ফের আলোচনার টেবিলে

যা জানা জরুরি
- পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ফের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে আমেরিকা।
- হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সমাধান চায় ওয়াশিংটন।
- ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ফের কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টা শুরু করেছে আমেরিকা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
পশ্চিম এশিয়ায় সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার মধ্যেই ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ফের কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করেছে আমেরিকা। আলোচনায় বসেছেন ট্রাম্পের দূতেরা। তবে এখনও বড় কোনও অগ্রগতির খবর নেই। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েও সমাধান চায় ওয়াশিংটন।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ফের কূটনৈতিক আলোচনার চেষ্টা শুরু করেছে আমেরিকা। বুধবার মার্কিন বিদেশসচিব মার্কো রুবিও জানান, আগের দিন রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভার ফাঁকে ইরানের সঙ্গে কথা বলেছেন মার্কিন আলোচকেরা।
আলোচনা শুরু হল এমন এক সময়ে, যখন ইরানের মিত্র হুথিদের অভিযানেও পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ফেব্রুয়ারিতে ইরানের উপর আমেরিকা ও ইজরায়েলের হামলা দিয়ে শুরু হওয়া সংঘাতের পর হুথিদের তৎপরতা কার্যত তৈরি করেছে আর একটি রণাঙ্গন।
রুবিও জানান, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই জ্যারেড কুশনার তাঁর নির্দেশেই ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। আলোচনার মূল লক্ষ্য, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সঙ্গে যুক্ত পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে তেহরানকে রাজি করানো।
তবে আলোচনার পরিধি শুধু পরমাণু কর্মসূচিতে আটকে নেই। যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালির উপর ইরানের যে নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে, তারও সমাধান চান মার্কিন প্রতিনিধিরা।
উইটকফ ট্রাম্পের বিশেষ দূত। কুশনার ব্যবসায়ী; প্রেসিডেন্টের জামাই হলেও তাঁর প্রশাসনে কোনও সরকারি পদ নেই।
নিউ ইয়র্কের একটি হোটেলে সাংবাদিকদের রুবিও বলেন, “মতামত ও বার্তা বিনিময়ের সুযোগ থাকলে আমরা তা করব। গতকাল মূলত সেটাই হয়েছে। সেই দিক থেকে বিষয়টি ইতিবাচক।”
তবে আশাবাদে লাগাম টেনে তাঁর সতর্কতা, “এটাকে বড় কোনও অগ্রগতি বলে ভুল ধারণা তৈরি করতে চাই না। একই সঙ্গে আমার মনে হয়, অন্তত একটা আলোচনা যে হয়েছে, সেটাও তাৎপর্যপূর্ণ।”
এর ঠিক আগের দিন, মঙ্গলবার, ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন—যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি না হলে তিনি “ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে নিশ্চিহ্ন” করে দেবেন।
এক দিকে উইটকফ ও কুশনার, অন্য দিকে ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। কাতারের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা ধরে বৈঠক হয়। বিরোধী পক্ষগুলির মধ্যে যোগাযোগের সেতু হিসেবে কাতার আগেও একাধিক বার কাজ করেছে।
বৈঠক সম্পর্কে পাওয়া তথ্য ব্যাখ্যা করে রুবিও বলেন, “মূলত আগের আলোচনাগুলিতে যাঁরা যুক্ত ছিলেন, তাঁদের সঙ্গেই সেই কথাবার্তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা হয়েছে।”
তবে মার্কিন প্রতিনিধিদের সঙ্গে কোনও সমঝোতা হলেও ইরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্ব তা মেনে চলবে কি না, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন রুবিও। তাঁর মতে, দেশের এই অংশের নেতৃত্ব এখনও ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শকে গভীর ভাবে আঁকড়ে রয়েছে।
যুদ্ধের গোড়ার হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের একাধিক ব্যক্তি নিহত হওয়ার পর ক্ষমতার উপর প্রভাব আরও বাড়িয়েছে ইসলামি বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী বা আইআরজিসি। নিজেদের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের রক্ষক বলে মনে করে এই বাহিনী।
রুবিও বলেন, “ইরানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা যাঁদের হাতে, তাঁরা বিপ্লবী ইরানের আদর্শে গভীর ভাবে বিশ্বাসী। আর সেটাই তাঁদের সঙ্গে বোঝাপড়ার পথে সমস্যা তৈরি করে।”
