খবর

‘১০০ কফিন’ থেকে সংস্কার—চিনের ঝাঁঝালো ঝু রংজি

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • চিনের অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান রূপকার এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি প্রয়াত।
  • বুধবার বেজিংয়ে ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে চিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া।
  • ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা ঝু রংজি শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্যই নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান এবং অকপট মন্তব্যের জন্যও চিনের…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

চিনের অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম প্রধান রূপকার এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ঝু রংজি প্রয়াত। বুধবার বেজিংয়ে ৯৭ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে চিনের সরকারি সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া। ১৯৯৮ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকা ঝু রংজি শুধু অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্যই নয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান এবং অকপট মন্তব্যের জন্যও চিনের রাজনীতিতে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরই ১৯৯৮ সালের মার্চে তাঁর একটি মন্তব্য কার্যত রাজনৈতিক কিংবদন্তিতে পরিণত হয়। ৬৯ বছর বয়সি ঝু বলেছিলেন, “আমি ১০০টি কফিন তৈরি রেখেছি—৯৯টি দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের জন্য, আর একটি আমার নিজের জন্য।” কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র ‘পিপলস ডেইলি’-তে প্রকাশিত সেই বক্তব্য পরবর্তী সময়ে তাঁর দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের প্রতীক হয়ে ওঠে।

ঝুর কাছে প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। কোনও সরকারি প্রকল্পে গাফিলতি বা অর্থনৈতিক ভুল হলে অন্যের ঘাড়ে দায় চাপানোর বদলে নিজের দায়িত্ব স্বীকার করার প্রবণতা ছিল তাঁর। সেই সময়ের চিনা রাজনীতিতে এমন প্রকাশ্য জবাবদিহির ভাষা ছিল বেশ ব্যতিক্রমী।

‘বস ঝু’ না ‘পাগল ঝু’?

কর্মকর্তাদের অদক্ষতা, অপচয় এবং দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ দেখাতেন ঝু। তাঁর কঠোর কর্মপদ্ধতি এবং আমলাতান্ত্রিক জড়তার প্রতি তীব্র অসহিষ্ণুতার কারণে সহকর্মীদের একাংশ তাঁকে ‘বস ঝু’ বা ‘পাগল ঝু’ বলে ডাকতেন।

তবে তাঁর কড়া ভাষা শুধু বক্তৃতাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সেনাবাহিনীকে বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড থেকে সরিয়ে দেওয়া, সরকারি কর্মীদের ব্যবসায়িক স্বার্থে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ কমানো এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের আর্থিক অনিয়মের বিরুদ্ধে তদন্ত—একাধিক কঠিন পদক্ষেপ নিয়েছিলেন তিনি।

ঝুর রাজনৈতিক জীবন অবশ্য বরাবর মসৃণ ছিল না। ১৯২৮ সালে হুনান প্রদেশের চাংশায় জন্ম তাঁর। সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ প্রকৌশল নিয়ে পড়াশোনার পর সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু মাও জে দংয়ের অর্থনৈতিক নীতির সমালোচনা করার অভিযোগে ১৯৫৮ সালে তাঁকে ‘দক্ষিণপন্থী’ হিসেবে চিহ্নিত করে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

দীর্ঘ রাজনৈতিক নির্বাসনের পর দেং শিয়াওপিংয়ের আমলে আবার ক্ষমতার কাঠামোয় ফিরে আসেন ঝু। ১৯৮৮ সালে সাংহাইয়ের মেয়র এবং ১৯৯১ সালে উপপ্রধানমন্ত্রী হন। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৮ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে বসেন তিনি।

চিনের অর্থনীতির খোলনলচে বদল

ঝু রংজির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার অবশ্য তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার। লোকসানে চলা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির পুনর্গঠন, করব্যবস্থায় কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো, আবাসন খাতে সংস্কার এবং পরিকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ—সব মিলিয়ে চিনের অর্থনীতিকে আরও বাজারমুখী করে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সেই সংস্কারের মূল্যও কম ছিল না। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির পুনর্গঠনের ফলে কয়েক কোটি শ্রমিক কাজ হারান। অর্থনৈতিক দক্ষতা বাড়লেও বেকারত্ব ও সামাজিক অস্থিরতা নিয়ে তৈরি হওয়া ক্ষোভ আজও ঝুর উত্তরাধিকারের বিতর্কিত অংশ।

তাঁর নেতৃত্বেই দীর্ঘ আলোচনার পর ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (WTO) যোগ দেয় চিন। এর পর বিশ্ববাজারে চিনের প্রবেশ আরও দ্রুত হয় এবং দেশটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও রফতানি শক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে গতি পায়।

এশীয় আর্থিক সঙ্কটের সময় চিনা মুদ্রা ইউয়ানের অবমূল্যায়ন না করার সিদ্ধান্তও আন্তর্জাতিক মহলে ঝুকে আলোচনার কেন্দ্রে এনেছিল।

কঠোর সংস্কারক, কিন্তু গণতন্ত্রের প্রবক্তা নন

ঝু রংজি গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রবক্তা ছিলেন না। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল অর্থনৈতিক দক্ষতা বৃদ্ধি করা এবং সেই অর্থনৈতিক শক্তির মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির শাসনকে আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করা।

তবু চিনের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর ব্যক্তিত্ব আলাদা। ভুল স্বীকার করার সাহস, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ভাষা এবং আমলাতন্ত্রের কাছে জবাবদিহির দাবি তাঁকে সমসাময়িক বহু নেতার থেকে পৃথক করেছিল।

‘১০০ কফিন’-এর সেই বিস্ফোরক মন্তব্য তাই শুধু একটি রাজনৈতিক উক্তি হয়ে থাকেনি। তা হয়ে উঠেছিল এমন এক নেতার প্রতীক, যিনি অর্থনীতি বদলাতে যেমন কঠোর ছিলেন, নিজের ব্যর্থতার দায় নিতেও তেমনই প্রস্তুত ছিলেন।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles