স্বাস্থ্য

ধূমপানে বাড়ছে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি, অভ্যাস ছাড়লে আশার আলো: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • জেনিভা: ধূমপানের ক্ষতি ফুসফুস কিংবা হৃদ্‌যন্ত্রেই থেমে থাকে না।
  • সন্তানধারণের সম্ভাবনাও কমিয়ে দিতে পারে তামাকের ধোঁয়া।
  • বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশনায় উঠে এসেছে নারী ও পুরুষের প্রজননক্ষমতার উপর ধূমপানের বিরূপ প্রভাবের তথ্য।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

জেনিভা: ধূমপানের ক্ষতি ফুসফুস কিংবা হৃদ্‌যন্ত্রেই থেমে থাকে না। সন্তানধারণের সম্ভাবনাও কমিয়ে দিতে পারে তামাকের ধোঁয়া। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশনায় উঠে এসেছে নারী ও পুরুষের প্রজননক্ষমতার উপর ধূমপানের বিরূপ প্রভাবের তথ্য। মহিলাদের ক্ষেত্রে বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বৃদ্ধির পাশাপাশি পুরুষদের বীর্যের অস্বাভাবিকতা ও যৌন সমস্যার সঙ্গে ধূমপানের যোগ পাওয়া গিয়েছে। তবে অভ্যাস ছাড়লে পরিস্থিতির অর্থবহ উন্নতির সম্ভাবনাও রয়েছে।

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০২৬ সালের গবেষণাগুলির একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গিয়েছে, বর্তমানে ধূমপান করেন এমন মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি অধূমপায়ীদের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে, আগে ধূমপান করতেন কিন্তু এখন ছেড়ে দিয়েছেন, এমন মহিলাদের ঝুঁকি ধূমপান চালিয়ে যাওয়া মহিলাদের তুলনায় ২৫ শতাংশ কম হতে পারে।

এই ৪০ শতাংশের অর্থ বোঝাও জরুরি। তার মানে প্রতি একশো ধূমপায়ী মহিলার চল্লিশ জনই বন্ধ্যাত্বে ভুগবেন, এমন নয়। এটি দুই গোষ্ঠীর ঝুঁকির তুলনা। প্রতিবেদনে দেওয়া উদাহরণ অনুযায়ী, অধূমপায়ীদের ঝুঁকি ১৫ শতাংশ হলে, ধূমপায়ীদের ক্ষেত্রে তা ২১ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ বৃদ্ধির হিসাবটি আপেক্ষিক; ব্যক্তিবিশেষের সন্তানধারণের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার কোনও সরল সূত্র নয়।

পুরুষদের ক্ষেত্রেও উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ষাট হাজারের বেশি পুরুষকে নিয়ে করা ৪৪টি গবেষণার সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় ধূমপানের সঙ্গে প্রজননসংক্রান্ত সমস্যার সম্পর্ক মিলেছে। ধূমপায়ীদের মধ্যে উত্থানজনিত অসুবিধা এবং বীর্যপাতের সমস্যা বেশি দেখা গিয়েছে। বীর্যে শুক্রাণুর অনুপস্থিতি, শুক্রাণুর চলনক্ষমতা কমে যাওয়া কিংবা গঠনে অস্বাভাবিকতার সঙ্গেও ধূমপানের যোগ পাওয়া গিয়েছে।

শরীরের ভিতরে এই ক্ষতি কীভাবে হয়, তার ব্যাখ্যা দিয়েছে আমেরিকান সোসাইটি ফর রিপ্রোডাক্টিভ মেডিসিন। তাদের তথ্যপত্র অনুযায়ী, সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা নিকোটিন, সায়ানাইড ও কার্বন মনোক্সাইডের মতো রাসায়নিক ডিম্বাণুর ক্ষয় ত্বরান্বিত করতে পারে। ধূমপায়ী মহিলাদের ঋতুবন্ধ অধূমপায়ীদের তুলনায় এক থেকে চার বছর আগে হতে পারে। পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা, গুণমান এবং ডিম্বাণু নিষিক্ত করার ক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ক্ষতির প্রভাব গর্ভধারণের পরেও থাকতে পারে। ওই তথ্যপত্রে ধূমপানের সঙ্গে গর্ভপাত, জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ এবং সময়ের আগে প্রসবের বাড়তি ঝুঁকির কথা বলা হয়েছে। ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর জিনগত উপাদানও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার নলের মধ্যে নিষেক ঘটানোর চিকিৎসা বা আইভিএফ করালেই তামাকের প্রভাব কাটিয়ে ওঠা যাবে, এমন নয়। ধূমপায়ী মহিলাদের ডিম্বাশয় উদ্দীপিত করতে বেশি ওষুধ লাগলেও সংগৃহীত ডিম্বাণুর সংখ্যা কম হতে পারে।

