বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বজুড়ে লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন জিএলপি-১ (GLP-1) শ্রেণির ওজন কমানোর ওষুধ—যেমন মাউনজারো (Mounjaro) বা ওজেম্পিক (Ozempic)—ব্যবহার করছেন। চিকিৎসকেরা সাধারণত বমি, বমিভাব, ডায়রিয়া বা কোষ্ঠকাঠিন্যের মতো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা আগেই জানিয়ে দেন। কিন্তু এই ওষুধ মানুষের প্রেম, যৌনজীবন এবং দাম্পত্য সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা এখনও খুব কমই আলোচিত বা গবেষণার বিষয়।
৫৭ বছর বয়সি জেনিফার (নাম পরিবর্তিত), পেশায় একজন আইনজীবী। শৈশব থেকেই স্থূলতার সঙ্গে লড়াই করেছেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, অতিরিক্ত ওজনের কারণেই মানুষ তাঁকে সামাজিক অনুষ্ঠানে ডাকত না, এমনকি স্বামীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
তিনি বলেন, “কোনও কিছু আমার মতো না হলে আমি ধরে নিতাম, মানুষ মোটা মানুষকে পছন্দ করে না। তারা চায় না কোনও মোটা মানুষ তাদের অনুষ্ঠানে থাকুক বা তাদের প্রতিষ্ঠানের মুখ হোক।”
ত্রিশের কোঠায় তিনি গ্যাস্ট্রিক স্লিভ অস্ত্রোপচারও করিয়েছিলেন। কিন্তু পরে আবার আগের চেয়েও বেশি ওজন বেড়ে যায়। ২০২৩ সালে মাউনজারো ব্যবহার শুরু করার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। তিন বছরে তাঁর ওজন কমেছে প্রায় ৪০ কেজি।
স্বামী প্রথমে ওষুধের সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দু’জনেই মনে করেছিলেন, ঝুঁকি নেওয়া সার্থক হবে।
শারীরিকভাবে ওজন কমলেও, তাঁদের ৩০ বছরের দাম্পত্য সম্পর্কে নতুন ধরনের টানাপোড়েন শুরু হয়। জেনিফার বলেন, “ওষুধ খাওয়ার আগে পাঁচ বছর মনোবিদের কাছে গিয়েছিলাম। তা না হলে এই মানসিক পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হত না।”
শুধু ক্ষুধা নয়, বদলাচ্ছে মস্তিষ্কের পুরস্কার-ব্যবস্থাও
জিএলপি-১ ওষুধ মূলত টাইপ-২ ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি হয়েছিল। এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে, হজমের গতি কমায় এবং ক্ষুধা হ্রাস করে। পরে এটি ওজন কমানোর কার্যকর ওষুধ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
তবে গবেষকেরা এখন মনে করছেন, এই ওষুধ শুধু ক্ষুধাই কমায় না, মস্তিষ্কের ডোপামিন-নির্ভর ‘রিওয়ার্ড’ বা আনন্দ পাওয়ার ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে।
স্থূলতা-চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. টেরি-লিন সাউথের কথায়, “আমরা দেখছি, এই ওষুধ মদ, নিকোটিন এবং সম্ভবত যৌন আকাঙ্ক্ষার মতো আনন্দ-নির্ভর আচরণও কমিয়ে দিতে পারে।”
যৌন আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে না কমছে?