অন্য দিকে, বুধবার ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, কূটনৈতিক আলোচনা ফের শুরু করার জন্য তেহরান নিজের শর্ত স্পষ্ট করে দিয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের আটকে থাকা সম্পদ মুক্ত করা এবং সব রণাঙ্গনে শত্রুতা বন্ধ করা। বাঘাইও বর্তমানে নিউ ইয়র্কে রয়েছেন।
জুনে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে হওয়া ১৪ দফা শান্তি সমঝোতায় এই দাবিগুলিও ছিল। কিন্তু ইরানের কট্টরপন্থীরা হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতকারী বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালানোর পর সেই সমঝোতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
প্রণালির দক্ষিণাংশ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার চেষ্টা করছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। ওই অংশটি ইরানের তুলনায় ওমানের কাছাকাছি।
রুবিও ফের অভিযোগ করেছেন, সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে ইরানই। ট্রাম্প সেই সমঝোতা থেকে সরে এসে আরও জোরালো একটি চুক্তি চান বলে জানিয়েছেন।
ইরান নিয়ে ওবামা ও বাইডেন প্রশাসনের অন্যতম প্রধান আলোচক ছিলেন রবার্ট ম্যালি। তাঁর মতে, “দু’পক্ষই মনে করে, দর-কষাকষিতে তাদের হাত অন্য পক্ষের চেয়ে শক্তিশালী এবং তারা প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি দিন টিকে থাকতে পারবে। তাদের এই ব্যবধান ঘোচানোর কোনও পথ বৈঠক থেকে বেরোয়নি।”
এর মধ্যেই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে হুথিদের অভিযান। ইয়েমেনের এই গোষ্ঠী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। ইয়েমেনের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দীর্ঘ অভিযান সামলেও টিকে রয়েছে হুথিদের সশস্ত্র বাহিনী। গত বছর আমেরিকার বোমাবর্ষণেরও মুখোমুখি হয়েছে তারা।
আঞ্চলিক সরকারি কর্তাদের আশঙ্কা, ইরান হুথিদের বাব আল-মান্দেব দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল আরও সীমিত করতে উৎসাহিত করতে পারে। তাতে বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। আমেরিকা ও ইজরায়েলের যুদ্ধের জেরে ইতিমধ্যেই অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বিশ্বের নানা প্রান্তের ভোক্তাদের উপর।
বুধবার রাষ্ট্রপুঞ্জে ভাষণ দিতে গিয়ে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান অবশ্য আমেরিকার চাপের সামনে মাথা নোয়ানোর সম্ভাবনা নাকচ করেছেন। একই সঙ্গে আলোচনায় বসার আগ্রহও জানিয়েছেন তিনি।
পেজেশকিয়ানের কথায়, “ট্রাম্প এবং যাঁরা আমাদের ভয় দেখিয়ে বশে আনতে চান, তাঁদের ইরানকে বুঝতে হবে। আমরা সংলাপ, কূটনীতি ও আলোচনার জন্য প্রস্তুত। কিন্তু বলপ্রয়োগের ভাষা মেনে নেব না।”
এ সপ্তাহে চিনের নেতা শি জিনপিংয়ের ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রীয় সফরের সময় ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে বেজিংয়ের সাহায্য চাইবেন কি না, এক সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে রুবিও বলেন, “আমার মনে হয়, বিশ্বকে প্রভাবিত করে এমন প্রতিটি প্রাসঙ্গিক বিষয়ই প্রেসিডেন্ট তুলবেন।” তবে নির্ধারিত আলোচনার বিষয়ে আর বিস্তারিত জানাননি তিনি।
রুবিওকে আরও প্রশ্ন করা হয়, ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন হামলায় ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলির প্রবেশপথ ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার পরও ট্রাম্প কেন যুদ্ধ শেষ করে সরে আসছেন না?
রুবিওর জবাব, “কারণ, শেষ পর্যন্ত শুধু স্থাপনা ধ্বংস করলেই হয় না। এমন দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার প্রয়োজন, যা কার্যকর করানো যাবে—ইরান কখনও, কোনও অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না।”
তাঁর বক্তব্য, “এখন যাঁরা দেশটি শাসন করছেন, তাঁরা ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত এই ঝুঁকি বিশ্বের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।”
অর্থাৎ যুদ্ধের ময়দানে চাপ বজায় রেখেই কূটনীতির দরজাটিও খোলা রাখছে ওয়াশিংটন। কিন্তু পরমাণু কর্মসূচি, হরমুজ প্রণালি, অবরোধ এবং আঞ্চলিক সংঘাত—সবকিছুকে একসঙ্গে নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছনোর পথ এখনও যথেষ্ট কঠিন।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