উদ্বেগ রয়েছে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসার সাফল্য নিয়েও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রকাশনায় উদ্ধৃত ২১টি গবেষণার পুরনো পর্যালোচনায় ধূমপানের সঙ্গে সহায়ক প্রজনন চিকিৎসার পরে কম গর্ভধারণ ও কম জীবিত সন্তান জন্মের সম্পর্ক পাওয়া গিয়েছে। সাফল্যের সম্ভাবনা প্রায় অর্ধেক হওয়ার ইঙ্গিতও রয়েছে। তবে সব গবেষণার ফল এক নয়; প্রায় তিনশো মহিলার সাম্প্রতিক ছোট গবেষণায় একই ধরনের পার্থক্য পাওয়া যায়নি। ফলে সংখ্যাটিকে প্রত্যেক রোগীর ক্ষেত্রে অবধারিত ফল বলে ধরা যাবে না।

নিজে ধূমপান না করলেও ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না। অন্যের সিগারেটের ধোঁয়া নিয়মিত শ্বাসের সঙ্গে ঢুকলেও প্রজননক্ষমতা প্রভাবিত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে থাকা মহিলাদের বন্ধ্যাত্বের ঝুঁকি বাড়তে পারে এবং সন্তানধারণের চেষ্টা চলাকালীন প্রতি মাসে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে।

ই-সিগারেট, হুঁকো এবং ধোঁয়াবিহীন তামাকের প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে। সিগারেটের ক্ষতি সম্পর্কে প্রমাণ সবচেয়ে শক্তিশালী। অন্য পণ্যগুলির ক্ষেত্রে প্রমাণ এখনও গড়ে উঠছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তাই গবেষণার ঘাটতিকে প্রজননস্বাস্থ্যের পক্ষে নিরাপদ হওয়ার প্রমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

ধূমপান ছাড়ার সুফল থাকলেও সমস্ত ক্ষতি মুছে যায়, এমন নিশ্চয়তা নেই। প্রজনন চিকিৎসকদের ওই সংগঠনের বক্তব্য, ইতিমধ্যে নষ্ট হয়ে যাওয়া ডিম্বাণুর ভাণ্ডার ফেরানো যায় না। তবে ধূমপান বন্ধ করলে প্রজননক্ষমতার উন্নতি হতে পারে এবং সময়ের সঙ্গে ধূমপানজনিত গর্ভাবস্থার জটিলতার ঝুঁকিও কমে। চিকিৎসকের সাহায্য কিংবা সহায়তাকারী গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ অভ্যাস ছাড়ার সাফল্য বাড়াতে পারে।

সমস্যাটির ব্যাপ্তিও বড়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বিশ্বে প্রজননক্ষম বয়সের প্রতি ছয় জনের এক জন জীবনের কোনও পর্যায়ে বন্ধ্যাত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। নিয়মিত, গর্ভনিরোধক ছাড়া যৌনসম্পর্কের পরেও বারো মাস বা তার বেশি সময়ে গর্ভধারণ না হলে চিকিৎসাবিজ্ঞানের সংজ্ঞায় তাকে বন্ধ্যাত্ব বলা হয়। এর কারণ নারী, পুরুষ, উভয়ের শারীরিক সমস্যা কিংবা কখনও অজ্ঞাতও থাকতে পারে।

তাই সন্তান না হওয়ার জন্য শুধু মহিলাকে দায়ী করার প্রচলিত ধারণা বৈজ্ঞানিক নয়। ডিম্বাশয়, জরায়ু, ডিম্বনালি, হরমোন কিংবা শুক্রাণু উৎপাদনের সমস্যা—কারণ হতে পারে বহু কিছু। ধূমপান তার একটি পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করিয়েছে, বন্ধ্যাত্বের সঙ্গে সামাজিক অপমান, উদ্বেগ, অবসাদ এবং বিশেষত মহিলাদের প্রতি বৈষম্য জড়িয়ে থাকে। চিকিৎসার ব্যয় ও পরিষেবার অভাবও বহু পরিবারের সামনে বড় বাধা।

আগে সন্তান হয়েছে বলেই পরবর্তী সময়ে বন্ধ্যাত্বের সম্ভাবনা নেই, এমন ধারণাও ঠিক নয়। কখনও গর্ভধারণ না হওয়াকে প্রাথমিক বন্ধ্যাত্ব এবং অন্তত একবার গর্ভধারণের পরে এই সমস্যা দেখা দেওয়াকে দ্বিতীয় পর্যায়ের বন্ধ্যাত্ব বলা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই কারণ খুঁজে দেখা জরুরি। তামাক ছাড়ার উদ্যোগ প্রয়োজনীয় হলেও সেটিকে বন্ধ্যাত্বের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা বা চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখলে সমস্যার অন্য কারণগুলি অজানা থেকে যেতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ধূমপান ছাড়ার সহায়তাকে চিকিৎসার নিয়মিত অংশ করে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তামাক ত্যাগসংক্রান্ত নির্দেশিকায় আচরণগত সহায়তা ও প্রমাণভিত্তিক ওষুধের ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসকদের পাশাপাশি নীতিনির্ধারকদেরও কার্যকর পরিষেবা সহজলভ্য করার দায়িত্ব রয়েছে। সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতিতে প্রজননস্বাস্থ্যের আলোচনা, প্রয়োজনমতো পরীক্ষা এবং তামাক ছাড়ার সহায়তা একসঙ্গে এগোলে প্রতিরোধযোগ্য ক্ষতি কমানোর সুযোগ বাড়ে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles