দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের দীর্ঘদিনের গোর্খা সমস্যার ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ খুঁজতে নতুন কমিটি গঠন করল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। প্রাক্তন উপ-জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা তথা কেন্দ্রের নিযুক্ত মধ্যস্থতাকারী পঙ্কজ কুমার সিংহের নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রস্তাবিত সমাধানের রূপরেখা তৈরি করবে। সেই ভিত্তিতে কেন্দ্র, রাজ্য এবং পাহাড়ের প্রতিনিধিদের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তির খসড়া প্রস্তুত করার কথা।

শনিবার শিলিগুড়ি সংলগ্ন সুকনায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পৌরোহিত্যে অনুষ্ঠিত ত্রিপাক্ষিক বৈঠকের পরে কমিটি গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, দার্জিলিংয়ের সাংসদ রাজু বিস্তা, রাজ্যসভার সদস্য হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, পাহাড়ের একাধিক বিধায়ক, রাজ্য সরকারের পদস্থ আধিকারিক এবং বিভিন্ন গোর্খা রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং ও সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরি এবং গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সভাপতি মন ঘিসিংও আলোচনায় অংশ নেন। পাহাড়ের স্বতন্ত্র পরিচয়, সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং স্থায়ী রাজনৈতিক বন্দোবস্ত—তিনটি বিষয়ই বৈঠকে বিশদে আলোচিত হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের বক্তব্য, ভারতীয় সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই সমাধান বার করা হবে। অমিত শাহ পাহাড়ের অন্য দাবিগুলিও সহানুভূতির সঙ্গে বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। বকেয়া উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক সমস্যার নিষ্পত্তিতে কেন্দ্র পর্যাপ্ত অর্থ দেবে বলেও তিনি জানিয়েছেন। তবে ‘স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান’ বলতে পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য, কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, ষষ্ঠ তফসিলের অন্তর্ভুক্তি, অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন স্বশাসিত পরিষদ, না কি বর্তমান গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের পুনর্গঠন—কোন বিকল্পকে বোঝানো হচ্ছে, তা এখনও স্পষ্ট করা হয়নি।

কমিটির অন্য সদস্য কারা হবেন, কত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে হবে এবং আলোচনার নির্দিষ্ট শর্তাবলি কী—স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের প্রাথমিক ঘোষণায় তারও বিস্তারিত উল্লেখ নেই। ফলে পাহাড়ের রাজনৈতিক মহলে আশার পাশাপাশি সতর্কতাও রয়েছে। কমিটিটি কেবল সুপারিশ করবে, না কি চূড়ান্ত চুক্তি তৈরির ক্ষমতা পাবে, সেটিও পরবর্তী বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট হওয়ার অপেক্ষা।

পঙ্কজ কুমার সিংহকে ২০২৫ সালের অক্টোবরে এক বছরের জন্য কেন্দ্রের মধ্যস্থতাকারী নিযুক্ত করা হয়েছিল। তাঁর দায়িত্ব ছিল দার্জিলিং পাহাড়, তরাই ও ডুয়ার্সের গোর্খা সংগঠন এবং অন্যান্য অংশীদারের সঙ্গে আলোচনা করে সমস্যাগুলির সমাধানের পথ নির্দেশ করা। সেই নিয়োগের সরকারি কার্যপরিধিতেও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে ‘গঠনমূলক আলোচনা’র কথা বলা হয়েছিল। গত কয়েক মাসে তিনি পাহাড়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের প্রধান অনীত থাপাও প্রথমে আপত্তি জানালেও পরে তাঁর সঙ্গে বৈঠক করেন। নতুন কমিটি সেই আলাপ-আলোচনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও চুক্তিমুখী পর্যায়ে নিয়ে যাবে বলে কেন্দ্রের দাবি।

ঘোষণাটির ঐতিহাসিক তাৎপর্যও রয়েছে। ১৯৮৮ সালের ২২ অগস্ট কেন্দ্র, পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং সুবাস ঘিসিংয়ের নেতৃত্বাধীন গোর্খা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তার ভিত্তিতেই তৈরি হয় দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদ। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের পরে গঠিত সেই পরিষদ স্থায়ী শান্তি বা রাজনৈতিক নিষ্পত্তি দিতে পারেনি। পরে বিমল গুরুংয়ের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে গোর্খাল্যান্ড টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গঠিত হয়। কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তর, অর্থ, ভূখণ্ড এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত থাকে।

পাহাড়ের মানুষের একাংশের কাছে মূল প্রশ্ন কেবল স্থানীয় উন্নয়ন নয়; ভারতীয় গোর্খাদের স্বতন্ত্র জাতীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক নিরাপত্তাও এই দাবির কেন্দ্রে রয়েছে। অন্যদিকে তরাই ও ডুয়ার্সের ভূখণ্ড অন্তর্ভুক্তির প্রশ্ন অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ ওই অঞ্চলগুলিতে বহু ভাষা ও জনগোষ্ঠীর বাস। ফলে কোনও স্থায়ী বন্দোবস্তের আগে গোর্খা সংগঠনের পাশাপাশি আদিবাসী, রাজবংশী এবং সমতলের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতামতও নিতে হবে।

বিজেপি ২০০৯ সাল থেকে দার্জিলিং লোকসভা আসনে জয়ী হয়ে আসছে এবং বহু নির্বাচনী ইস্তাহারে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু সেই সমাধানের প্রকৃতি কখনও নির্দিষ্ট করেনি। তাই নতুন কমিটির সাফল্য নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের উপর—আলোচনার সময়সীমা, সব পক্ষের প্রতিনিধিত্ব এবং কেন্দ্রের প্রস্তাব কতটা স্পষ্ট তার উপর। অতীতের মতো আলোচনা ও কমিটির আবর্তে বিষয়টি আটকে গেলে পাহাড়ে হতাশা বাড়বে। আর নির্দিষ্ট সাংবিধানিক প্রস্তাব সামনে এলে, ১৯৮৮ ও ২০১১ সালের অসম্পূর্ণ বন্দোবস্ত পেরিয়ে গোর্খা রাজনীতিতে সত্যিই নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।