পূর্ব সীমান্তেও কোর কমান্ডার বৈঠক, অরুণাচলে নতুন পথে ভারত–চিন সামরিক সংলাপ

যা জানা জরুরি
- প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর পরস্পরবিরোধী ভূখণ্ডগত দাবি এবং সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ভারত ও চিনের সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলে প্রথম বার কোর কমান্ডার…
- রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের ভাচা–দামাই সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্রে এই আলোচনা হয়।
- এত দিন এই স্তরের সামরিক আলোচনা মূলত পূর্ব লাদাখে সীমাবদ্ধ ছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর পরস্পরবিরোধী ভূখণ্ডগত দাবি এবং সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই ভারত ও চিনের সেনাবাহিনী পূর্বাঞ্চলে প্রথম বার কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকে বসল। রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর অরুণাচল প্রদেশের ভাচা–দামাই সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্রে এই আলোচনা হয়। এত দিন এই স্তরের সামরিক আলোচনা মূলত পূর্ব লাদাখে সীমাবদ্ধ ছিল। ফলে অরুণাচলে বৈঠক আয়োজনকে দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ সম্প্রসারণ বলেই দেখা হচ্ছে।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে জানা গিয়েছে, ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন সেনাবাহিনীর ৩ কোর বা ‘স্পিয়ার কোর’-এর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল গিরিশ কালিয়া। বারো সদস্যের এই দলে ভারত–তিব্বত সীমান্ত পুলিশের এক জন মহাপরিদর্শকও ছিলেন। সীমান্তরক্ষী বাহিনীর শীর্ষ আধিকারিককে আলোচনায় অন্তর্ভুক্ত করার অর্থ, সেনাবাহিনীর পাশাপাশি দৈনন্দিন সীমান্ত নজরদারির সঙ্গে যুক্ত বাহিনীর অভিজ্ঞতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বৈঠকটি এমন সময়ে হল, যখন অরুণাচল প্রদেশের আপার সুবনসিরি জেলার তাকসিং এলাকায় উত্তেজনা এবং চিনা বাহিনীর তৎপরতার খবর সামনে আসছে। ওই অঞ্চলে চিনা অনুপ্রবেশের অভিযোগও উঠেছে। আলোচনায় ঠিক কোন কোন বিষয় উঠেছে বা দুই পক্ষ কোনও নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি বিবৃতি প্রকাশিত হয়নি। তবে বৈঠকের স্থান ও সময়ই এর কৌশলগত গুরুত্ব স্পষ্ট করে দিচ্ছে।
নাগাল্যান্ডের রঙ্গাপাহাড়ে ৩ কোরের সদর দফতর। অরুণাচল প্রদেশে এলএসি-সংলগ্ন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের সামরিক দায়িত্ব এই কোরের হাতে। রাজ্যে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দুটি কোর সীমান্ত রক্ষার কাজে মোতায়েন—তেজপুরের ৪ কোর এবং রঙ্গাপাহাড়ের ৩ কোর। ফলে ৩ কোর কমান্ডারের নেতৃত্বে এই আলোচনা পূর্ব সীমান্তের বাস্তব পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
২০২০ সালের জুনে গালওয়ান উপত্যকায় ভারত ও চিনের সেনাদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পরে কোর কমান্ডার পর্যায়ের বৈঠকই উত্তেজনা প্রশমনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছিল। দুই পক্ষেরই সেনা হতাহত হওয়ার পর পূর্ব লাদাখের চুশুল–মলডো সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্রে ধারাবাহিক আলোচনা হয়। তার মাধ্যমে কয়েকটি সংঘর্ষস্থল থেকে সেনা সরানো এবং মুখোমুখি অবস্থান কিছুটা শিথিল করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু সেই সংলাপ কাঠামো এত দিন প্রায় সম্পূর্ণ ভাবেই সীমান্তের পশ্চিমাঞ্চলকে ঘিরে ব্যবহৃত হয়েছে।
