লিঙ্কনে আট আত্মহত্যার চেষ্টা

যা জানা জরুরি
- ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার মধ্যেই বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ও তার সহযোগী নৌবহরের আট সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন।
- দীর্ঘ মোতায়েনের জেরে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
- ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটাতে হয়েছে তাঁদের।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার যুদ্ধে দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার মধ্যেই বিমানবাহী রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন ও তার সহযোগী নৌবহরের আট সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। দীর্ঘ মোতায়েনের জেরে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে দীর্ঘ সময় সমুদ্রে কাটাতে হয়েছে তাঁদের। সেই টানা মোতায়েনের মধ্যেই ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন এবং তার সঙ্গে থাকা নৌবহরের আট সদস্য আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। মঙ্গলবার মার্কিন সেনেটর কার্স্টেন গিলিব্র্যান্ডকে লেখা এক চিঠিতে এই তথ্য জানিয়েছেন নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব হাং কাও।
নৌবহরের সদস্যদের জীবনযাপনের মান নিয়ে গিলিব্র্যান্ডের প্রশ্নের জবাবে প্রতিরক্ষাসচিব পিট হেগসেথের হয়ে কাও জানান, লিঙ্কনের মোতায়েন শুরু হওয়ার পর থেকে গোটা নৌবহরে মোট আটটি আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে।
এই হিসাব শুধু লিঙ্কনের নাবিক ও কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে বিমানবাহী রণতরীর বিমানবিভাগ, আক্রমণকারী নৌবহর ও ডেস্ট্রয়ার স্কোয়াড্রনের দফতরের সদস্য, সঙ্গে থাকা ডেস্ট্রয়ারগুলির নাবিক এবং জাহাজে মোতায়েন সমস্ত বিমান স্কোয়াড্রনের সদস্যরাও রয়েছেন।
কাওয়ের চিঠির বিষয়টি প্রথম প্রকাশ করে সিএনএন।
লিঙ্কনের নাবিক ও কর্মীরা ২৮৬ দিন সমুদ্রে কাটানোর পর অবশেষে ১ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডের একটি পর্যটন শহরে তীরে নামার সুযোগ পান। মে মাসেই তাঁদের মোতায়েন শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধের নিষ্পত্তি না হওয়ায় সেই মেয়াদ বাড়ানো হয়।
তার পরেই সামনে আসতে থাকে জাহাজের ভিতরের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য। অগস্টে সামরিক বিষয়ক দু’টি সংবাদপত্রে নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতির কথা প্রকাশিত হয়। জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার একাধিক চেষ্টার কথাও উঠে আসে। পরিস্থিতি নিয়ে তদন্তের দাবি তোলেন ডেমোক্র্যাট নেতারা।
কাওয়ের চিঠিতে অন্তত দু’টি ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে। মার্চে এক নাবিক জাহাজ থেকে সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়ার চেষ্টা করলে সহকর্মীরা তাঁকে আটকান। অগস্টে আর এক নাবিক সমুদ্রে পড়ে যান। তাঁকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে “পরবর্তী চিকিৎসার জন্য জাহাজ থেকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়”, জানিয়েছেন কাও।
শুধু মানসিক স্বাস্থ্য নয়, দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অগস্টে এমএস নাউয়ের এক প্রতিবেদনে জাহাজের স্নানঘরে ছত্রাক জমা এবং খাবার, সাবান-সহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর মজুত কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল।
কাও জানিয়েছেন, একসময় মূল খাবারের বিকল্প পদের সংখ্যা সাময়িক ভাবে দু’টি থেকে কমিয়ে একটি করা হয়েছিল। তাঁর ব্যাখ্যা, “রসদ দিয়ে আরও বেশি দিন কাজ চালানো এবং নির্ধারিত অবস্থানে টানা মোতায়েন থাকা নিশ্চিত করতেই” এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রতিদিন চার বার পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রেখে খাবার পরিবেশন করা হয়েছে বলেও দাবি করেছেন তিনি।
নাবিক ও কর্মীদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মজুত নতুন করে পূরণ করতেও কিছুটা দেরি হয়েছিল বলে স্বীকার করেছেন কাও।
এর মধ্যেই সংবাদমাধ্যমে জাহাজের পরিস্থিতি নিয়ে একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশিত হতে থাকে। তবে সেগুলিকে গুরুত্ব দিতে চাননি হেগসেথ। তাঁর অভিযোগ, সংবাদমাধ্যম পরিস্থিতিকে “সম্পূর্ণ ভুল ভাবে তুলে ধরেছে”।
অগস্টে সাংবাদিকদের তিনি বলেছিলেন, “আমরা নিশ্চিত করি, প্রতিটি জাহাজ, প্রত্যেক নাবিক ও কর্মী এবং প্রত্যেক অধিনায়ককে প্রতি মুহূর্তে আমাদের পক্ষে যা কিছু দেওয়া সম্ভব, তার সবটাই দেওয়া হচ্ছে।”
কিন্তু বুধবার গার্ডিয়ানকে দেওয়া বিবৃতিতে গিলিব্র্যান্ড বলেন, “ট্রাম্প এবং প্রতিরক্ষাসচিব হেগসেথ যাকে ‘ভুয়ো খবর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন, দেখা গেল, আমাদের সামরিক বাহিনীর সদস্যেরা সত্যিই গুরুতর এবং ক্রমশ খারাপ হতে থাকা পরিস্থিতির মধ্যে ছিলেন।”
তাঁর অভিযোগ, “আমাদের সেনাসদস্যেরা এবং তাঁদের পরিবার প্রতিদিন বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেন। অথচ প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্য অসম্মান দেখিয়ে তাঁদের কথা উড়িয়ে দিয়েছেন।”
গিলিব্র্যান্ড আরও বলেন, “বোমা, নাচের আসর বসানোর হলঘর এবং ধনকুবেরদের জন্য এই প্রশাসন করদাতাদের অর্থের অন্তহীন জোগান খুঁজে পায়, কিন্তু সামরিক বাহিনীর সদস্যদের যত্ন নিতে পারে না—এ সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।”
অন্য দিকে, বুধবার গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন নৌবাহিনীর এক আধিকারিক বলেন, “নাবিকদের স্বাস্থ্য, সুস্থতা ও মনোবল বজায় রাখার বিষয়ে নৌবাহিনী এবং নৌসচিব অত্যন্ত দায়বদ্ধ।”
দীর্ঘ ২৮৬ দিনের মোতায়েন শেষে লিঙ্কনের নাবিকেরা তীরে ফিরলেও, তাঁদের অভিজ্ঞতা এখন মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন, রসদব্যবস্থা এবং সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নতুন করে নজর টানছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