এই বিষয়ে গবেষণার ফল এখনও একেবারে স্পষ্ট নয়।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জিএলপি-১ ওষুধ পুরুষদের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা বাড়িয়ে যৌনস্বাস্থ্য উন্নত করতে পারে।
আবার ২০২৫ সালে মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (FDA) তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জিএলপি-১ রিসেপ্টর অ্যাগোনিস্ট ব্যবহারকারীদের মধ্যে ১৮৫টি যৌন সমস্যার অভিযোগ জমা পড়েছে, বিশেষ করে পুরুষদের ক্ষেত্রে।
একই বছরে কিনসি ইনস্টিটিউটের সমীক্ষায় দেখা যায়—
- ১৮ শতাংশ ব্যবহারকারীর যৌন আকাঙ্ক্ষা বেড়েছে।
- ১৬ শতাংশের যৌন আকাঙ্ক্ষা কমেছে।
ডা. সাউথের মতে, “এখানে এখনও বোঝা বাকি—পরিবর্তনের কারণ আসলে ওজন কমা, নাকি ওষুধ, নাকি একই সঙ্গে অন্য শারীরিক পরিবর্তন, যেমন মেনোপজ বা বয়সজনিত প্রভাব।”
ওজন কমলে সম্পর্কও বদলায়
২০১৮ সালের একটি সুইডিশ গবেষণায় ১,৯৫৮ জন ব্যারিয়াট্রিক অস্ত্রোপচার করা রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়—
- যাঁরা বিবাহিত ছিলেন, তাঁদের মধ্যে বিচ্ছেদ বা আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে।
- আর অবিবাহিতদের নতুন সম্পর্কে জড়ানোর সম্ভাবনা বেড়েছে।
অর্থাৎ, দ্রুত ওজন কমা নিজেই সম্পর্কের গতিবিধি বদলে দিতে পারে।
“এখন আমি স্বামীকে আরও বেশি প্রত্যাশার মানদণ্ডে বিচার করি”
জেনিফার এখন বুঝতে পারছেন, তাঁর বিবাহিত জীবনের সমস্যা শুধু ওজনের কারণে ছিল না।
একদিন বাজার করতে গিয়ে এক অচেনা ব্যক্তি তাঁর ট্রলি গাড়ি ফিরিয়ে দিতে সাহায্য করেন। আগে এমন ঘটনা কখনও ঘটেনি।
আবার কর্মক্ষেত্রে অনেকেই মোটা সহকর্মীদের নিয়ে কটূক্তি করেন—যা তাঁকে বিস্মিত করে।
ওজন কমার পরে তাঁর স্বামীই প্রথম দম্পতি-পরামর্শ নেওয়ার প্রস্তাব দেন। কারণ তাঁর আশা ছিল, স্ত্রী আগের তুলনায় আরও ঘনিষ্ঠ হবেন। কিন্তু তা হয়নি। বরং তিনি অভিযোগ করেন, জেনিফার আগের তুলনায় “কঠোর” হয়ে গিয়েছেন।
জেনিফারের নিজের উপলব্ধি, “এখন সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার ভয় কমে গেছে। তাই হয়তো স্বামীর কাছে আমার প্রত্যাশাও বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আগে ভাবতাম সব সমস্যার কারণ আমার ওজন। এখন বুঝছি, আমাদের সম্পর্কের সমস্যা সবসময়ই দু’জনের ছিল। শুধু নিজের ওজনকে দোষ দেওয়াটা সহজ ছিল।”
ওষুধ নয়, সামনে আসে চাপা পড়ে থাকা সমস্যা
ব্রিসবেনের ওয়েট ম্যানেজমেন্ট সাইকোলজি ক্লিনিকের মনোবিজ্ঞানী গ্লেন ম্যাকিন্টশের মতে, ওজন কমার ফলে সম্পর্ক নষ্ট হয় না; বরং আগে থেকে থাকা সমস্যাগুলি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তিনি বলেন, “অনেক দম্পতির প্রতিদিনের অভ্যাস ছিল একসঙ্গে বসে টিভি দেখতে দেখতে চিপস খাওয়া। জিএলপি-১ ওষুধের কারণে সেই অভ্যাস বদলে গেলে সম্পর্কেও পরিবর্তন আসে। সেই পুরনো জীবনকে হারানোর একটা শোক বা মানিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া তৈরি হয়।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, জিএলপি-১ ওষুধ মানুষের শরীরের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস, আত্মপরিচয়, সামাজিক অবস্থান এবং সম্পর্কের ভিতও নতুন করে মূল্যায়ন করতে বাধ্য করছে। ফলে অনেকের কাছে ওজন কমার যাত্রা কেবল শারীরিক পরিবর্তনের নয়, মানসিক ও দাম্পত্য জীবনেরও বড় এক মোড় হয়ে উঠছে।