এন্ডোমেট্রিয়োসিসের নেপথ্যে বংশগতি? প্রথম ভারতীয় জিনোম সমীক্ষায় ২১টি সূত্র

যা জানা জরুরি
- এন্ডোমেট্রিয়োসিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতার পিছনে বংশগতির ভূমিকা থাকতে পারে।
- ভারতীয় মহিলাদের নিয়ে প্রথম সমগ্র জিনোমভিত্তিক সমীক্ষায় এই রোগের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কযুক্ত ২১টি জিনগত অঞ্চল চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা।
- কেন কোনও কোনও মহিলা এই যন্ত্রণাদায়ক রোগে বেশি আক্রান্ত হন, তা বোঝার নতুন সূত্র মিলেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
এন্ডোমেট্রিয়োসিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতার পিছনে বংশগতির ভূমিকা থাকতে পারে। ভারতীয় মহিলাদের নিয়ে প্রথম সমগ্র জিনোমভিত্তিক সমীক্ষায় এই রোগের সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পর্কযুক্ত ২১টি জিনগত অঞ্চল চিহ্নিত করেছেন গবেষকেরা। কেন কোনও কোনও মহিলা এই যন্ত্রণাদায়ক রোগে বেশি আক্রান্ত হন, তা বোঝার নতুন সূত্র মিলেছে। তবে এই ফলকে রোগের নিশ্চিত জিনগত কারণ আবিষ্কার বলে ব্যাখ্যা করা যাবে না।
‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ পত্রিকায় প্রকাশিত গবেষণার চূড়ান্ত বিশ্লেষণে ছিলেন ২,৫২৩ জন মহিলা। তাঁদের মধ্যে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এন্ডোমেট্রিয়োসিস নিশ্চিত হয়েছিল ১,২৮৮ জনের। তুলনামূলক দলে ছিলেন ১,২৩৫ জন। দেশের বিভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল ও বংশগত পটভূমির মহিলাদের তথ্য মিলিয়ে রোগের সঙ্গে জিনগত বৈচিত্র্যের সম্পর্ক খোঁজা হয়েছে।
সবচেয়ে জোরালো সম্ভাব্য যোগ পাওয়া গিয়েছে ১৩ নম্বর ক্রোমোজোমে, এলআইএনসি০০৪১৫ ও শিসা২ অঞ্চলের কাছে। জাপানি গবেষণার তথ্যের সঙ্গে যৌথ বিশ্লেষণে আগে পরিচিত দু’টি ঝুঁকিসংশ্লিষ্ট অঞ্চলের সম্পর্কও সমর্থন পেয়েছে। এতে বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের কিছু অভিন্ন জিনগত ভিত্তি থাকার ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে শুধু ভারতীয় নমুনার বিশ্লেষণে কোনও জিনগত পরিবর্তনই সমগ্র জিনোমের জন্য নির্ধারিত কঠোর পরিসংখ্যানগত নিশ্চয়তার সীমা পেরোয়নি। অর্থাৎ, ২১টি অঞ্চল আপাতত পরবর্তী অনুসন্ধানের সূত্র। বৃহত্তর নমুনায় স্বাধীন যাচাই জরুরি। এই তথ্য দিয়ে এখনই কোনও মহিলার ভবিষ্যতে রোগ হবে কি না, বলা সম্ভব নয়।
গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়েছে মুম্বইয়ের আইসিএমআর অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর রিসার্চ অন উইমেন’স হেলথ। দেশের ১৮টি কেন্দ্রের চিকিৎসক, শল্যচিকিৎসক ও গবেষকেরা এতে যুক্ত ছিলেন। প্রধান গবেষক রাহুল গজভিয়ে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন রোগীদের অভিজ্ঞতা শুনতে গিয়ে তিনি একই পরিবারের একাধিক মহিলার একই ধরনের সমস্যার কথা জানতে পারেন। অনেকের মা বা বোনও প্রচণ্ড ঋতুযন্ত্রণা সহ্য করেছেন, অথচ রোগ নির্ণয় হয়নি।
গজভিয়ে ২০১৭–১৮ সালে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এই রোগের বংশগতিবিষয়ক গবেষণার প্রশিক্ষণ নেন। পরে ২০১৯ সালের গবেষণাবৃত্তির সহায়তায় ভারতীয় রোগীদের চিকিৎসাসংক্রান্ত ও জিনগত তথ্যভান্ডার গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়। গবেষণার মুখ্য লেখক সন্ধ্যা আনন্দের বক্তব্য, নতুন ফল ভবিষ্যৎ দক্ষিণ এশীয় গবেষণার ভিত্তি তৈরি করবে। এত দিন এই বিষয়ে আন্তর্জাতিক জিনগত গবেষণায় ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত মানুষের প্রাধান্য ছিল; ভারতীয়দের তথ্য সেই ঘাটতি পূরণে সাহায্য করবে।
গবেষকদের আশা, এই তথ্যভান্ডার ভবিষ্যতে রোগের জৈবিক প্রক্রিয়া বুঝতে, আগাম শনাক্তকরণের উপায় খুঁজতে এবং ব্যক্তিভেদে চিকিৎসা নির্ধারণে কাজে লাগবে। তবে পরীক্ষাগারের সূত্রকে রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতিতে বদলাতে আরও গবেষণা ও যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। পথ এখনও দীর্ঘ।
এন্ডোমেট্রিয়োসিসে জরায়ুর ভিতরের আবরণের মতো কলা জরায়ুর বাইরে জন্মায়। এর ফলে প্রদাহ, ক্ষত এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে। ঋতুস্রাবের সময় তীব্র যন্ত্রণা, অতিরিক্ত রক্তপাত, তলপেটে ব্যথা, যৌনমিলনে কষ্ট এবং গর্ভধারণে সমস্যা পরিচিত লক্ষণ। কারও ক্ষেত্রে পেট ফাঁপা, বমিভাব কিংবা মলমূত্র ত্যাগের সময়ও ব্যথা হয়। আবার উপসর্গের তীব্রতা সকলের ক্ষেত্রে এক রকম নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, প্রজননক্ষম বয়সের প্রায় ১০ শতাংশ মহিলা, অর্থাৎ বিশ্বে আনুমানিক ১৯ কোটি মানুষ এই রোগে আক্রান্ত। রোগ নির্ণয়ে গড়ে চার থেকে বারো বছর পর্যন্ত দেরি হতে পারে। ঋতুযন্ত্রণাকে স্বাভাবিক বলে উড়িয়ে দেওয়া, সচেতনতার অভাব এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসার সীমিত সুযোগ এই ভোগান্তি বাড়ায়। পড়াশোনা, কর্মজীবন, সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের উপরেও তার প্রভাব পড়ে।
বর্তমানে রোগটি সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার নিশ্চিত চিকিৎসা নেই, তবে ওষুধ, হরমোনভিত্তিক চিকিৎসা এবং প্রয়োজনমতো অস্ত্রোপচারে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উপসর্গের ইতিহাস, আল্ট্রাসাউন্ড বা এমআরআই রোগ নির্ণয়ে সাহায্য করে; চিকিৎসা শুরুর আগে সকলের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। তাই জিনগত পরীক্ষার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পাশাপাশি এখনকার অগ্রাধিকার হচ্ছে ব্যথাকে গুরুত্ব দেওয়া, সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং উপযুক্ত চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানো।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



