য়াশিংটনের সঙ্গে শেষ মুহূর্তে বাণিজ্য-আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর কানাডা থেকে আমদানি করা প্রায় ২ হাজার কোটি ডলারের পণ্যের উপর ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর করল আমেরিকা। শনিবার ভোর চারটে থেকে নতুন শুল্ক চালু হওয়ার পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ঘোষণা করেছেন, তাঁর দেশও আমেরিকাকে “ডলারের বদলে ডলার” জবাব দেবে। আপাতত নতুন করে আলোচনার কোনও পরিকল্পনা নেই।

হকি খেলার সরঞ্জাম থেকে চিকিৎসায় ব্যবহৃত জিভ পরীক্ষার কাঠি—বিস্তৃত পণ্যতালিকার উপর এই শুল্ক বসানো হয়েছে। বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে কানাডার কয়েকটি দুর্বল শিল্পে কর্মসংস্থান সঙ্কুচিত হতে পারে, বন্ধ হতে পারে ছোট ব্যবসা ও বিপণিও। তবে তাৎক্ষণিক আর্থিক ক্ষতির চেয়েও এই সংঘাতের রাজনৈতিক অভিঘাত অনেক গভীর হতে চলেছে। আমেরিকা ও কানাডার দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব এবং ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কেই বড় ফাটল ধরেছে।

শুক্রবার পর্যন্ত দু’পক্ষ ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও মোটরগাড়ির উপর শুল্ক কমানোর চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে আলোচনা ব্যর্থ হয়। তার দায় নিয়ে এখন পরস্পরকে দোষারোপ করছে ওয়াশিংটন ও অটোয়া।

কার্নির অভিযোগ, কানাডার প্রতিনিধিরা সদিচ্ছা নিয়ে আলোচনা করলেও আমেরিকা শেষ মুহূর্তে অন্যায্য এবং অর্থনৈতিক ভাবে অগ্রহণযোগ্য কয়েকটি নতুন শর্ত যোগ করেছিল। সেই শর্তগুলি মেনে নিলে কানাডায় তৈরি গাড়ির জন্য প্রস্তাবিত শুল্কছাড় কমে যেত, অন্য দেশের সঙ্গে স্বাধীন ভাবে বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষমতা সীমিত হত এবং কানাডার ভাষা, সংস্কৃতি ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার ব্যবস্থাও দুর্বল হয়ে পড়ত।

কার্নির কথায়, “তাঁরা খুব বেশি চেয়েছেন, অথচ দিয়েছেন খুব কম।” তাঁর আরও অভিযোগ, পারস্পরিক অর্থনৈতিক নির্ভরতাকেই এখন অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন। নতুন শুল্ককে তিনি কানাডার উপর একটি অর্থনৈতিক “আক্রমণ” বলে বর্ণনা করেছেন। আলোচনায় থাকা কানাডীয় প্রতিনিধিদের দেশে ফিরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

অন্য দিকে, আমেরিকার বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার দাবি করেছেন, কানাডাই শেষ মুহূর্তে নতুন সুবিধা দাবি করে পূর্বসম্মত শর্ত থেকে সরে গিয়েছে। আমেরিকা ইস্পাত, গাড়ি এবং কাঠের মতো কানাডার গুরুত্বপূর্ণ পণ্যে শুল্ক কমানোর প্রস্তাব দিয়েছিল। তাঁর দাবি, কোনও বড় রপ্তানিকারক দেশের তুলনায় কানাডাকে সবচেয়ে সুবিধাজনক ব্যবস্থা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু অটোয়া তা গ্রহণ করেনি।

গ্রিয়ারের বক্তব্য, গত এক বছর ধরে কানাডা যে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়েছে, তারই জবাব দিতে আমেরিকা বাধ্য হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য আমেরিকার শ্রমিক এবং সরবরাহ-শৃঙ্খলকে রক্ষা করা। তাঁর ভাষায়, চুক্তি না হওয়া কানাডার জন্য একটি “হারানো সুযোগ”।

নতুন শুল্ক কানাডা থেকে আমেরিকায় বার্ষিক রপ্তানির প্রায় ৫ শতাংশকে প্রভাবিত করবে। তালিকাটি অত্যন্ত বিস্তৃত। দুধ, ক্রিম, হুই, ল্যাকটোজ, গ্লুকোজ, বিভিন্ন ধরনের চিনি, আখের গুড়, মধু, নিরামিষ তেল ও মদবিহীন বিয়ারের পাশাপাশি রয়েছে বিয়ার, মদ, সিডার এবং অন্যান্য গাঁজনজাত পানীয়।

এ ছাড়া রয়েছে কাঠের সামগ্রী, বাঁশের পণ্য, তেলরোধী কাগজ, বরফ ও মাঠের হকির সরঞ্জাম, স্কেট, মাছ ধরার ছিপ, কুকুরের শিকল, আসবাবের প্লাস্টিক উপকরণ, পোশাক, পরচুলা, কৃত্রিম দাড়ি-ভ্রু, ঝাড়বাতি, উৎসবের সাজসজ্জা, ভাসমান জেটি এবং ছোট নৌযান। ফুলের কন্দ, অর্কিড, মাশরুমের বীজ, শৈবাল, গাছের বীজ, পালক, শিং ও অস্থিজাত কিছু সামগ্রীও তালিকায় আছে।

দুই দেশ গত বছর প্রায় ৮৮ হাজার কোটি ডলারের পণ্য ও পরিষেবা আদান-প্রদান করেছে। বিপুল সংখ্যক কানাডীয় আমেরিকায় এবং আমেরিকান নাগরিক কানাডায় কাজ করেন। ফলে এই বিরোধ শুধু সীমান্তের দু’পাশের দাম এবং কর্মসংস্থানকেই প্রভাবিত করবে না; আমেরিকা, কানাডা ও মেক্সিকোর ত্রিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলবে।

ট্রাম্পের কানাডাকে আমেরিকার “৫১তম অঙ্গরাজ্য” করার মন্তব্যে আগেই ক্ষুব্ধ হয়েছিল কানাডার জনমত। আমেরিকার রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রাকে বহিষ্কারের দাবিতে একটি আবেদনে প্রায় ২ লক্ষ ৪৮ হাজার মানুষ সই করেছেন। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নেওয়ার কারণেই দেশে কার্নির জনপ্রিয়তা বেড়েছে। তাঁর বক্তব্য, “আমেরিকা বদলে গিয়েছে”; দুই দেশের পুরনো সম্পর্কও আর আগের অবস্থায় ফিরবে না।

কানাডার পাল্টা ব্যবস্থাকে সমর্থন করেছেন অন্টারিয়োর মুখ্যমন্ত্রী ডাগ ফোর্ড। তিনি বলেছেন, শুল্কের জবাব শুল্কে এবং ডলারের জবাব ডলারে দিতে গোটা কানাডাকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কানাডীয় বণিকসভার প্রধান ক্যান্ডেস লেইং এই সংঘাতকে উত্তর আমেরিকার প্রতিযোগিতাশক্তির উপর “প্রবল আঘাত” বলেছেন। তাঁর সতর্কতা, নতুন শুল্ক শেষ পর্যন্ত আমেরিকান ক্রেতাদের খরচও বাড়াবে এবং কানাডার ছোট ব্যবসা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে বিপন্ন করবে।