‘ব্যবস্থার ব্যর্থতাই রাজনীতিতে এনেছে’: আর জি কর কাণ্ডে ফের সরব রত্না

যা জানা জরুরি
- আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার তদন্তের পরিধি বাড়ানোর দাবি জানালেন তাঁর মা তথা পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক রত্না…
- প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি তুলে তাঁর প্রশ্ন, এত দিনেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা…
- মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও জেলের বাইরে কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার তদন্তের পরিধি বাড়ানোর দাবি জানালেন তাঁর মা তথা পানিহাটির বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমকে তদন্তের আওতায় আনার দাবি তুলে তাঁর প্রশ্ন, এত দিনেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি কেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনও জেলের বাইরে কেন, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
২০২৪ সালের আগস্টে আর জি কর হাসপাতালের ভিতর কর্তব্যরত অবস্থায় ওই স্নাতকোত্তর প্রশিক্ষণার্থী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনাটি গোটা দেশে আলোড়ন সৃষ্টি করে। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকা, তদন্তে গাফিলতি এবং তথ্যপ্রমাণ নষ্টের অভিযোগকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গজুড়ে দীর্ঘ আন্দোলনও গড়ে ওঠে। মেয়ের মৃত্যুর পর ন্যায়বিচারের দাবিতে সেই আন্দোলনের অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন তাঁর বাবা-মা। পরবর্তী সময়ে রত্না দেবনাথ বিজেপিতে যোগ দিয়ে পানিহাটি কেন্দ্র থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হন।
শনিবার এক অনুষ্ঠানে রত্না বলেন, “আমি খুব কাছ থেকে আমার মেয়ের লড়াই দেখেছি। প্রতিবাদের ভাষা তো আমরাই তাকে শিখিয়েছিলাম।” তাঁর অভিযোগ, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি থেকে শুরু করে শিক্ষা ও গবেষণার বিভিন্ন স্তরে টাকা নেওয়ার সংস্কৃতি ছিল। এমনকি তাঁর মেয়ের গবেষণাপত্রও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। এই অভিযোগগুলির স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে তাঁর মত।
ঘটনার রাতের কথা স্মরণ করে রত্না জানান, রাত ১১টা ১৫ মিনিট নাগাদ তাঁর মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল। হাতে খাবার নিয়ে ফোন করেছিলেন তরুণী চিকিৎসক। কী খাবেন, কখন বিশ্রাম নেবেন—মা-মেয়ের মধ্যে সেই সব সাধারণ কথাই হয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। রত্নার কথায়, হাসপাতালের যে জায়গায় তাঁর মেয়ের দেহ পাওয়া গিয়েছিল, সেটি নিরাপদ ও সংরক্ষিত এলাকা হওয়ার কথা। তা সত্ত্বেও সেখানে কীভাবে এমন অপরাধ ঘটল এবং সেই রাতে ঠিক কী হয়েছিল, মা হিসেবে আজও তার পূর্ণ উত্তর তিনি পাননি।
বিধায়কের দাবি, কেবল অপরাধের প্রত্যক্ষ ঘটনাটিই নয়, তার আগে ও পরে হাসপাতাল এবং প্রশাসনের ভূমিকারও তদন্ত হওয়া দরকার। মেয়ের মৃত্যুর পর হাসপাতালের একটি দেওয়াল ও বেসিন ভাঙার অনুমতি কে দিয়েছিলেন, সেই প্রশ্ন ফের তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, অপরাধস্থলের কাছাকাছি নির্মাণ ভাঙার সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল, কার নির্দেশে তা হয়েছিল এবং তাতে কোনও গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়েছিল কি না—এসবের স্পষ্ট জবাব এখনও মেলেনি।
২০২৪ সালে স্বাস্থ্য দপ্তরের দায়িত্বে ছিলেন তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই কারণেই প্রশাসনিক দায় নির্ধারণের ক্ষেত্রে তাঁকে তদন্তের বাইরে রাখা যায় না বলে মনে করেন রত্না। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। রত্নার বক্তব্য, “তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এত দিনেও জেলে গেলেন না কেন? স্বাস্থ্যসচিব এখনও বাইরে কেন? আমরা গ্রেফতার চাই।”
তবে রাজ্যে ক্ষমতার পরিবর্তনের পরে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ করেছে বলেও দাবি করেন পানিহাটির বিধায়ক। তাঁর মতে, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর তদন্তে কিছুটা গতি এসেছে। কিন্তু শুধু প্রশাসনিক তৎপরতা বা নতুন করে নথিপত্র পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। মেয়ের মৃত্যুর নেপথ্যে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যাঁদের দায় রয়েছে, তাঁদের প্রত্যেককে আইনের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত ন্যায়বিচার সম্পূর্ণ হবে না।
রত্না স্পষ্ট করেছেন, তাঁর পরিবার কখনও সক্রিয় রাজনীতিতে নামার পরিকল্পনা করেনি। মেয়ের নির্মম মৃত্যু এবং তার পর বিচার পেতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়েছে, সেটিই তাঁকে রাজনীতিতে প্রবেশ করতে বাধ্য করেছে। তাঁর ভাষায়, পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ব্যবস্থার “সার্বিক ব্যর্থতা” তাঁকে এই দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করেছে। বিধায়ক হওয়া তাঁর কাছে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণের পথ নয়; বরং মেয়ের জন্য সম্পূর্ণ বিচার আদায় এবং ব্যবস্থার ভিতরে জমে থাকা অনিয়মের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি মাধ্যম।
আর জি কর মামলায় ইতিমধ্যে একজনকে দোষী সাব্যস্ত করা হলেও নিহত চিকিৎসকের পরিবার বরাবরই দাবি করে এসেছে, অপরাধের সম্পূর্ণ সত্য এখনও সামনে আসেনি। রত্নার নতুন দাবি সেই পুরনো প্রশ্নগুলিকেই আবার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আলোচনার কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনল—অপরাধে আর কেউ জড়িত ছিলেন কি না, তথ্যপ্রমাণ নষ্টের চেষ্টা হয়েছিল কি না এবং তৎকালীন স্বাস্থ্য প্রশাসনের দায় কতটা। তাঁর বক্তব্য অভিযোগ ও রাজনৈতিক দাবি; তদন্ত ও আদালতের বিচারেই তার সত্যতা নির্ধারিত হবে। তবে মেয়ের মৃত্যুর দু’বছর পরেও এক মায়ের প্রশ্নগুলি যে অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছে, তা তাঁর বক্তব্যে আরও একবার স্পষ্ট।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



