০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার সপ্তাহখানেক আগেই ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ব্যক্তিগতভাবে সতর্ক করেছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট। জানিয়েছিলেন, ইজ়রায়েলের বিরুদ্ধে বড়সড় আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছে হামাস। কিন্তু সেই সতর্কবার্তা পেয়েও কোনও পদক্ষেপ করেননি নেতানিয়াহু। ইজ়রায়েলি সংবাদপত্র ‘হারেৎজ়’-এর সাংবাদিকদের লেখা একটি বইয়ে এমনই দাবি করা হয়েছে।

গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী প্রচারের মধ্যে এই অভিযোগ সামনে আসায় ইজ়রায়েলের বিরোধী নেতারা প্রধানমন্ত্রীকে পদে থাকার ‘অযোগ্য’ বলে আক্রমণ করেছেন। নেতানিয়াহু অবশ্য প্রতিবেদনটিকে ‘ডাহা মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই সময়ে আমিরশাহির নেতার সঙ্গে তাঁর কথাই হয়নি।

হারেৎজ় জানিয়েছে, হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এক প্রাক্তন প্যালেস্টাইনি আধিকারিককে বলেছিলেন, তাঁরা একটি ‘ভয়াবহ অভিযানের’ প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেই অভিযানকে তিনি ‘ভূমিকম্প’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। সিনওয়ার পরে ইজ়রায়েলের হামলায় নিহত হন।

হামলার দেড় সপ্তাহ আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে কথা বলেন সংযুক্ত আরব আমিরশাহির প্রেসিডেন্ট মহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ান। তিনি জানান, হামাস বড়সড় অভিযানের পরিকল্পনা করছে।

মঙ্গলবার হারেৎজ়ে প্রকাশিত এই অভিযোগ ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর উপর চাপ আরও বাড়িয়েছে। ৭ অক্টোবরের হামলার আগের পরিস্থিতি সামলানোর প্রশ্নে ইতিমধ্যেই প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন তিনি।

ওই হামলায় হামাসের সশস্ত্র সদস্যেরা ১,২০০ জনেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেন এবং আরও ২৫১ জনকে পণবন্দি করে নিয়ে যান। তার জেরে গাজ়া, লেবানন ও ইরানে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধে আরও কয়েকশো ইজ়রায়েলি নিহত হয়েছেন, যাঁদের অধিকাংশই সেনাসদস্য। ইজ়রায়েলের পাল্টা আক্রমণে গাজ়ার বেশির ভাগ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। নিহত হয়েছেন ৭৩ হাজারেরও বেশি প্যালেস্টাইনি।

‘হস্টেজেস: ৮৪৩ ডেজ় অব অ্যাব্যান্ডনমেন্ট’ বইটিতে এই দাবিগুলি করা হয়েছে। লেখকেরা জানিয়েছেন, ইজ়রায়েল এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের বহু সূত্রের তথ্যের ভিত্তিতে বইটি লেখা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অত্যন্ত উচ্চপদস্থ আধিকারিকেরাও রয়েছেন।

হারেৎজ়ের তথ্য অনুযায়ী, নেতানিয়াহু এবং ইজ়রায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ়্যাক হারজ়গ-সহ সে দেশের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন বিন জায়েদ। এই কথোপকথনের জন্য আমিরশাহির এক কূটনীতিক ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি সুরক্ষিত ফোন পৌঁছে দিয়েছিলেন।

সাংবাদিকদের দাবি, ৭ অক্টোবরের দেড় সপ্তাহ আগে আবু ধাবির প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ থেকে নেতানিয়াহুকে ফোন করেন বিন জায়েদ। ৪৫ মিনিটের সেই কথোপকথনে তিনি সতর্ক করে জানান, সিনওয়ার বড়সড় অভিযানের পরিকল্পনা করছেন। আমিরশাহির প্রেসিডেন্টের আশঙ্কা ছিল, ওই অভিযান গোটা অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

খবরটি শুনে নেতানিয়াহু যে ভাবে শান্ত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিলেন, তাতে বিন জায়েদ বিস্মিত হন।

মঙ্গলবার নেতানিয়াহুর দফতর অবশ্য আমিরশাহির কাছ থেকে এমন কোনও সতর্কবার্তা পাওয়ার কথা অস্বীকার করেছে। এক বিবৃতিতে বলা হয়, “প্রাসঙ্গিক কোনও তথ্য থেকে থাকলে তা দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলির যোগাযোগের মাধ্যমে আদানপ্রদান করা হয়েছিল।”

মঙ্গলবারই একটি যৌথ বিবৃতিতে ইজ়রায়েলের একাধিক বিরোধী দলের নেতা জানান, নেতানিয়াহু কী জানতেন, কখন জেনেছিলেন এবং তার ভিত্তিতে আদৌ কোনও ব্যবস্থা নিয়েছিলেন কি না—সবই তাঁরা খুঁজে বার করবেন।

বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলা হয়, “তিনি কেন নিরাপত্তা সংস্থাগুলিকে জানাননি? ইজ়রায়েলের নাগরিকদের রক্ষা করতে কেন পদক্ষেপ করেননি?”

অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে উঠে আসা প্রাক্তন সামরিক প্রধান গাদি আইজ়েনকট অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকা নেতানিয়াহু নিরাপত্তার ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন। হামলার সকালে তাঁকে যথেষ্ট আগে ঘুম থেকে ডেকে তোলা হয়নি—এমন ‘করুণ’ অজুহাতের আশ্রয় নিচ্ছেন।

এক্সে আইজ়েনকট লেখেন, “৭ অক্টোবর নিয়ে নেতানিয়াহু বহু সতর্কবার্তা পেয়েছিলেন। সব ক’টিই উপেক্ষা করেছেন। তিনি অযোগ্য।”

নির্বাচনের আর এক প্রার্থী, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেট বলেন, ইজ়রায়েলের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের জন্য নেতানিয়াহুর “ব্যক্তিগত ও প্রত্যক্ষ দায় রয়েছে”।

বেনেটের বক্তব্য, “নেতানিয়াহু আর এক মিনিটও নিজের পদে থাকতে পারেন না।”

মধ্য-বামপন্থী ডেমোক্র্যাটস দলের নেতা ইয়াইর গোলান অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু “ইজ়রায়েলকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন”।

সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় তিনি বলেন, “‘কেউ আমাকে ঘুম থেকে ডাকেনি’—এই সব গল্পের দিন শেষ। আপনি জানতেন, আপনি উপেক্ষা করেছেন, আপনি ব্যর্থ হয়েছেন, দায় আপনার।”

হামাসের আক্রমণ ঠেকাতে না পারার পিছনে নিরাপত্তাব্যবস্থার কী কী ত্রুটি ছিল, তা খতিয়ে দেখতে বহু ইজ়রায়েলি একটি স্বাধীন রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছেন।

বিরোধী দলগুলি জানিয়েছে, নির্বাচনে জিতলে এমন একটি কমিশন গঠনই হবে তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। কমিশনের সদস্যদের নিয়োগ করবে সুপ্রিম কোর্ট। নেতানিয়াহুর সরকার এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।