International

কুকুর ধরার বদলে চিকিৎসা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • ভোর হলেই রোমানিয়ার স্মেউরা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়ে একটি ভ্যান।
  • তবে কুকুর ধরতে নয়—বিনা খরচে তাদের নির্বীজন করতেই এই চলন্ত চিকিৎসাকেন্দ্রের যাত্রা।
  • ক্যাতেয়াস্কা গ্রামে এমনই এক কর্মসূচিতে নিজের তিনটি কুকুর নিয়ে এসেছিলেন ইউলিয়ান স্তোইকা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

ভোর হলেই রোমানিয়ার স্মেউরা আশ্রয়কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে পড়ে একটি ভ্যান। গন্তব্য আশপাশের গ্রাম। তবে কুকুর ধরতে নয়—বিনা খরচে তাদের নির্বীজন করতেই এই চলন্ত চিকিৎসাকেন্দ্রের যাত্রা।

ক্যাতেয়াস্কা গ্রামে এমনই এক কর্মসূচিতে নিজের তিনটি কুকুর নিয়ে এসেছিলেন ইউলিয়ান স্তোইকা। ১৭ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের মাঠপ্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই উদ্যোগের ছবি। আয়োজকদের হিসাবে, চলতি বছরের ওই সময় পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার নির্বীজন অস্ত্রোপচার হয়েছে। উদ্যোগটি সেপ্টেম্বরেই শুরু হয়নি; নতুন খবর হল, পথকুকুর নিয়ন্ত্রণে এই পদ্ধতিকে আরও বিস্তৃত ভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা।

স্মেউরা আশ্রয়কেন্দ্রের গল্পও কম অদ্ভুত নয়। পিতেশ্তির কাছে প্রায় পাঁচ হেক্টর বনভূমির এই জায়গাটি একসময় ছিল শিয়াল পালনের খামার। জার্মান প্রাণীকল্যাণ সংগঠন টিয়ারহিলফে হফনুং ২০০৫ সালে জমিটি কিনে নেয়। সংগঠনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখন সেখানে ছয় হাজারের বেশি কুকুর এবং কয়েকশো বিড়ালের আশ্রয় রয়েছে।

আহত, অসুস্থ বা পরিত্যক্ত প্রাণীকে জায়গা দেওয়া আশ্রয়কেন্দ্রটির একটি কাজ। কিন্তু আরও একটি প্রশ্ন তাদের সামনে—আজ যে কুকুরকে আশ্রয় দেওয়া হল, তার জায়গায় আগামী বছর আরও কত কুকুর এসে দাঁড়াবে?

সেই জায়গাতেই ভ্যানটির গুরুত্ব। পুরনো একটি অ্যাম্বুল্যান্স বদলে তৈরি হয়েছে চলমান চিকিৎসাকেন্দ্র। গ্রামের মানুষ আগে থেকে নাম নথিভুক্ত করতে পারেন, নির্দিষ্ট দিন ও জায়গায় নিয়ে আসতে পারেন নিজেদের কুকুর। দূরের এলাকায় স্থানীয় পশুচিকিৎসকদের সঙ্গেও কাজ করা হয়। ফলে পরিষেবাটি শুধু পথের কুকুরের জন্য নয়, মানুষের পোষা প্রাণীর জন্যও।

আয়োজকদের যুক্তি সহজ: গ্রামের বাড়ি বা খামারে অনিয়ন্ত্রিত প্রজনন থেকে যে নতুন কুকুর জন্মায়, তাদের একটা অংশ পরে রাস্তায় চলে আসে। শুধু রাস্তায় থাকা কুকুর ধরে সরিয়ে দিলে সেই উৎস বন্ধ হয় না। নির্বীজনের মাধ্যমে জন্মের হার কমানো গেলে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছনো সম্ভব। অবশ্য এটি আয়োজকদের ব্যাখ্যা; দেশজুড়ে স্বাধীন ভাবে করা কোনও ফলাফল-সমীক্ষা নয়।

স্থায়ী পরিষেবার পরিকাঠামোও তৈরি হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে চালু হয়েছে একটি নির্বীজন ও নিবন্ধনকেন্দ্র। পাশাপাশি স্কুলে শিশুদের প্রাণীর প্রতি আচরণ এবং দায়িত্ব নিয়েও সচেতনতা কর্মসূচি চালানো হয়।

