ডিমেনশিয়া বললেই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে ওঠে স্মৃতিভ্রংশের ছবি—পরিচিত মানুষের নাম ভুলে যাওয়া, জিনিসপত্র কোথায় রাখা হয়েছে মনে করতে না পারা কিংবা চেনা রাস্তায় পথ হারানো। কিন্তু সব ধরনের ডিমেনশিয়ার শুরু স্মৃতিশক্তি হারিয়ে নয়। কোনও কর্মক্ষম মধ্যবয়সি মানুষ হঠাৎ দায়িত্বজ্ঞানহীন হয়ে উঠতে পারেন, সামাজিক শিষ্টাচার ভুলে যেতে পারেন কিংবা কাছের মানুষের অনুভূতির প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন হয়ে পড়তে পারেন। এগুলি চারিত্রিক অধঃপতন নয়; মস্তিষ্কের একটি রোগের প্রাথমিক লক্ষণও হতে পারে।

ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া বা এফটিডি এমনই একটি স্নায়ুক্ষয়জনিত অসুখ। সাধারণত ৪৫ থেকে ৬৫ বছরের মানুষের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। মস্তিষ্কের সামনের অংশ বা ফ্রন্টাল লোব এবং দু’পাশের টেম্পোরাল লোবের স্নায়ুকোষ ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে ব্যক্তিত্ব, আচরণ, বিচারবোধ, আবেগ এবং ভাষা ব্যবহারে পরিবর্তন আসে। এই রোগে প্রথম দিকে স্মৃতিশক্তি প্রায় অক্ষতও থাকতে পারে।

পরিবারের কাছে সমস্যাটি তাই প্রায়ই ধাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। এত দিন দায়িত্বশীল এবং সংবেদনশীল বলে পরিচিত মানুষটি হয়তো আচমকা অশোভন মন্তব্য করছেন, সামাজিক সীমারেখা মানছেন না বা টাকা খরচের ক্ষেত্রে বেপরোয়া হয়ে উঠছেন। কেউ আবার সমস্ত কাজকর্মে উৎসাহ হারিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্বিকার হয়ে বসে থাকেন। অন্যের দুঃখ বা বিপদে যে মানুষটি আগে বিচলিত হতেন, তিনি হয়তো আর কোনও সহানুভূতিই দেখাচ্ছেন না।

আচরণভিত্তিক এফটিডি-তে আত্মসংযমের অভাব, একই কাজ বারবার করা, অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা যায়। মিষ্টি বা বিশেষ কোনও খাবারের প্রতি আকস্মিক আসক্তি তৈরি হতে পারে। ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার প্রতিও উদাসীনতা আসে। কিছু রোগী বিনা কারণে এক কথা বা একই অঙ্গভঙ্গি বারবার করেন। অথচ সাম্প্রতিক ঘটনা বা পরিচিত মুখ তাঁদের ঠিকই মনে থাকে। ফলে পরিবারের সদস্যদের মনে হয়, মানুষটি জেনেশুনেই খারাপ ব্যবহার করছেন।

এফটিডির আর একটি প্রধান রূপ ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত। একে প্রাইমারি প্রোগ্রেসিভ অ্যাফেসিয়া বলা হয়। এতে রোগীর ঠিক শব্দটি খুঁজে পেতে অসুবিধা হয়, বাক্য গঠন ভেঙে পড়ে অথবা তিনি অন্যের কথার অর্থ বুঝতে পারেন না। কথা ক্রমশ কমে আসে। কোনও কোনও ক্ষেত্রে আচরণ ও ভাষার সমস্যার পাশাপাশি হাঁটাচলা, ভারসাম্য কিংবা পেশির শক্তিতেও পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।

সমস্যা হল, মধ্যবয়সে এমন আচরণগত বদলকে পরিবার প্রায়ই মানসিক চাপ, দাম্পত্য সমস্যা, বিষণ্ণতা, আসক্তি কিংবা ইচ্ছাকৃত দুর্ব্যবহার বলে ধরে নেয়। কর্মক্ষেত্রে তাঁকে অলস, অদক্ষ বা অসহযোগী বলে চিহ্নিত করা হতে পারে। চিকিৎসকদের কাছেও কখনও এটি বিষণ্ণতা, বাইপোলার ডিজঅর্ডার বা অন্য মানসিক রোগ বলে ভুলভাবে ধরা পড়ে। অথচ আচরণের নাটকীয় ও ক্রমবর্ধমান পরিবর্তন এফটিডির গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।

রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনও একটি পরীক্ষাই যথেষ্ট নয়। রোগীর নিজের বক্তব্যের পাশাপাশি পরিবারের সদস্য বা সহকর্মীর কাছ থেকে তাঁর আচরণ ও ব্যক্তিত্বের পরিবর্তনের বিস্তারিত ইতিহাস জানা জরুরি। স্নায়বিক পরীক্ষা, ভাষা ও চিন্তাশক্তির মূল্যায়ন, রক্তপরীক্ষা এবং এমআরআই বা পিইটি স্ক্যানের প্রয়োজন হতে পারে। থাইরয়েডের সমস্যা, ভিটামিনের ঘাটতি, সংক্রমণ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং অন্যান্য নিরাময়যোগ্য কারণও আগে বাদ দিতে হয়। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এফটিডি-র ক্ষেত্রে পারিবারিক বা জিনগত যোগসূত্র থাকতে পারে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের রোগনিয়ন্ত্রণ সংস্থা। তবে পরিবারের ইতিহাস না থাকলেও রোগটি হতে পারে।

এখনও এফটিডি সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার কোনও চিকিৎসা নেই। অ্যালঝাইমার্সের জন্য ব্যবহৃত সব ওষুধও এ ক্ষেত্রে সমান কার্যকর নয়। তবে আচরণগত কিছু উপসর্গ কমাতে ওষুধ দেওয়া যেতে পারে। ভাষার সমস্যা সামলাতে স্পিচ থেরাপি, দৈনন্দিন কাজের জন্য অকুপেশনাল থেরাপি এবং নিয়মিত রুটিন উপকারী। রোগীর আর্থিক সিদ্ধান্ত, গাড়ি চালানো, কর্মক্ষেত্র এবং ভবিষ্যৎ পরিচর্যা নিয়েও গোড়াতেই পরিকল্পনা করা দরকার।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি অবশ্য পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গিতে। রোগীকে স্বার্থপর, নিষ্ঠুর বা দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে দোষারোপ করলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়। নাটকীয় আচরণগত পরিবর্তনের পিছনে মস্তিষ্কের অসুখ থাকতে পারে—এই স্বীকৃতিই পরিবারকে অভিযোগের পথ থেকে চিকিৎসা, পরিচর্যা এবং সহমর্মিতার পথে নিয়ে যেতে পারে। ডিমেনশিয়া বার্ধক্যের স্বাভাবিক পরিণতিও নয়; এটি মস্তিষ্কের বিভিন্ন রোগের সমষ্টিগত প্রকাশ।

সুতরাং স্মৃতি ঠিক আছে বলেই ডিমেনশিয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কখনও কখনও মানুষটি অনেক কিছু মনে রাখেন—কিন্তু রোগের আঘাতে ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন তাঁর পরিচিত আচরণ, ভাষা ও ব্যক্তিত্বের স্বাভাবিক রূপ।