বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের তালিকা প্রকাশকারী জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম TasteAtlas বিশ্বের সবচেয়ে তীব্র গন্ধযুক্ত খাবারের তালিকায় হিং (Asafoetida)-কে অন্তর্ভুক্ত করায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ভারতীয় নেটিজেনদের একাংশের দাবি, হিংকে ‘দুর্গন্ধযুক্ত’ বলা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করার শামিল।
ইনস্টাগ্রামে প্রকাশিত পোস্টে TasteAtlas লিখেছে, তীব্র গন্ধযুক্ত বহু খাবারের জন্ম হয়েছিল মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনে। রেফ্রিজারেশনের যুগের আগে খাদ্য সংরক্ষণের জন্য মানুষ নানা পদ্ধতি—গাঁজন, লবণে সংরক্ষণ বা মাটির নিচে পুঁতে রাখা—অবলম্বন করত। সেই ঐতিহ্য থেকেই আজকের অনেক ‘তীব্র গন্ধের’ খাবারের উৎপত্তি।
পোস্টে উদাহরণ হিসেবে ফরাসি পনির, আইসল্যান্ডের হাকার্ল, দক্ষিণ কোরিয়ার হোংও-হোয়ে এবং আর্কটিক অঞ্চলের কিভিয়াক-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। TasteAtlas-এর বক্তব্য, এসব খাবারের গন্ধ যতই তীব্র হোক না কেন, তার পেছনে রয়েছে শতাব্দীপ্রাচীন ইতিহাস ও স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতি।
কিন্তু হিংয়ের নাম তালিকায় আসতেই আপত্তি জানান বহু ভারতীয়। একজন লিখেছেন, “হিং মোটেই দুর্গন্ধযুক্ত নয়। এটি রসুনের মতো ঝাঁঝালো গন্ধ দেয় এবং রান্নায় অনন্য স্বাদ আনে।” আরেকজনের মন্তব্য, “হিংয়ের গন্ধ প্রবল হতে পারে, কিন্তু তা দুর্গন্ধ নয়।” অন্য একজন বিস্ময় প্রকাশ করে লেখেন, “হিং? সত্যিই?”
কাঁচা হিংয়ের গন্ধ এত তীব্র কেন?
পুষ্টিবিদ ও ফিটনেস ডায়েটিশিয়ান অশ্লেষা যোশী-র মতে, হিংয়ের তীব্র গন্ধের জন্য দায়ী সালফার-সমৃদ্ধ উদ্বায়ী রাসায়নিক যৌগ। এই যৌগগুলির অনেকগুলিই রাসায়নিক গঠনের দিক থেকে রসুন ও পেঁয়াজের গন্ধ সৃষ্টিকারী উপাদানের সঙ্গে মিল রয়েছে।
তিনি জানান, কাঁচা অবস্থায় এই যৌগগুলির ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি হওয়ায় হিংয়ের গন্ধ অনেকের কাছে ঝাঁঝালো ও তীব্র বলে মনে হয়।
রান্না হলে গন্ধ বদলে যায় কেন?
অশ্লেষা যোশীর ব্যাখ্যা, হিং যখন গরম তেল বা ঘিতে ফোড়ন দেওয়া হয়, তখন ওই উদ্বায়ী যৌগগুলির রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে। ফলে কাঁচা অবস্থার তীব্র গন্ধ অনেকটাই কমে যায় এবং তার জায়গায় তৈরি হয় গভীর, সুস্বাদু ও ‘উমামি’ স্বাদ, যা রান্নার স্বাদ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এই কারণেই কাঁচা হিংয়ের গন্ধ যাঁদের কাছে অপ্রীতিকর মনে হয়, তাঁরাও রান্না করা খাবারে তার স্বাদ উপভোগ করেন।
কারও কাছে সুগন্ধ, কারও কাছে দুর্গন্ধ—কেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, গন্ধের অনুভূতি নির্ভর করে দুটি বিষয়ের ওপর—জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং সাংস্কৃতিক অভ্যাস।
অশ্লেষা যোশী বলেন, কিছু মানুষ জন্মগতভাবেই নির্দিষ্ট গন্ধের প্রতি বেশি সংবেদনশীল। তাই একই হিংয়ের গন্ধ একজনের কাছে মনোরম মনে হলেও অন্যজনের কাছে তা বিরক্তিকর হতে পারে।
তবে এর পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অভ্যাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যাঁরা ছোটবেলা থেকেই হিং দেওয়া রান্না খেয়ে বড় হয়েছেন, তাঁদের কাছে এই গন্ধ পরিচিত ও আরামদায়ক। বারবার একই গন্ধের সংস্পর্শে আসার ফলে মস্তিষ্ক সেটিকে ‘সুস্বাদু খাবারের গন্ধ’ হিসেবেই গ্রহণ করতে শেখে।
হিংয়ের স্বাস্থ্যগুণ কী?
হিং সাধারণত খুব অল্প পরিমাণে ব্যবহার করা হয়। ফলে এটি উল্লেখযোগ্য পুষ্টি জোগায় না। তবে এতে থাকা কিছু জৈব সক্রিয় উপাদানের কারণে এটি দীর্ঘদিন ধরেই হজমে সহায়ক মসলা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া যায়, হিংয়ে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট, প্রদাহরোধী এবং জীবাণুনাশক বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। বিশেষ করে গ্যাস, পেট ফাঁপা ও বদহজম কমাতে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দাবিগুলির অধিকাংশই পরীক্ষাগার বা প্রাণীর ওপর করা গবেষণার ভিত্তিতে; মানুষের ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
কতটা ব্যবহার নিরাপদ?
রান্নায় সাধারণত এক চিমটি হিংই যথেষ্ট। এতেই স্বাদ ও হজমের উপকার পাওয়া যায়।
তবে যাঁরা রক্ত পাতলা করার ওষুধ খান, যাঁদের রক্তক্ষরণের সমস্যা রয়েছে, অথবা গর্ভবতী নারী—তাঁদের বেশি পরিমাণে হিং বা হিংয়ের সম্পূরক গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।