সংগঠনটির প্রকাশিত ২০২৫ সালের হিসাব অনুযায়ী, সে বছর ৩৭,৯৮৬টি নির্বীজন হয়েছে। তাদের বর্তমান ওয়েবসাইটে ১৪২ জন কর্মী এবং প্রতিদিন প্রায় ২,৮০০ কিলোগ্রাম খাবারের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছে। একই হিসাবে, ২০২৫ সালে ২,৭৮৭টি কুকুর নতুন বাড়িও পেয়েছে। অর্থাৎ দত্তক দেওয়ার কাজ চলছে পাশাপাশি—নতুন প্রাণী যাতে রাস্তায় না আসে, তার চেষ্টাও চলছে। এই সংখ্যাগুলি সংগঠনটির নিজস্ব প্রশাসনিক হিসাব; স্বাধীন ভাবে নিরীক্ষিত সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে এগুলি দেখা উচিত নয়।

তবে আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হয় না। ১৫ মে প্রকাশিত এপির একটি প্রতিবেদনে প্রাণীকল্যাণ সংগঠন ফোর পজের রোমানিয়ার নয়টি কেন্দ্র পরিদর্শনের ফল নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। অতিরিক্ত ভিড়, চিকিৎসাহীন ক্ষত এবং অপরিচ্ছন্ন পরিবেশের অভিযোগ ছিল সেখানে। পরিদর্শনটি হয়েছিল জানুয়ারিতে—অর্থাৎ এটি সেপ্টেম্বরের নতুন ঘটনা নয়। আবার নয়টি কেন্দ্রের অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশের সব আশ্রয়কেন্দ্রের পরিস্থিতিও বিচার করা যায় না। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট: কোনও প্রাণী রাস্তা থেকে সরেছে মানেই সে নিরাপদে আছে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

স্মেউরার মডেল তাই একাধিক ধাপকে একসঙ্গে রাখছে—ধরা, নির্বীজন, টিকা এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে ফের রাস্তায় ছেড়ে দেওয়া। তার সঙ্গে থাকছে আশ্রয় ও দত্তক। কিন্তু এখানেও হিসাবের ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। কত অস্ত্রোপচার হয়েছে, সেটি কাজের পরিমাণ। আর কত নতুন ছানা জন্মানো কমেছে, কত প্রাণী ফের পরিত্যক্ত হয়নি, কতটা কমেছে মানুষ-কুকুর সংঘাত—সেগুলি ফলাফলের হিসাব। প্রথম সংখ্যাটি বড় হলেই দ্বিতীয়টি নিশ্চিত হয় না।

এই ভ্যানের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হয়তো চিকিৎসার চেয়েও সহজ একটি জায়গায়। দূরের ক্লিনিক, যাতায়াতের ঝামেলা এবং খরচের কারণে কোনও মালিক যদি পোষা কুকুরের নির্বীজন করাতে না পারেন, শুধু ‘দায়িত্বশীল হোন’ বলা খুব একটা কাজে আসে না। চিকিৎসা যদি গ্রামের দরজার কাছাকাছি পৌঁছে যায়, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও সহজ হতে পারে। তবে তার সঙ্গে প্রয়োজন নিরাপদ অস্ত্রোপচার, টিকা, পরবর্তী পরিচর্যা এবং নিয়মিত অনুসরণ।

জননিরাপত্তার কথাও বাদ দেওয়া যায় না। শিশু ও পথচারীদের সুরক্ষা যেমন জরুরি, তেমনই অকারণ নিষ্ঠুরতাও কোনও সমাধান নয়। কোনও পদ্ধতি কতটা কার্যকর, তা বুঝতে হলে কামড়ের ঘটনা, টিকার আওতা, পুনরায় পরিত্যক্ত প্রাণীর সংখ্যা এবং আশ্রয়কেন্দ্রের পরিবেশ—সবকিছুকেই একসঙ্গে দেখতে হবে।

কারণ শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি শুধু আরও বড় আশ্রয়কেন্দ্র নয়। বরং এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে কম সংখ্যক কুকুরের সেই আশ্রয়ের প্রয়োজন হয়।

স্মেউরার ভ্যানগুলি আপাতত সেই পথেই চলছে। রাস্তা থেকে কুকুর সরানোর বদলে, সমস্যাটিকে একটু আগে থেকেই থামানোর চেষ্টা করছে তারা। এবার দেখার, সেই চাকা কত দূর যায়।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles