বার্লিনে এরাল্প-ঝড়

যা জানা জরুরি
- তুরস্ক থেকে রাজনৈতিক কারণে দেশছাড়া দম্পতির মেয়ে এলিফ এরাল্প।
- আবাসনকে সাধারণ মানুষের নাগালে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বার্লিনের জোট সরকারের নেতৃত্বের দোরগোড়ায় এই আইনজীবী।
- “আমার মতো মানুষের তো আসলে এ দেশে মেয়র হওয়ার কথা নয়।” গত শরতে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার সময় কথাটা বলেছিলেন এলিফ এরাল্প।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তুরস্ক থেকে রাজনৈতিক কারণে দেশছাড়া দম্পতির মেয়ে এলিফ এরাল্প। আবাসনকে সাধারণ মানুষের নাগালে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে বার্লিনের জোট সরকারের নেতৃত্বের দোরগোড়ায় এই আইনজীবী।
“আমার মতো মানুষের তো আসলে এ দেশে মেয়র হওয়ার কথা নয়।”
গত শরতে নির্বাচনী প্রচার শুরু করার সময় কথাটা বলেছিলেন এলিফ এরাল্প। কয়েক মাসের মধ্যেই সেই অসম্ভব বলে মনে হওয়া কথাটাই বাস্তবের দোরগোড়ায়। ৪৫ বছরের এই আইনজীবী এখন বার্লিনের পরবর্তী মেয়র হওয়ার দৌড়ে কেন্দ্রীয় মুখ। তাঁর বাবা-মা রাজনৈতিক কারণে তুরস্ক ছেড়ে জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এরাল্প মেয়র হলে জার্মান রাজধানীর শীর্ষ পদে বসবেন প্রথম তুর্কি বংশোদ্ভূত নেত্রী।
গত সপ্তাহান্তে নগর-রাজ্য বার্লিনের নির্বাচনে তাঁর দল ডি লিঙ্কে ২৬ শতাংশের কাছাকাছি ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছে। ফল ঘোষণার পর থেকেই এরাল্পের নাম ছড়িয়ে পড়েছে গোটা জার্মানিতে।
রবিবার রাতে দলের জয়ের উৎসবে ছিল উচ্ছ্বাসের ঢেউ। দীর্ঘ মন্দার পর ডি লিঙ্কেকে বার্লিনে জোট সরকার গঠনের সম্ভাবনার কাছাকাছি নিয়ে এসেছে এরাল্পের নেতৃত্ব। তাঁকে ঘিরে দলের কর্মী-সমর্থকদের উন্মাদনা ছিল অনেকটা তারকাকে বরণ করার মতো।
কেউ কেউ ইতিমধ্যেই তুলনা টানছেন নিউ ইয়র্কের ডেমোক্র্যাটিক সমাজতন্ত্রী জোহরান মামদানির সঙ্গে। ভোটের কয়েক সপ্তাহ আগে মামদানির এক উপদেষ্টাকে এরাল্পের প্রচারে সাহায্য করার জন্য বার্লিনে আনা হয়েছিল। তাঁর প্রচারের কৌশলেও ছিল প্রবীণ মার্কিন সেনেটর বার্নি স্যান্ডার্সের ছাপ।
জয়ের রাতে এরাল্প বললেন, “আমাদের শহরে ঘৃণাকে হারিয়েছে ভালোবাসা ও ন্যায়বিচার… এই বার্তাই ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বে।”
‘ঘৃণা’ বলতে তাঁর নিশানায় ছিল অতি দক্ষিণপন্থী অল্টারনেটিভ ফ্যুর ডয়েচল্যান্ড বা এএফডি। একই সময়ে জার্মানির অন্য একটি আঞ্চলিক নির্বাচনে প্রথম হওয়ার উদ্যাপনে মেতেছিল দলটি। উদারপন্থী বলে পরিচিত বার্লিনেও এএফডির ভোট বেড়েছে উল্লেখযোগ্য ভাবে।
তবে রাজধানীতে বাজিমাত ডি লিঙ্কের। প্রায় ২৬ শতাংশ ভোট নিয়ে দলটি শুধু মধ্য-বাম সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিনদের পেছনে ফেলেনি, দশকের পর দশক বার্লিনের রাজনীতিতে প্রভাবশালী থাকা সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদেরও পিছনে ফেলেছে। আরও বড় ধাক্কা খেয়েছে চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মেরৎসের রক্ষণশীল ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ইউনিয়ন বা সিডিইউ। এত দিন মেয়রের পদ ছিল তাদের হাতেই।
এখন এরাল্পের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা—এই জয়ের পর জোট সরকার গঠন। তাঁর প্রতিশ্রুতি, তিনি হবেন “বার্লিনের সব মানুষের মেয়র”।
