অনেকটাই বদলেছে। পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার, চিনিযুক্ত পানীয়, মোড়কবন্দি মুখরোচক খাবার, ডুবো তেলে ভাজা পদ এবং অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের চল বেড়েছে। এগুলি একেবারে বাদ দিতেই হবে, এমন নয়, কিন্তু দৈনন্দিন খাওয়াদাওয়ার ভিত্তি যেন এগুলি না হয়ে ওঠে।
অনেক ভারতীয়ের ক্ষেত্রেই কয়েকটি বাস্তবসম্মত পরিবর্তন উপকারী হতে পারে: অতিরিক্ত লবণ ও চিনি কমানো, কতটা খাওয়া হচ্ছে সে দিকে নজর দেওয়া এবং প্রতিদিনের খাবারে আঁশ ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়ানো। সাধারণ একটি ভারতীয় খাবারের থালা তাই সাজানো যেতে পারে শাকসবজি, প্রোটিনের উৎস, আঁশসমৃদ্ধ শর্করার উৎস এবং স্বাস্থ্যকর চর্বির কোনও উৎস দিয়ে।
যেমন, ডাল-সবজি-রুটি; কিংবা রাজমার সঙ্গে বাদামি চালের ভাত ও সালাদ; অথবা প্রচুর সবজিযুক্ত খাবারের সঙ্গে দই। দামি কোনও বিশেষ ‘দীর্ঘায়ুর খাদ্যতালিকা’ ছাড়াই এ ভাবে একই মূল নীতি অনুসরণ করা সম্ভব।
দীর্ঘায়ু নিয়ে গবেষণার সম্ভবত সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল, খাদ্যাভ্যাসকে আলাদা করে দেখা যায় না। নিয়মিত শরীরচর্চা, পেশির শক্তি বজায় রাখা, পর্যাপ্ত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ সামলানো, তামাক এড়ানো, মদ্যপান সীমিত রাখা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যপরীক্ষা—সবই সুস্থ ভাবে বয়স বাড়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা নেয়।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত প্রোটিন এবং পেশির শক্তি বাড়ানোর নিয়মিত ব্যায়াম পেশির ক্ষয় ঠেকাতে সাহায্য করতে পারে। চলাফেরার ক্ষমতা, শারীরিক শক্তি এবং নিজের কাজ নিজে করতে পারার সঙ্গে পেশির সুস্থতার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
জাপানের ওকিনাওয়ার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যাভ্যাস থেকে ভারতীয়রা বেশ কিছু নীতি গ্রহণ করতে পারেন। উদ্দেশ্য ওকিনাওয়ার খাবারের তালিকা হুবহু অনুসরণ করা নয়; তার মূল ভাবনাকে আমাদের রোজকার খাবারে জায়গা দেওয়া।
প্রথমেই আসে বেশি করে শাকসবজি খাওয়ার কথা। ওকিনাওয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারে নানা ধরনের সবজি ও মূলজাতীয় খাবার থাকত। ভারতে তার অর্থ হতে পারে রোজকার খাবারে পালংশাক, মেথিশাক, লাউ, ঢেঁড়স, ঝিঙে, কুমড়ো, বাঁধাকপি, গাজর এবং অন্যান্য মরসুমি সবজির পরিমাণ বাড়ানো।
শর্করার উৎস বাছার সময় খাদ্যআঁশের দিকে নজর দেওয়াও জরুরি। মিষ্টি আলু এক সময় জাপানিদের প্রধান খাবারগুলির অন্যতম ছিল। ভারতীয়রা মূলত পরিশোধিত শস্যের উপর নির্ভর না করে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মিষ্টি আলু, অন্যান্য মূল ও কন্দ, গোটা শস্য এবং জোয়ার-বাজরার মতো দানাশস্য খেতে পারেন।
প্রোটিনের নিয়মিত উৎস হিসেবেও ডালজাতীয় খাবারের গুরুত্ব রয়েছে। ওকিনাওয়ার পুরনো খাদ্যাভ্যাসে সয়াবিন ও অন্য ডালজাতীয় শস্যের উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল। আমাদের রান্নাঘরেও ডাল, রাজমা, ছোলা, লোবিয়া, অঙ্কুরিত শস্য এবং সয়াবিনের নানা খাবার রয়েছে। এগুলি থেকে প্রোটিন ও খাদ্যআঁশ—দুই-ই পাওয়া যায়।
বয়স বাড়লে পর্যাপ্ত প্রোটিন খাওয়ার দিকে বিশেষ নজর দেওয়া প্রয়োজন। ওকিনাওয়ার ঐতিহ্যবাহী খাবারে মাছ এবং প্রোটিনের অন্যান্য উৎসও ছিল। ভারতীয়রা নিজেদের খাদ্যাভ্যাস ও পছন্দ অনুযায়ী ডিম, মাছ, মুরগির মাংস, দই, পনির, সয়াবিন ও ডাল বেছে নিতে পারেন। এগুলি পেশির পরিমাণ বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
খাবারে স্বাদ আনতে অতিরিক্ত লবণের উপর নির্ভর করারও প্রয়োজন নেই। জিরে, ধনে, আদা, রসুন, হলুদ ও লঙ্কার মতো আমাদের পরিচিত মশলাই খাবার সুস্বাদু করতে পারে। তাতে বাড়তি লবণের প্রয়োজন কমানো সহজ হয়।
অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার থাকুক মাঝেমধ্যে খাওয়ার তালিকায়। দৈনন্দিন আহারের ভিত্তি হোক যতটা সম্ভব কম প্রক্রিয়াজাত খাবার। চিনিযুক্ত পানীয়, মোড়কবন্দি মুখরোচক খাবার, ডুবো তেলে ভাজা পদ এবং অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত অন্যান্য খাবার কত ঘন ঘন খাওয়া হচ্ছে, সে দিকে নজর দেওয়া দরকার।
পরিমাণে নজর দেওয়ার অর্থ কোনও গোটা খাদ্যগোষ্ঠী বাদ দেওয়া নয়। ভাত বা রুটি ছেড়ে দেওয়াই এখানে শিক্ষা নয়। বরং তার পরিমাণের সঙ্গে বেশি সবজি ও পর্যাপ্ত প্রোটিনের ভারসাম্য রাখা প্রয়োজন।
শুধু কত বছর বাঁচলাম, তার চেয়ে কত বছর সুস্থ, সক্রিয় ও স্বনির্ভর থাকতে পারলাম—সেই প্রশ্নেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। শরীর সচল রাখা, মনকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখা এবং নিজের কাজ নিজে করার ক্ষমতা বজায় রাখার মধ্যেই জীবনের মান ধরে রাখার সুযোগ রয়েছে। তাই খাবারে বৈচিত্র্য রাখুন, যতটা সম্ভব কম প্রক্রিয়াজাত খাবার খান, সক্রিয় থাকুন, পেশির যত্ন নিন, সামাজিক সম্পর্ক ও মানসিক সুস্থতাকে গুরুত্ব দিন। এই অভ্যাসগুলিই হয়ে উঠুক রোজকার জীবনের অংশ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



