পাড়া বদলালেও বদলায় না বিপদ: দিল্লিতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিশাহারা পড়ুয়ারা

যা জানা জরুরি
- অথচ সেই ছাদ বদলাতে গেলেও সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে টাকার হিসাব।
- সত্য নিকেতনে ছাত্রাবাসের বাড়ি ভেঙে পড়ার পরে দিল্লির বহু পড়ুয়া এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
- কেউ পাড়া ছাড়ছেন, কেউ অন্যত্র ঘর দেখছেন, কেউ সাময়িকভাবে বাড়ি ফিরছেন।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নয়াদিল্লি: মাথার উপরের ছাদ নিয়ে ভয়। অথচ সেই ছাদ বদলাতে গেলেও সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে টাকার হিসাব। সত্য নিকেতনে ছাত্রাবাসের বাড়ি ভেঙে পড়ার পরে দিল্লির বহু পড়ুয়া এখন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। কেউ পাড়া ছাড়ছেন, কেউ অন্যত্র ঘর দেখছেন, কেউ সাময়িকভাবে বাড়ি ফিরছেন। কিন্তু যাঁদের মাসিক খরচের সীমা বাঁধা, তাঁদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই: ঠিকানা বদলানোর সুযোগ থাকলেও নিরাপত্তা ও সামর্থ্যের দ্বন্দ্ব থেকে মুক্তি মিলছে না।
দ্য হিন্দুর প্রতিবেদনের দেওয়া অংশ অনুযায়ী, সত্য নিকেতনের বাইরে বসন্ত গাঁও, নারায়ণা ও মায়াপুরীর মতো এলাকায় থাকার জায়গা খুঁজছেন ছাত্রছাত্রীরা। খোঁজ চলছে মেট্রো স্টেশনের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ রয়েছে, এমন পাড়াতেও। কলেজের একেবারে পাশে থাকার আগের অগ্রাধিকার সরিয়ে এখন নিরাপত্তাকে সামনে রাখতে চাইছেন তাঁরা। কিন্তু কম বাজেটের পড়ুয়াদের নতুন ঘরের খোঁজ শেষ পর্যন্ত সেই পুরনো আপসের জায়গাতেই ফিরিয়ে আনছে, যেখান থেকে তাঁরা বেরোতে চেয়েছিলেন।
এই পরিস্থিতিতে ঘর খোঁজার অঙ্কটি জটিল। শুধু মাসিক ভাড়া মিললেই চলে না; কলেজে পৌঁছনোর সুবিধাও দেখতে হয়। দূরের পাড়ায় মেট্রোর যোগাযোগ থাকলে বিকল্পের পরিসর বাড়ে, কিন্তু নতুন ঠিকানা সত্যিই নিরাপদ কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়। প্রতিবেদনের মূল ছবিটি তাই একটি পাড়া থেকে ছাত্রছাত্রীদের চলে যাওয়ার চেয়েও বড়: সীমিত আয়ের মানুষের কাছে নিরাপদ বাসস্থান বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা কতখানি, তা নিয়ে প্রশ্ন।
সঙ্কটের বাস্তব চেহারা ধরা পড়েছে অন্য পড়ুয়াদের অভিজ্ঞতাতেও। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে উত্তরপ্রদেশের বুলন্দশহর থেকে আসা আঠারো বছরের উন্নয়ন ভাটি জানিয়েছেন, বেশি ভাড়া এবং প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের জন্য পনেরো টাকা নেওয়ার কারণে তিনি আগেই ঘর বদলাতে চাইছিলেন। আর্যভট্ট কলেজের এই ছাত্র দুর্ঘটনার দিন এক দালালের সঙ্গে নতুন ছাত্রাবাস দেখতে যাচ্ছিলেন। পথে তাঁদের সামনেই ভেঙে পড়ে পাঁচতলা বাড়িটি।
অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও উন্নয়নের সামনে আর্থিক সমস্যা রয়ে গিয়েছে। বর্তমান থাকার জায়গায় এক মাসের ভাড়া ও জামানত মিলিয়ে তাঁর আটাশ হাজার টাকা দেওয়া হয়ে গিয়েছে। অন্যদিকে আত্মারাম সনাতন ধর্ম কলেজের উনিশ বছরের ছাত্রী আস্থা কুমারী জানিয়েছেন, তাঁর পরিবার দ্বিতীয়বার জামানত এবং একই মাসের ভাড়া দিতে পারবে না। পুরনো টাকা ফেরত না পেলে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন তিনি।
অরুণাচল প্রদেশের এক প্রাক্তন আবাসিকের অভিজ্ঞতাও একই সমস্যার আরেক দিক দেখায়। ভেঙে পড়া বাড়িতে দু’জনের ঘরে থাকার জন্য মাসে সতেরো হাজার টাকা দিতেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বৃষ্টির জল ঘরে ঢুকত। জুনে সরে যাওয়ার পরেও জামানত ফেরত পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ বিপদের জায়গা থেকে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নিলেও আটকে থাকা টাকা পরবর্তী সিদ্ধান্তকে আটকে দিতে পারে।
এই নির্ভরতার পিছনে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসনের বিপুল ঘাটতি। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪–২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, নিয়মিত পদ্ধতিতে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীর সংখ্যা আড়াই লক্ষের বেশি। অর্ধেকেরও বেশি পড়ুয়া দিল্লির বাইরের। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট কলেজগুলির ছাত্রাবাস মিলিয়ে শয্যার সংখ্যা আনুমানিক নয় হাজার। ফলে বাইরের বহু পড়ুয়াকে বেসরকারি ব্যবস্থার উপর নির্ভর করতে হয়।
