সৌদিতে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ: ন’বছরের দুঃস্বপ্ন নিয়ে মুখ খুলল রামি নাইমির পরিবার

যা জানা জরুরি
- স্বামীকে মুক্ত করতে নীরব কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে, বলছেন ব্রিটিশ নাগরিক মীরা লোজি।
- ২০১৭ সালে দুবাই থেকে প্রথম তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ব্যবসায়ী রামি নাইমিকে।
- ন’বছর ধরে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক চেষ্টার পর এই প্রথম প্রকাশ্যে মুখ খুললেন এক ব্রিটিশ মহিলা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
স্বামীকে মুক্ত করতে নীরব কূটনীতি ব্যর্থ হয়েছে, বলছেন ব্রিটিশ নাগরিক মীরা লোজি। ২০১৭ সালে দুবাই থেকে প্রথম তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ব্যবসায়ী রামি নাইমিকে।
ন’বছর ধরে পর্দার আড়ালে কূটনৈতিক চেষ্টার পর এই প্রথম প্রকাশ্যে মুখ খুললেন এক ব্রিটিশ মহিলা। তাঁর অভিযোগ, সৌদি কর্তৃপক্ষ তাঁর স্বামীকে অপহরণ করেছে, নির্যাতন চালিয়েছে এবং জোর করে বিভিন্ন শর্ত মানতে বাধ্য করেছে। এত দিন নীরব থেকে মুক্তির চেষ্টা করেও কোনও লাভ হয়নি।
ব্যবসায়ী রামি নাইমিকে প্রথম অপহরণ করা হয় ২০১৭ সালে, দুবাই থেকে। বাবার সঙ্গে অস্ট্রেলিয়া সফর সেরে ফিরেছিলেন তিনি। নির্যাতনের পরে পরের বছর তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
তিন সন্তানের বাবা রামি সৌদি আরবের প্রাক্তন তেলমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থা আরামকোর প্রাক্তন প্রধান আলি আল-নাইমির ছেলে। ২০২২ সালে তাঁকে ফের আটক করা হয় এবং দু’বছর বন্দি রাখা হয়। গত বছর গোপন বিচারে তাঁকে ছ’বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
প্রথম বার তাঁকে আটক করা হয়েছিল সৌদি রাজতন্ত্রের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রায় ৪০০ জনের সঙ্গে। রিয়াধের রিৎজ-কার্লটন হোটেলে তাঁদের আটকে রাখার সেই বহুচর্চিত অভিযান আধুনিক সৌদি আরবের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এবং বিতর্কিত শুদ্ধি অভিযানে পরিণত হয়।
পরিবারের ভাষায়, বছরের পর বছর ধরে চলা কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ব্যর্থ হওয়ার পরেই তাঁরা প্রকাশ্যে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সৌদি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাঁদের অভিযোগ—অপহরণ, গুম করে রাখা, নির্যাতন এবং জবরদস্তি।
এখন নাইমির বিরুদ্ধে দ্বিতীয় একটি বিচারের প্রস্তুতি চলছে। অভিযোগ, তিনি সমাজমাধ্যম এক্সে সৌদি আরবের সমালোচনাকারী কয়েকটি অ্যাকাউন্ট অনুসরণ করতেন এবং অনুমতি ছাড়া দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেছিলেন। দু’টি অভিযোগই তিনি অস্বীকার করেছেন।
মঙ্গলবার লন্ডনে নাইমিকে বাড়ি ফেরানোর দাবিতে প্রচারাভিযানের সূচনা অনুষ্ঠানে ছেলেকে পাশে নিয়ে তাঁর স্ত্রী মীরা লোজি বলেন, “প্রথমেই আমি প্রকাশ্যে সব বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে বলা হয়েছিল, তা করা যাবে না।”