অরুণাচলে একই পর্যায়ের বৈঠক শুরু হওয়ার অর্থ, সীমান্তের পূর্বাঞ্চলেও স্থানীয় উত্তেজনা মোকাবিলার জন্য উচ্চতর সামরিক যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা দুই দেশ স্বীকার করছে। সীমান্তের কোনও ঘটনায় দিল্লি ও বেজিংয়ের কূটনৈতিক স্তরের হস্তক্ষেপের অপেক্ষায় না থেকে সংশ্লিষ্ট সেনা কমান্ডাররা যাতে সরাসরি কথা বলতে পারেন, এই বৈঠক সেই পথ খুলে দিতে পারে।
এর আগে ৬ আগস্ট ভারত–চিন সীমান্ত বিষয়ক পরামর্শ ও সমন্বয় কর্মব্যবস্থার ৩৬তম বৈঠক হয়েছিল। তার পরে ২৬ আগস্ট বেজিংয়ে সীমান্ত প্রশ্নে বিশেষ প্রতিনিধিদের ২৫তম দফার আলোচনা হয়। ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল। চিনের পক্ষে ছিলেন সে দেশের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরো সদস্য এবং কেন্দ্রীয় বিদেশ বিষয়ক কমিশনের দফতরের অধিকর্তা ওয়াং ই।
বিশেষ প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনার পরে আট দফা ফলাফল-নথি স্বাক্ষরিত হয়। সীমান্তে যোগাযোগ এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য আরও দুটি সীমান্ত বৈঠক কেন্দ্র স্থাপন ও নতুন হটলাইন চালুর সিদ্ধান্ত তার অন্তর্ভুক্ত। সূত্রের দাবি, প্রস্তাবিত কেন্দ্রগুলির একটি ৩ কোরের দায়িত্বাধীন পূর্বাঞ্চলে এবং অন্যটি মধ্যাঞ্চলে তৈরি হবে। তবে জোশীমঠকে নতুন বৈঠক কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র স্পষ্ট করেছে।
নয়াদিল্লিতে ১১ থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর অষ্টাদশ ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের যোগদানের সম্ভাবনা রয়েছে। তার কয়েক দিন আগে পূর্বাঞ্চলে কোর কমান্ডার বৈঠক হওয়ায় ঘটনাটি কূটনৈতিক ভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। শীর্ষ সম্মেলনের আগে সীমান্তে নতুন কোনও উত্তেজনা যাতে দ্বিপাক্ষিক পরিবেশকে ব্যাহত না করে, সেই লক্ষ্যও আলোচনার নেপথ্যে থাকতে পারে।
কথাবার্তার পাশাপাশি ভারত অবশ্য সামরিক প্রস্তুতিতে ঢিল দিচ্ছে না। সম্প্রতি সেনাপ্রধান জেনারেল ধীরজ শেঠ ৩ কোরের সদর দফতর পরিদর্শন করেছেন। বিভিন্ন ফরমেশনের কমান্ডাররা তাঁকে সীমান্তের পরিস্থিতি, বাহিনীর প্রস্তুতি এবং যুদ্ধক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত করেন। অর্থাৎ পূর্ব সীমান্তে এখন একই সঙ্গে দুটি প্রক্রিয়া চলছে—এক দিকে সামরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে ভুল বোঝাবুঝি ও সংঘর্ষের ঝুঁকি কমানোর চেষ্টা, অন্য দিকে যে কোনও পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার করা।
প্রথম বৈঠকেই দীর্ঘদিনের সীমান্ত বিরোধের সমাধান হবে না। কিন্তু লাদাখের বাইরে অরুণাচলেও কোর কমান্ডার স্তরে আলোচনার দরজা খোলা নিজেই একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। তাকসিংয়ের উত্তেজনা কমানো এবং নতুন যোগাযোগব্যবস্থাকে নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই এখন এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



