ওজন কমানো শুধু ইচ্ছাশক্তির ব্যাপার নয়! প্রশিক্ষকের ধারণা বদলালো জিএলপি-১

যা জানা জরুরি
- দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে স্বাস্থ্য ও শরীরচর্চার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন অরবিন্দ অশোক।
- ওজন কমানোর জন্য মানুষকে নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত খাদ্যগ্রহণ এবং জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
- কিন্তু তিন সপ্তাহের জন্য জিএলপি-১ গোত্রের ওষুধ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তাঁর বহু দিনের ধারণাতেই বড় পরিবর্তন এনেছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে স্বাস্থ্য ও শরীরচর্চার প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করছেন অরবিন্দ অশোক। ওজন কমানোর জন্য মানুষকে নিয়মিত ব্যায়াম, পরিমিত খাদ্যগ্রহণ এবং জীবনযাত্রায় শৃঙ্খলা আনার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কিন্তু তিন সপ্তাহের জন্য জিএলপি-১ গোত্রের ওষুধ ব্যবহারের অভিজ্ঞতা তাঁর বহু দিনের ধারণাতেই বড় পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে তিনি নতুন করে বুঝতে পেরেছেন, ওজন নিয়ন্ত্রণের লড়াই সব সময় নিছক ইচ্ছাশক্তি বা আত্মসংযমের পরীক্ষা নয়। এর পিছনে শরীর ও মস্তিষ্কের জটিল জৈবিক প্রক্রিয়াও কাজ করে।
জিএলপি-১ হল ‘গ্লুকাগন-লাইক পেপটাইড-১’ নামে একটি স্বাভাবিক হরমোন। খাবার খাওয়ার পরে অন্ত্রে তৈরি এই হরমোন মস্তিষ্ককে তৃপ্তির বার্তা পাঠায়, পাকস্থলী থেকে খাবার বেরোনোর গতি কমায় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এই হরমোনের কার্যকলাপ অনুকরণকারী ওষুধগুলি প্রথমে টাইপ-২ ডায়াবিটিসের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হলেও এখন স্থূলতা নিয়ন্ত্রণেও চিকিৎসকেরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সেগুলি প্রয়োগ করছেন।
অরবিন্দের কোনও চিকিৎসাগত কারণে এই ওষুধের প্রয়োজন ছিল না। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, জিএলপি-১ ওষুধ ব্যবহারকারী মানুষ ঠিক কী অনুভব করেন, তা নিজের অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বোঝা। অবশ্যই এই ধরনের পরীক্ষা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান ছাড়া করা উচিত নয়।
তিন সপ্তাহের অভিজ্ঞতায় তাঁর কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর পরিবর্তন ছিল ‘ফুড নয়েজ’ বা খাবার-সংক্রান্ত অবিরাম মানসিক কোলাহল হঠাৎ কমে যাওয়া। কখন কী খাবেন, বাড়িতে কোন খাবার রয়েছে, পরবর্তী বেলায় কী খাওয়া যেতে পারে কিংবা সামনে রাখা খাবারটি আর একটু নেবেন কি না—এ ধরনের চিন্তা অনেক মানুষের মনের মধ্যে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে। পেট ভরা থাকলেও মুখরোচক খাবারের প্রতি আকর্ষণ থেকে যায়। এই প্রবণতাকেই সাধারণভাবে ‘ফুড নয়েজ’ বলা হচ্ছে।
ওষুধ নেওয়ার পরে অরবিন্দ লক্ষ্য করেন, খাবার নিয়ে সেই অবিরাম ভাবনা অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে। খিদে পেলেই তিনি খাচ্ছেন, প্রয়োজনমতো খাওয়ার পরে অনায়াসে থেমে যাচ্ছেন। আগে যে খাবারটি সামনে থাকলে ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করে নিজেকে আটকাতে হত, এখন সেটির প্রতি তেমন আগ্রহই তৈরি হচ্ছে না। খাবারের কাছে থেকেও না খাওয়ার সিদ্ধান্ত যেন আলাদা কোনও মানসিক পরিশ্রম দাবি করছে না।
এই অভিজ্ঞতাই প্রশিক্ষক হিসেবে তাঁকে আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করায়। এত দিন তিনি হয়তো ধরে নিয়েছিলেন, সঠিক পরিকল্পনা জানা এবং যথেষ্ট দৃঢ়সংকল্প থাকলেই খাদ্যাভ্যাস নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু তাঁর বহু মক্কেল প্রতিদিন এমন এক জৈবিক তাগিদের সঙ্গে লড়াই করেন, যা বাইরে থেকে সহজে বোঝা যায় না। তাঁদের কাছে একটি বিস্কুট প্রত্যাখ্যান করা কিংবা দ্বিতীয়বার খাবার না নেওয়া যতটা কঠিন, অন্য কারও কাছে তা মোটেই ততটা কঠিন নাও হতে পারে।
অরবিন্দের উপলব্ধি, জিএলপি-১ ওষুধ কোনও মানুষের চরিত্র বা নিয়মানুবর্তিতা বদলে দেয় না; বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে থাকা তীব্র জৈবিক বাধাটিকে কিছুটা সরিয়ে দেয়। ফলে স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়া এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা তুলনায় সহজ হয়ে ওঠে। ওষুধটি সরাসরি শৃঙ্খলা তৈরি করে না, কিন্তু শৃঙ্খলা মেনে চলার অনুকূল মানসিক পরিসর তৈরি করতে পারে।
তবে ওজন কমানো আর সেই কম ওজন দীর্ঘদিন ধরে রাখা এক বিষয় নয়। ওষুধ বন্ধ করার পরে খিদে ও খাবারের কোলাহল ফিরে আসতে পারে। তাই ওষুধ চলাকালীন সময়টিকে নতুন অভ্যাস তৈরির সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা জরুরি। পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ, নিয়মিত প্রতিরোধমূলক ব্যায়াম, ঘুম, দৈনন্দিন চলাফেরা এবং খাবারের পরিকল্পনা—সবই সমান গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত ওজন কমার সময়ে পেশির ক্ষয় ঠেকাতে শক্তিবর্ধক ব্যায়াম বিশেষ প্রয়োজন।
জিএলপি-১ ওষুধের বমিভাব, কোষ্ঠকাঠিন্য, ডায়রিয়া ও পেটের অস্বস্তির মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে। কার জন্য কোন ওষুধ উপযুক্ত, তার মাত্রা কত হবে কিংবা আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কি না—এই সিদ্ধান্ত চিকিৎসকের। সামাজিক মাধ্যমে জনপ্রিয় হয়েছে বলে নিজের উদ্যোগে এই ওষুধ নেওয়া বিপজ্জনক।
তিন সপ্তাহের পরীক্ষায় অরবিন্দের সবচেয়ে বড় অর্জন তাই ওজন হ্রাস নয়, সহমর্মিতা। তাঁর অভিজ্ঞতা বুঝিয়েছে, স্থূলতাকে আলস্য, লোভ বা দুর্বল ইচ্ছাশক্তির ফল বলে দাগিয়ে দেওয়া বৈজ্ঞানিক এবং মানবিক—দুই দিক থেকেই ভুল। সুস্থ থাকার দায়িত্ব ব্যক্তির অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু সকলকে সেই দায়িত্ব পালনের জন্য একই রকম শরীর বা একই রকম নীরব মস্তিষ্ক দেওয়া হয়নি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



