বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। দীর্ঘ কয়েক দশকের গবেষণা, ব্যর্থতা, বিদেশি প্রযুক্তিনির্ভরতা এবং নীতিগত পরিবর্তনের পর এবার দেশীয় প্রযুক্তিতে যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির লক্ষ্য বাস্তবের অনেক কাছাকাছি পৌঁছেছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ২০২৫ সালের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে দেশীয় যুদ্ধবিমান এবং ভারতীয় ইঞ্জিন তৈরির যে আহ্বান জানানো হয়েছিল, এক বছরের মধ্যেই তা বাস্তবায়নের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
হিন্দুস্তান টাইমসের ‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক’ অনুষ্ঠানে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক শিশির গুপ্ত জানান, ভারতীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির প্রকল্প এখন আর কেবল রাজনৈতিক ঘোষণা নয়; এটি নির্দিষ্ট সময়সীমা, শিল্প অংশীদারিত্ব এবং প্রযুক্তিগত রূপরেখা নিয়ে এগিয়ে চলা একটি বাস্তব কর্মসূচি।
এএমসিএ: ভারতের পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান
দেশীয় যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হল অ্যাডভান্সড মিডিয়াম কমব্যাট এয়ারক্রাফ্ট (AMCA)। এটি ভারতের প্রথম স্টেলথ বা রাডারে কম দৃশ্যমান, বহু-ভূমিকার পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান হবে। এই প্রকল্পে সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পকেও বড় ভূমিকা দেওয়া হচ্ছে।
বর্তমানে তিনটি বড় শিল্পগোষ্ঠী—টাটা, ভারত ফোর্জ এবং লার্সেন অ্যান্ড টুবরো (এলঅ্যান্ডটি)—তাদের সরকারি অংশীদারদের সঙ্গে যৌথভাবে এই যুদ্ধবিমান তৈরির প্রতিযোগিতায় রয়েছে। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো ভারতের বেসরকারি প্রতিরক্ষা শিল্প অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান নির্মাণে সরাসরি অংশগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে।
সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ইঞ্জিন
যুদ্ধবিমান তৈরি যতটা কঠিন, তার থেকেও কঠিন কাজ একটি নির্ভরযোগ্য এবং উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন জেট ইঞ্জিন তৈরি করা। এতদিন পর্যন্ত ভারতীয় যুদ্ধবিমান বিদেশি ইঞ্জিনের উপর নির্ভরশীল ছিল। এলসিএ তেজসের ক্ষেত্রেও মার্কিন জিই-র ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে।
দেশীয়ভাবে কাবেরী ইঞ্জিন প্রকল্প শুরু হলেও তা প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। ফলে দীর্ঘদিন ভারতকে বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভর করতে হয়েছে।
সাফরান–জিটিআরই যৌথ উদ্যোগ
এবার সেই পরিস্থিতি বদলানোর পথে। ফরাসি সংস্থা সাফরান এবং প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার অধীন গ্যাস টারবাইন রিসার্চ এস্টাবলিশমেন্ট (GTRE) যৌথভাবে একটি আধুনিক যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
এই যৌথ উদ্যোগের প্রস্তাব এখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তা বিষয়ক কমিটির (CCS) অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ১৫ আগস্টের আগেই প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র পাবে।
প্রকল্পটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটি কেবল ইঞ্জিন কেনা নয়; বরং প্রযুক্তি উন্নয়ন, নকশা, উৎপাদন এবং ভবিষ্যতের উন্নত সংস্করণ তৈরির সক্ষমতা ভারতেই গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়েছে।
কেন এই প্রকল্প এত গুরুত্বপূর্ণ
বিশ্বে যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরি করতে সক্ষম দেশের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন এবং চীনের মতো কয়েকটি দেশই এই প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন করেছে।
ভারত যদি নিজস্ব উচ্চক্ষমতার জেট ইঞ্জিন তৈরি করতে পারে, তবে তা কেবল একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য হবে না; বরং প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে প্রকৃত অর্থে স্বনির্ভরতার বড় মাইলফলক হয়ে উঠবে।
এর ফলে—
- বিদেশি সরবরাহকারীর উপর নির্ভরতা কমবে।
- নিষেধাজ্ঞা বা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের ঝুঁকি হ্রাস পাবে।
- যুদ্ধবিমানের উন্নয়ন ও আধুনিকীকরণ দ্রুত করা সম্ভব হবে।
- ভবিষ্যতে প্রতিরক্ষা রপ্তানির নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বেসরকারি শিল্পের বাড়তি ভূমিকা
এই প্রকল্পের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হল বেসরকারি শিল্পকে আরও বড় ভূমিকা দেওয়া। এতদিন প্রতিরক্ষা উৎপাদনে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলিই প্রধান ছিল। এখন টাটা, ভারত ফোর্জ, এলঅ্যান্ডটির মতো সংস্থাগুলি উন্নত প্রযুক্তি, উৎপাদন দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নতুন প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করছে।
এর ফলে উৎপাদনের গতি যেমন বাড়বে, তেমনি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনও ত্বরান্বিত হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা।
এখনও রয়েছে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। উচ্চ তাপমাত্রা সহনশীল ধাতু, উন্নত টারবাইন ব্লেড, ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা এবং কঠোর পরীক্ষার মতো বহু ধাপ সফলভাবে অতিক্রম করতে হবে।
অর্থাৎ, প্রকল্পটি অনুমোদন পেলেই ইঞ্জিন তৈরি হয়ে যাবে—এমন নয়। বাস্তবে কার্যকর যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরি ও পরিষেবায় আনতে এখনও কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
তবুও প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যে গতিতে প্রকল্প এগোচ্ছে, তা ভারতের প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। বহু দশকের অপেক্ষার পর দেশীয় যুদ্ধবিমান ইঞ্জিন তৈরির স্বপ্ন এবার বাস্তব রূপ নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সফল হলে ভারত বিশ্বের সেই অল্প কয়েকটি দেশের কাতারে নাম লেখাবে, যারা নিজেরাই অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান এবং তার শক্তিশালী ইঞ্জিন সম্পূর্ণ দেশীয় সক্ষমতায় তৈরি করতে পারে।