দক্ষিণ ক্যাম্পাসের কাছে সত্য নিকেতনের অবস্থান সেই নির্ভরতাকে ব্যবসার সুযোগ করে দিয়েছে। শ্রী বেঙ্কটেশ্বর, মতিলাল নেহরু, আর্যভট্ট এবং রামলাল আনন্দ কলেজের মতো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সেখান থেকে হেঁটে যাওয়া যায়। আশপাশের বেশ কয়েকটি কলেজে নিজস্ব ছাত্রাবাস নেই। কলেজের কাছাকাছি থাকার চাহিদা মেটাতে বাড়িগুলিতে গড়ে উঠেছে ভাড়ার আবাসন। কিন্তু ছাত্রসংখ্যা ও বাসস্থানের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিত ব্যবস্থা তৈরি হয়নি।
আবাসনের অভাব শিক্ষার সুযোগকেও প্রভাবিত করে। গুয়াহাটি আইআইটির সমাজতত্ত্বের শিক্ষক ঋতুপর্ণা পাটগিরি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, ছাত্রাবাসের সুযোগ পড়ুয়াদের মানসিক স্বস্তি ও অসহায়তার মাত্রার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিশেষত বাইরে থেকে আসা শিক্ষার্থী এবং ছাত্রীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে কম খরচে পড়ার সুযোগ পেলেও নিরাপদে থাকার খরচ সামলাতে না পারলে সেই সুযোগের সুবিধা সম্পূর্ণ পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
বিপর্যয়ের পরে বিষয়টি আদালতেও পৌঁছেছে। দিল্লির কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বেসরকারি ছাত্রাবাস এবং ভাড়ার আবাসনের নিরাপত্তা পরীক্ষা চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছেন আদালতবান্ধব অজিতকুমার সিনহা। বিচারপতি এ আমানুল্লাহ এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ দেশজুড়ে নির্দেশিকা তৈরির সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর বিষয়টি শোনার কথা। তবে আদালতের এই উদ্যোগকে ইতিমধ্যেই কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
দিল্লি সরকারও বেসরকারি আবাসন নিয়ন্ত্রণে একটি নীতি তৈরির কাজ করছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবে পরিচালনার অনুমতিপত্র, পুলিশ ও পুরসভার যাচাই, নজরদারি ক্যামেরা এবং জরুরি অবস্থায় দ্রুত তত্ত্বাবধায়কের উপস্থিতির কথা রয়েছে। এলাকার ভিত্তিতে ভাড়ার সীমা নির্ধারণের জন্য কমিটি গঠনের প্রস্তাবও আছে। এগুলি এখনও প্রস্তাবিত ব্যবস্থা; ছাত্রছাত্রীদের বর্তমান বাসস্থানের সমস্যা তার আগেই সমাধান করতে হচ্ছে।
নীতির আলোচনায় ভবনের কাঠামোগত নিরাপত্তা পরীক্ষার পাশাপাশি খালি সরকারি সম্পত্তিকে ছাত্রাবাস হিসেবে ব্যবহার করার সম্ভাবনাও রয়েছে। ভাড়ার সীমা ঠিক করার ক্ষেত্রে কলেজ ও গণপরিবহণের দূরত্ব, আবাসনের সুযোগসুবিধা এবং কতজন সেখানে থাকছেন, তা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে। ফলে নিরাপত্তা ও খরচ, পড়ুয়াদের দুই উদ্বেগই প্রস্তাবের আওতায় এসেছে। বাস্তবায়নের ফল এখনও অজানা।
সব মিলিয়ে সত্য নিকেতন থেকে সরে যাওয়া আপাতত অনেকের কাছে জরুরি, কিন্তু সরে যাওয়ার সামর্থ্য সবার সমান নয়। কারও টাকা আটকে পুরনো মালিকের কাছে, কারও পরিবার নতুন জামানত দিতে অক্ষম। অন্য পাড়ায় ঘর খুঁজতে থাকা পড়ুয়াদের সামনে তাই একই সঙ্গে দুটি শর্ত: বাড়িটি নিরাপদ হতে হবে, খরচও নাগালের মধ্যে থাকতে হবে। এই দুই শর্ত একসঙ্গে পূরণ না হলে পাড়া বদলাবে, অনিশ্চয়তা থেকে যাবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।
আরও লেখা →সম্পর্কিত প্রতিবেদন
খবরগগনযান থেকে চাঁদ-শুক্র অভিযান, ইসরোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী ইউরোপ
সেপ্টেম্বর 9, 2026
খবর৯/১১-র স্মরণেও নিজেই কেন্দ্রে, ট্রাম্পের বদলাতে থাকা বয়ান ঘিরে বিতর্ক
সেপ্টেম্বর 9, 2026
খবর২,৮৪৩ কিলোমিটার পথে চারশোর বেশি মালগাড়ি, সময়-খরচ কমাচ্ছে পৃথক রেল করিডর
সেপ্টেম্বর 9, 2026
খবরমৃত্যুর হিসাবে ‘গরমিল’, সত্য নিকেতনে বিক্ষোভের মধ্যেই ঘর ছাড়ছেন পড়ুয়ারা
সেপ্টেম্বর 9, 2026দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে
বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।