লোজি এখন ক্যানসারের সঙ্গে লড়ছেন। চোখের জল সামলে তিনি জানান, স্বামীর মুক্তির পথ সহজ হবে—এই যুক্তিতে ২০১৭ সাল থেকে তাঁকে চুপ থাকতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল।
“ন’বছর ধরে আমি আর আমার সন্তানেরা একটা দুঃস্বপ্নের মধ্যে বেঁচে আছি,” বলেন তিনি। “আজ সত্যিটা বলতে পারা যেন এক ধরনের মুক্তি। অনেক হয়েছে। আমরা শুধু আশা করছি, এই দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটাতে পারব এবং সব দেশের সরকার আমাদের সাহায্য করতে পারবে।”
নাইমি ১৩ বছর বয়সে সৌদি আরব ছেড়েছিলেন। ব্যবসার সূত্রে বহু বছর ধরে ব্রিটেন, আমেরিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে যাতায়াত করেছেন। পরিবারের দাবি, ২০১৭ সালে বাবার সঙ্গে তাঁর বইয়ের প্রচার উপলক্ষে অস্ট্রেলিয়া সফর সেরে ফেরার পর দুবাইয়ে তাঁকে অপহরণ করা হয়।
পরিবার জানিয়েছে, চোখ বেঁধে জোর করে গাড়িতে তুলে তাঁকে আবু ধাবিতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ব্যক্তিগত বিমানে সৌদি আরবে। যাঁদের ধরপাকড় করা হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে নিজেকে দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছিলেন। কারণ, তিনি সাংবাদিক, আন্দোলনকর্মী বা রাজনীতিক—কোনওটিই নন।
সে সময় সৌদি অভিজাতদের একাংশকে রিয়াধের একটি পাঁচতারা হোটেলে আটকে রাখা হচ্ছিল। ওই অভিযানে রাজপরিবারের সদস্য, ধনকুবের এবং মন্ত্রীদের বিপুল সম্পদ হাতছাড়া হয়। পরে নির্যাতন ও জবরদস্তির বিস্তারিত বিবরণ সামনে আসে। এর পরের বছরই, ২০১৮ সালে, ইস্তানবুলের সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা করা হয়। সেই হত্যাকাণ্ড বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
পরিবারের অভিযোগ, নাইমিকে ওই হোটেলে তিন মাস ধরে নির্যাতন করা হয়। তাঁকে বিদ্যুতের শক দেওয়া হয়, জল ঢেলে ডুবে যাওয়ার আতঙ্ক সৃষ্টি করে নির্যাতন চালানো হয় এবং মানসিক নিপীড়ন করা হয়। তাঁকে মিথ্যা বলা হয়েছিল, পাশের ঘরেই তাঁর বাবাকে নির্যাতন করা হচ্ছে। একটি ‘সমঝোতাপত্রে’ সই করার পরে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তিনি ছাড়া পান।
এর পরে তাঁকে আরও একটি নথিতে সই করতে বাধ্য করা হয়। সেখানে ৫০০ কোটি সৌদি রিয়াল তুলে দেওয়ার অঙ্গীকার ছিল। পরে সেই অঙ্ক ‘কমিয়ে’ করা হয় ১০০ কোটি রিয়াল, ব্রিটিশ মুদ্রায় প্রায় ২০ কোটি পাউন্ড। পরিবারের বক্তব্য, এত টাকা নাইমিরও নেই, তাঁদেরও নেই। নাইমির উপর বৈদ্যুতিন নজরদারি চালু করা হয় এবং সৌদি আরব ছাড়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়।
পরিবারের অভিযোগ, ২০২২ সালে তাঁকে ফের গুম করা হয়। প্রায় দু’বছর তাঁর খোঁজ পাওয়া যায়নি। এই সময়ে আরও নির্যাতন এবং আবেগগত ও মানসিক নিপীড়নের শিকার হন তিনি। পরিবারের সদস্যেরা জানতেন না, তিনি জীবিত না মৃত। শেষ পর্যন্ত তাঁর আইনজীবী দল ও কূটনীতিকদের সাহায্যে তাঁরা জানতে পারেন, নাইমিকে সৌদি আরবের কুখ্যাত আল-হাইর কারাগারে রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চে মুক্তি পাওয়ার পরে তিনি নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কথা জানতে পারেন। তখনও তাঁর শরীরে অবস্থান নজরদারির বৈদ্যুতিন যন্ত্র লাগানো ছিল এবং দেশ ছাড়ার নিষেধাজ্ঞা বহাল ছিল। অভিযোগ করা হয়, তিনি বাবার সরকারি প্রভাবকে কাজে লাগিয়েছেন। সৌদি আরবে একটি মার্কিন সংস্থার প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করা এবং ডিজেল পাচার ঠেকানোর প্রযুক্তি সরবরাহের চুক্তি পেতে আরামকোকে সাহায্য করার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
সাত বছর কোনও অভিযোগ ছাড়াই কাটানোর পরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের একটি দেশের নাগরিক নাইমিকে গোপন বিচারে ছ’বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এখন তিনি সৌদি আরব ছাড়তে পারছেন না। পরিবারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের উপরেও নজরদারি চলছে। পরিবার জানিয়েছে, তাঁর ঘটনা প্রকাশ্যে আনার যে সিদ্ধান্ত তাঁরা নিয়েছেন, সে কথা নাইমি নিজেও জানেন না।
লোজি বলেন, “আজও আমরা জানি না, কেন রামিকে নিশানা করা হয়েছিল।” এতটাই আতঙ্কিত তিনি যে সৌদি আরবে ফিরতে বা সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে যেতেও ভয় পাচ্ছেন।
নাইমির ২১ বছরের ছেলে আলি বলেন, “এ যেন সিনেমার কোনও ঘটনা। ভয়াবহ। আমরা শুধু এই দুঃস্বপ্নের শেষ চাই।” বাবাকে যখন প্রথম অপহরণ করা হয়, তখন আলির বয়স ছিল ১২।
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ব্রিটেন ও সৌদি আরবের সম্পর্ক নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। দু’দেশের অস্ত্রবাণিজ্য, সৌদি আরবে প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা এবং নির্বাসিত আন্দোলনকর্মী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নিশানা করার ঘটনা এই সম্পর্ককে সমালোচনার মুখে ফেলেছে।
নাইমির পক্ষে আইনি লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন মানবাধিকার আইনজীবী কিলিন গ্যালাঘার। তিনি বলেন, “যে কোনও পরিবার এমন সিদ্ধান্ত নিলে সরকারের উচিত তাদের পাশে দাঁড়ানো।”
পরিবারটি ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী ও বিদেশসচিবের সঙ্গে দেখা করতে চায়। বিদেশে আটক ব্রিটিশদের জন্য সম্প্রতি বিশেষ দূত নিয়োগ করা হয়েছে। তবে গ্যালাঘারের বক্তব্য, প্রচারাভিযানের কর্মী, বিশেষজ্ঞ এবং সাংসদেরা যে ব্যবস্থার দাবি জানিয়েছিলেন, এই পদক্ষেপ তার তুলনায় অনেকটাই সীমিত।
তাঁর কটাক্ষ, এ ব্যবস্থা আসলে “খুবই সীমিত একটি গোষ্ঠীর জন্য চা আর সহানুভূতি”।
জানা গেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের নির্দেশ মেনে সেখানকার ভিন্নমতাবলম্বীদের অ্যাকাউন্ট আটকে দিচ্ছে এক্স। ফলে সৌদি আরবের ভিতর থেকে ওই অ্যাকাউন্টগুলি আর দেখা যাচ্ছে না। এই পদক্ষেপ করা মার্কিন সমাজমাধ্যম সংস্থাগুলির তালিকায় সর্বশেষ সংযোজন এক্স।
ব্রিটেনের বিদেশ দফতর এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকার করেছে। লন্ডনে সৌদি দূতাবাসের কাছেও প্রতিক্রিয়া চাওয়া হয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



