যাদবপুরে ‘বন্দে মাতরম্’ ফতোয়া?

যা জানা জরুরি
- কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল জাতীয়তাবাদ।
- শনিবার ভবানীপুরের এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করলেন, শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেই নয়, গোটা রাজ্যেই ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করবে তাঁর সরকার।
- একই সঙ্গে তাঁর বার্তা—“বাংলায় থাকতে গেলে বন্দে মাতরম্ গাইতে হবে।” দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তাঁর সরকার কোনও আপস করবে না বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কলকাতা: যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির সংঘর্ষের রেশ কাটতে না কাটতেই বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এল জাতীয়তাবাদ। শনিবার ভবানীপুরের এক অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করলেন, শুধু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরেই নয়, গোটা রাজ্যেই ‘জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করবে তাঁর সরকার। একই সঙ্গে তাঁর বার্তা—“বাংলায় থাকতে গেলে বন্দে মাতরম্ গাইতে হবে।”
দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে তাঁর সরকার কোনও আপস করবে না বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। যাদবপুরের সাম্প্রতিক গোলমালের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “যাদবপুরের ভিতরে এবং বাইরে জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদ প্রতিষ্ঠা করবই।” বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে ভারতীয় সংস্কৃতি ও ‘সনাতন মূল্যবোধ’ প্রতিফলিত করার কথাও বলেন তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, যাদবপুরে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতা দিবস এবং প্রজাতন্ত্র দিবস পালনের মতো কর্মসূচিতেও বাধা দেওয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য নজরদারি ক্যামেরা বসানো বা পুলিশ সহায়তাকেন্দ্র তৈরির বিরোধিতা করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
শুভেন্দুর বক্তব্য, দীর্ঘ লড়াইয়ের পরে রাজ্যের মানুষ একটি ‘জাতীয়তাবাদী সরকার’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। সেই সরকারের আমলে কোনও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ‘দেশবিরোধী কার্যকলাপের’ ক্ষেত্র হয়ে উঠতে দেওয়া হবে না। তাঁর কথায়, “বাংলায় থাকতে গেলে বন্দে মাতরম্ গাইতে হবে। ভারতীয় সংস্কৃতি ও সনাতন সংস্কৃতিকে সম্মান করতে হবে।”
যাদবপুরের কয়েক জন ছাত্র ও সংগঠনকে নিশানা করে তিনি ‘দেশবিরোধী’ এবং ‘জেহাদি’ শক্তির কথাও বলেন।
কী থেকে শুরু সংঘর্ষ?
শুভেন্দুর মন্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিভাগের ছাত্র সংসদের সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ। ছাত্র সংসদের নির্বাচিত কমিটির মেয়াদ এবং সভার বৈধতা নিয়ে এবিভিপি আপত্তি তোলে। বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির অভিযোগ, এবিভিপি বহিরাগতদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে সভা ভণ্ডুল করার চেষ্টা করেছিল।
এবিভিপির পাল্টা দাবি, তাদের সদস্যদের মারধর করা হয়েছে এবং জাত তুলে অপমান করা হয়েছে। সংঘর্ষে দুই পক্ষেরই কয়েক জন আহত হন।
রাতের ঘটনার রেশ পরের দিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। এবিভিপি সমর্থকেরা যাদবপুর থানা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর গেটের দিকে মিছিল করেন। পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে কয়েক জন বন্ধ ফটকে উঠে পড়ার চেষ্টা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিতরে বামপন্থী ছাত্রছাত্রীরা তাঁদের প্রবেশ আটকাতে জড়ো হন।
বাইরে থেকে ডিম ও জলের বোতল ছোড়ার অভিযোগ ওঠে। অন্য দিকে, আট-বি বাসস্ট্যান্ডের কাছে এসএফআই-সহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলির মিছিলও পুলিশের ব্যারিকেডে আটকে যায়। দুই পক্ষের সঙ্গেই পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে।
ভাঙল যাদবপুরের প্রতীকও
গোলমালের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার নম্বর প্রবেশদ্বারে থাকা লোহার প্রতীকচিহ্নটি ভেঙে পড়ে। নন্দলাল বসুর নির্দেশনায় নির্মিত ওই প্রতীক যাদবপুরের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঘটনাটি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুলিশের কাছে অভিযোগ জানিয়েছে।
উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, ভিন্ন রাজনৈতিক মতের সহাবস্থান যাদবপুরের ঐতিহ্য হলেও হিংসা ও ভাঙচুর কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। রাতের ঘটনার পরে বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা বাড়ানো এবং ঘটনার তদন্তে অনুসন্ধান কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছেন তিনি।
বিজেপিতেও এক সুর নেই
যাদবপুরের ঘটনা নিয়ে বিজেপির মধ্যেও অবশ্য পুরোপুরি এক সুর শোনা যায়নি।
রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এবিভিপিকে দলের ছাত্র শাখা বলতে অস্বীকার করে জানিয়েছেন, এটি স্বাধীন ভাবে পরিচালিত একটি জাতীয়তাবাদী ছাত্র সংগঠন। অন্য দিকে, যাদবপুরের বিজেপি বিধায়ক শর্বরী মুখোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়কে ‘দেশবিরোধী তৈরির কারখানা’ বলে আক্রমণ করেছিলেন। পরে এবিভিপির সঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক সম্পর্ক নেই বলে কিছুটা দূরত্ব তৈরির চেষ্টা করেন তিনি।
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমের পাল্টা অভিযোগ, সঙ্ঘ পরিবার নতুন প্রজন্ম এবং স্বাধীন চিন্তার বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধ’ ঘোষণা করেছে। ছাত্র-রাজনীতিকে মতাদর্শগত দখলদারির পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ বামেদের। তাঁদের দাবি, বহিরাগতদের প্রবেশ বন্ধ করার পাশাপাশি অবিলম্বে ছাত্র সংসদ নির্বাচন করাতে হবে।
হিংসার তদন্ত, না কি নতুন মতাদর্শের লড়াই?
শুভেন্দুর মন্তব্যে যাদবপুরের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলার প্রশ্নটি এখন আরও বড় রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়াকে বাংলায় বসবাসের শর্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার বক্তব্য নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
দেশপ্রেমের প্রকাশ কোনও একটি গান, স্লোগান বা রাজনৈতিক মতাদর্শের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করা যায় কি না—এই প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে।
ফলে যাদবপুরে যে সংঘর্ষের তদন্ত এখনও শেষ হয়নি, তার মধ্যেই ‘জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা’র ঘোষণা পরিস্থিতিকে শান্ত করার বদলে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও বড় মতাদর্শগত সংঘাতের ময়দানে ঠেলে দিতে পারে।
যাদবপুরে প্রশ্নটা তাই এখন শুধু ছাত্র-রাজনীতির নয়—‘দেশপ্রেম’ কে ঠিক করবেন, সরকার না নাগরিক, সেই বিতর্কও সামনে এসে পড়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