তরুণ ভোটারদের মধ্যে তাঁর সাড়া বিশেষ ভাবে নজরকাড়া। তাঁদের ৪৭ শতাংশ এরাল্পকে ভোট দিয়েছেন। সাধারণত ভোটকেন্দ্রে যান না, এমন বহু মানুষকেও এবার ভোটের লাইনে এনেছে তাঁর প্রচার। বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার, সমাজমাধ্যমে সক্রিয় উপস্থিতি—সবই ছিল সেই কৌশলের অংশ। তবে সবচেয়ে বেশি সাড়া ফেলেছে একটি বিষয়: বাড়িভাড়া।
বার্লিনে আবাসনের খরচ গত কয়েক বছরে দ্রুত বেড়েছে। সেই চাপ কমাতে বড় আবাসন সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এরাল্প। একসময় জীবনযাত্রার তুলনামূলক কম খরচের কারণে বার্লিনকে বলা হত ‘গরিব, তবু আকর্ষণীয়’। সেই শহরেই এখন ভাড়ার আগুন।
প্রার্থী হওয়ার পর ভাষণে এরাল্প বলেছিলেন, “আমি লড়ছি, যাতে আমাদের শহরে থাকার খরচ আবার মানুষের সাধ্যের মধ্যে আসে। যাতে আমাদের শহরের ভবিষ্যৎ জমি-বাড়ির ফাটকাবাজেরা ঠিক না করে, আমরা সবাই মিলে ঠিক করতে পারি।”
তাঁর কথায়, আকাশছোঁয়া ভাড়া এখন সময়ের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা। “এই শহর আমাদের সকলের, ফাটকাবাজদের নয়”—ছিল তাঁর স্পষ্ট বার্তা।
এরাল্পের পরিকল্পনা আরও বড়। বার্লিনে বড় সংস্থাগুলির মালিকানাধীন দুই লক্ষের বেশি ফ্ল্যাট অধিগ্রহণের উদ্যোগ নিতে চান তিনি। এর বিরোধিতায় সরব হয়েছেন মেরৎস। কেউ কেউ এই নীতিকে ‘সমাজতন্ত্রের অতি তীব্র সংস্করণ’ বলে কটাক্ষ করছেন। মেরৎসের দাবি, এর অর্থনৈতিক প্রভাব হবে “বিপর্যয়কর”। এরাল্পের পরিকল্পনা ঠেকাতে আইন আনার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। এরাল্প অবশ্য পিছু হটার ইঙ্গিত দেননি।
তবে লাল ইটের রোটেস রাটহাউস—বার্লিনের সিটি হল—শেষ পর্যন্ত ডি লিঙ্কের দখলে আসবে কি না, তা এখনও নিশ্চিত নয়। ভবনটির ‘লাল’ নাম অবশ্য বাম রাজনীতির জন্য নয়, লাল ইটের জন্য।
এর মধ্যেই দলের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ জটিল করে তুলেছে জোটের সমীকরণ। ডি লিঙ্কের বিরুদ্ধে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলায় ব্যর্থতার অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি অপরাধী চক্রের সঙ্গে কথিত যোগাযোগ এবং তাদের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টার অভিযোগও সামনে এসেছে।
সম্ভাব্য জোটসঙ্গী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট ও গ্রিনরা জানিয়েছে, ডি লিঙ্কের সঙ্গে হাত মেলানোর আগে এই কথিত যোগাযোগ নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। ডি লিঙ্কের নেতৃত্ব অবশ্য অভিযোগগুলি বারবার অস্বীকার করেছে এবং দলের মধ্যে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
মঙ্গলবার দল জানায়, বার্লিনের এক বিধায়ক “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিধানসভা-সংক্রান্ত দায়িত্ব পালন থেকে বিরত থাকবেন”। তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধী চক্র এবং সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি হামাসপন্থী সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ রয়েছে।
সমালোচকদের আশ্বস্ত করতে সোমবার মুখ খোলেন এরাল্পও। তাঁর বক্তব্য, “হিংসা বা সন্ত্রাসকে কোনও ভাবে মহিমান্বিত করা কিংবা লঘু করে দেখা একেবারেই গ্রহণযোগ্য নয়। এই অবস্থানে আমি অটল। আমার কাছে সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ইহুদিদের জন্য যতটা দ্ব্যর্থহীন, মুসলিম, খ্রিস্টান এবং আমাদের শহরের প্রত্যেক মানুষের জন্যও ঠিক ততটাই।”
নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনকেও প্রচারের অংশ করেছেন এরাল্প। স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি থাকেন নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র ক্রয়েৎসবের্গের একটি ভাড়ার ফ্ল্যাটে। দক্ষিণ-মধ্য বার্লিনের এই এলাকা শহরের অন্যতম বৈচিত্র্যময় জনপদ এবং জার্মানির অন্যতম বড় তুর্কি অভিবাসী সম্প্রদায়ের আবাস। তাঁর সন্তানরা পাড়ার সরকারি স্কুলেই পড়ে।
তবে পরিবারকে তিনি প্রচারের আলো থেকে দূরে রেখেছেন। কারণ, তাঁর কথায়, “তাদের নিজেদের নিরাপত্তার জন্য”। ক্রয়েৎসবের্গে প্রচারের বড় অংশও তিনি করেছেন তুর্কি ভাষায়।
অধিকাংশ তুর্কি অভিবাসীর মতো তাঁর বাবা-মা পূর্ব আনাতোলিয়া থেকে ‘অতিথি শ্রমিক’ হয়ে জার্মানিতে আসেননি। তাঁরা ছিলেন ইস্তানবুলের সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক সংগঠনের কর্মী। সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক বিশ্বাসের কারণে দু’জনকেই কারাবন্দি করা হয়।
এরাল্পের মা হুলিয়া ছিলেন তুরস্কের পরিচিত নারীবাদী। গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে থাকায় জেল থেকে মুক্তি পান তিনি। এরপর তিনি এবং চিকিৎসক স্বামী সেলচুক পালিয়ে জার্মানিতে চলে আসেন। ১৯৮১ সালে মিউনিখে জন্ম এরাল্পের।
পরিবারটির আশ্রয় পাওয়ার পথও ছিল সহজ নয়। সেই অভিজ্ঞতাই, এরাল্পের মতে, তাঁর বিশ্বদৃষ্টিকে তৈরি করেছে।
“কর্তৃপক্ষ যখন এমন সব সিদ্ধান্ত নেয়, যার অর্থ আপনি বুঝতেই পারেন না, তখন কেমন লাগে—সে অভিজ্ঞতা আমার অনেক হয়েছে,” বলেছেন তিনি। “বর্ণবিদ্বেষ ও বৈষম্যও নিজের জীবনে অনুভব করেছি। তাই আজ আমি যেখানে এসে পৌঁছেছি, তার সঙ্গে আমার জীবনকাহিনির গভীর যোগ রয়েছে।”
ছোটবেলায় নিজের বাড়িই যেন হয়ে উঠেছিল আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য এক অঘোষিত ঠিকানা। এরাল্পের মনে আছে, বছরের পর বছর তাঁর বাবা-মা প্রায়ই আশ্রয়প্রার্থীদের বাড়িতে থাকতে দিতেন। তাঁর মা নার্সদের প্রশিক্ষণ দিতেন। জার্মানিতে নিজের পেশাগত যোগ্যতার স্বীকৃতি পেতেও তাঁকে ১৫ বছর লড়াই করতে হয়েছিল।
দশ বছর বয়সেই বন্ধুদের নিয়ে বাবা-মায়ের গ্যারাজে পরিবেশরক্ষার একটি সংগঠন বানিয়েছিলেন এরাল্প। পরে যুক্ত হন পরমাণুবিরোধী আন্দোলনে। হামবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন পড়ার পর বাধ্যতামূলক দু’বছরের ব্যবহারিক আইনি প্রশিক্ষণের জন্য চলে আসেন বার্লিনে। কাজ শুরু করেন ডি লিঙ্কের সংসদীয় দলের সঙ্গে। পরে জায়গা করে নেন বার্লিনের রাজ্য আইনসভায়।
২০১৭ সালে অভিবাসনবিরোধী এএফডি প্রথম বার জার্মানির পার্লামেন্ট বুন্ডেসটাগে ঢোকার পরই ডি লিঙ্কেতে যোগ দেওয়ার প্রেরণা পান বলে জানিয়েছেন এরাল্প।
দু’বছর পর, ২০১৯ সালে, শরণার্থী ও অভিবাসী পরিবার থেকে আসা ডি লিঙ্কের সদস্য ও সমর্থকদের নিয়ে গড়ে তোলেন ‘লিঙ্কস*কানাক্স’। লক্ষ্য ছিল দলের ভিতরে ও বাইরে অভিবাসী সমাজের প্রগতিশীল কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালো করা।
বারো বছর বয়সেই ঠিক করে ফেলেছিলেন, মানবাধিকার আইনজীবী হবেন। কারণ, “চোখের সামনে দেখা এই সমস্ত অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য”।
এখন তাঁর নিজের ভাষায়, “যা করব বলে পথে নেমেছিলাম, সেটাই করছি। আদালতের কক্ষে নয়, রাজনীতির ময়দানে।”
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



