প্রাপ্তবয়স্ক হলেই ভরণপোষণ শেষ নয়: গুরুতর প্রতিবন্ধী সন্তানের পক্ষে হাইকোর্ট

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধীতার কারণে নিজে জীবিকা নির্বাহে অক্ষম সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলেও বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না—কলকাতা হাইকোর্ট এমনই পর্যবেক্ষণ করেছে।
- ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রায়ভিত্তিক প্রতিবেদনে বিচারপতি উদয় কুমার এক বাবার ফৌজদারি পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করেন।
- তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ অস্থিসংক্রান্ত প্রতিবন্ধিতা রয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: শারীরিক বা মানসিক প্রতিবন্ধীতার কারণে নিজে জীবিকা নির্বাহে অক্ষম সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হলেও বাবার ভরণপোষণের দায়িত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে শেষ হয় না—কলকাতা হাইকোর্ট এমনই পর্যবেক্ষণ করেছে। ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত রায়ভিত্তিক প্রতিবেদনে বিচারপতি উদয় কুমার এক বাবার ফৌজদারি পুনর্বিবেচনার আবেদন খারিজ করেন। তাঁর প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ অস্থিসংক্রান্ত প্রতিবন্ধিতা রয়েছে।
মামলাটি শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে। টুম্পা প্রামাণিক নিজের ও নাবালক ছেলে সুদীপ্তর জন্য স্বামী সমিত প্রামাণিকের কাছে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৫ ধারায় ভরণপোষণ চেয়েছিলেন। বিচারিক আদালত স্ত্রীর ব্যক্তিগত দাবি গ্রহণ করেনি, কারণ স্বামীর আগের বিবাহ বহাল থাকা অবস্থায় তাঁদের বিয়ে হয়েছিল বলে সিদ্ধান্ত হয়। তবে প্রতিবন্ধী ছেলের জন্য মাসে তিন হাজার টাকা ভরণপোষণ মঞ্জুর করা হয়েছিল; ২০১৬ সালে হাইকোর্টের অন্য বেঞ্চ বাবার আপত্তি খারিজ করে।
ছেলে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে মা ১২৭ ধারায় আগের আদেশ পরিবর্তন ও চালু রাখার আবেদন করেন। তাঁর বক্তব্য, ছেলের বয়স বদলালেও ৭০–৭৫ শতাংশ প্রতিবন্ধিতা ও নিজে চলার অর্থনৈতিক অক্ষমতা বদলায়নি। বাবা বলেন, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরে মায়ের পক্ষে মামলা চালানোর অধিকার শেষ এবং নতুন মামলা দরকার। তিনি সম্পদ ও দায় প্রকাশ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথাও তোলেন।
হাইকোর্ট বলেছে, ১২৫(১)(সি) ধারার সুরক্ষা এমন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জন্যও রয়েছে—বিবাহিত কন্যা ছাড়া—যিনি শারীরিক বা মানসিক অস্বাভাবিকতা বা আঘাতের কারণে নিজেকে চালাতে পারেন না। নাবালক থেকে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া এবং প্রতিবন্ধীতা অব্যাহত থাকা পরিস্থিতির পরিবর্তন; ১২৭ ধারায় আগের ভরণপোষণ আদেশ পরিবর্তন ও চালিয়ে যাওয়ার পথ ব্যবহার করা যায়। নতুন মামলা বাধ্যতামূলক করলে কল্যাণমূলক বিধানের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে পারে।
বাবার আরেক যুক্তি ছিল, ছেলে নিজে হাঁটতে পারেন এবং শিল্প প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের একটি পেশামুখী পাঠক্রম শেষ করেছেন। আদালত বলেছে, চলাফেরা বা প্রশিক্ষণ শেষ করা নিজে থেকে চাকরি পাওয়া, আর্থিক স্বাধীনতা বা প্রতিযোগিতামূলক শ্রমবাজারে নিজের খরচ চালানোর ক্ষমতা প্রমাণ করে না। জন্মের নথি ও চিকিৎসা প্রতিবেদন প্রতিবন্ধীতা সমর্থন করেছে।
এই রায়ের মানে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জন্য আজীবন ভরণপোষণ নয়। কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হল নিজের প্রয়োজন মেটানোর বাস্তব অক্ষমতা এবং তার কারণ। আয়, চাকরি, সম্পদ বা স্বাস্থ্যের অবস্থায় পরিবর্তন হলে আদালতে অঙ্ক ও আদেশ বদলের আবেদন করা যায়। একইভাবে তিন হাজার টাকার পুরনো অঙ্ক বর্তমান প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট কি না, তা পৃথক বিচার্য।
মায়ের প্রতিনিধিত্ব নিয়েও আদালত আপত্তি খারিজ করেছে। গুরুতর প্রতিবন্ধী প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি নিজে প্রতিটি শুনানি চালাতে না-পারলে পরিচর্যাকারী অভিভাবকের মাধ্যমে দাবি তোলার পথ বন্ধ করা বাস্তবে অধিকারটিকেই অর্থহীন করতে পারে। তবে প্রতিনিধি সন্তানের স্বার্থে কাজ করছেন কি না এবং টাকা তাঁর প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, আদালত প্রয়োজনে যাচাই করতে পারে। রক্ষণাবেক্ষণের অঙ্ক নির্ধারণে চিকিৎসা, যাতায়াত, সহায়ক যন্ত্র ও দৈনন্দিন পরিচর্যার বর্তমান খরচের নথি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষণ: প্রতিবন্ধীতা নিয়ে সামাজিক ভুল ধারণা প্রায়ই আইনি বিরোধে ঢুকে পড়ে: হাঁটতে পারা মানেই স্বনির্ভর, প্রশিক্ষণ মানেই চাকরি। আদালত এই সরল সমীকরণ প্রত্যাখ্যান করেছে। কর্মক্ষমতা নির্ভর করে কাজের পরিবেশ, সহায়ক ব্যবস্থা, বৈষম্য এবং বাস্তব আয়-সুযোগের উপর। পরিবারে যত্নের অবৈতনিক শ্রমও হিসাবের বাইরে রাখা উচিত নয়।
রায়টি বাবাকে শাস্তি দেওয়ার চেয়ে নির্ভরশীল সন্তানের ন্যূনতম সুরক্ষা বজায় রাখে। তবে পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সন্তানের প্রয়োজন ও সরকারি সহায়তা—সব বিবেচনায় নিয়মিত পর্যালোচনা প্রয়োজন। নিশ্চিত নীতি এতটুকু: আঠারো বছর পূর্ণ হওয়া ক্যালেন্ডারের ঘটনা; গুরুতর প্রতিবন্ধীতাজনিত নির্ভরতা শেষ হয়েছে কি না, তা আলাদা প্রমাণের প্রশ্ন।
ভরণপোষণ আদেশ সরকারি প্রতিবন্ধী ভাতা বা স্বাস্থ্যসেবার বিকল্প নয়। দুটি সহায়তার উদ্দেশ্য ও যোগ্যতার নিয়ম আলাদা; একটি পাওয়া গেলেই অন্য দায়িত্ব মুছে যায় না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



