ট্রাম্পের পোস্টেও ‘পে-টু-নো’!

যা জানা জরুরি
- নিউ ইয়র্ক: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত ঘোষণার খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর আগেই টাকা দিয়ে দেখার সুযোগ—এ বার সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হলেন…
- অভিযোগ, নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাকে ব্যবহার করে সরকারি নীতির আগাম তথ্য বিক্রি করে ব্যক্তিগত মুনাফার রাস্তা তৈরি করছেন ট্রাম্প।
- বুধবার নিউ ইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে দায়ের হওয়া মামলায় ট্রাম্প, হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা ড্যানিয়েল স্ক্যাভিনো এবং ট্রাম্পের কার্যনির্বাহী সহকারী নাটালি জে হার্পকে বিবাদী…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নিউ ইয়র্ক: প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিগত ঘোষণার খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছনোর আগেই টাকা দিয়ে দেখার সুযোগ—এ বার সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই আদালতের দ্বারস্থ হলেন অধিকারকর্মীরা। অভিযোগ, নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন সোশ্যাল মিডিয়া সংস্থাকে ব্যবহার করে সরকারি নীতির আগাম তথ্য বিক্রি করে ব্যক্তিগত মুনাফার রাস্তা তৈরি করছেন ট্রাম্প।
বুধবার নিউ ইয়র্কের সাদার্ন ডিস্ট্রিক্ট আদালতে দায়ের হওয়া মামলায় ট্রাম্প, হোয়াইট হাউসের উপপ্রধান কর্মকর্তা ড্যানিয়েল স্ক্যাভিনো এবং ট্রাম্পের কার্যনির্বাহী সহকারী নাটালি জে হার্পকে বিবাদী করা হয়েছে। মামলাকারীদের দাবি, ট্রাম্পের মালিকানাধীন ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ (TMTG)-এর নতুন অর্থপ্রদত্ত পরিষেবা মার্কিন সংবিধানের একাধিক বিধান লঙ্ঘন করছে।
আগে খবর, পরে দুনিয়া!
চলতি মাসের গোড়ায় ট্রুথ সোশ্যাল চালু করেছে ‘ট্রুথ এপিআই’ নামে নতুন পরিষেবা। এর মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কয়েক মিলিসেকেন্ড আগে ট্রাম্পের পোস্ট দেখা যায়। যুদ্ধ, শুল্ক, অর্থনীতি বা অন্য কোনও সরকারি নীতি নিয়ে তাঁর পোস্ট বাজারে প্রভাব ফেলতে পারে—আর সেই তথ্য সবার আগে পেয়ে গেলে আর্থিক বাজারে স্বয়ংক্রিয় লেনদেনকারী সংস্থাগুলির বিপুল লাভের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এই ‘আগাম খবর’-এর সুবিধা অবশ্য সস্তা নয়। অভিযোগ, ওয়াল স্ট্রিটের সংস্থাগুলিকে এর জন্য মাসে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ডলার পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে।
মামলার অন্যতম বাদী ‘ফ্রিডম অব দ্য প্রেস ফাউন্ডেশন’-এর প্রধান প্রচার আধিকারিক সেথ স্টার্নের অভিযোগ, ট্রাম্প নিজের হাতে তৈরি করা সরকারি তথ্যের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার একটি বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে বিক্রি করছেন। তাঁর মতে, প্রেসিডেন্টের সরকারি ঘোষণা কোনও বিশেষ গ্রাহকের জন্য আগে পৌঁছনোর বদলে একই সময়ে সকলের কাছে পৌঁছনো উচিত।
‘ফ্রিডম অব দ্য প্রেস ফাউন্ডেশন’-এর পাশাপাশি সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্টারসেপ্ট-ও মামলাটির অন্যতম বাদী।
‘এ তো ব্যবসার নিয়ম’, পাল্টা TMTG
অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে ট্রাম্প মিডিয়া। সংস্থার বক্তব্য, আর্থিক বাজারে দ্রুত তথ্য সরবরাহের প্রযুক্তিগত পরিষেবা বিক্রি করা নতুন কিছু নয়। তাদের দাবি, ট্রাম্পকে চুপ করানোর জন্যই মামলার পথ বেছে নিয়েছেন বিরোধীরা।
TMTG-এর যুক্তি, ট্রাম্পের পোস্ট একই সঙ্গে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়ে। সেই তথ্য দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার প্রযুক্তিগত পরিষেবার জন্য অর্থ নেওয়াও শিল্পে প্রচলিত ব্যবস্থা।
লোকসানের মধ্যেই নতুন আয়ের রাস্তা?
ট্রাম্প মিডিয়ার জন্য সময়টাও বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। শেয়ারবাজারে নথিভুক্ত হওয়ার পর সংস্থাটির শেয়ার একসময় ৬২ ডলারে উঠেছিল। এখন তা ১০ ডলারের নীচে। একই সময়ে সংস্থাটি প্রতি ত্রৈমাসিকে বিপুল লোকসানের মুখে পড়ছে।
মামলাকারীদের অভিযোগ, এমন পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত প্রভাবকে ব্যবহার করে নতুন আয়ের রাস্তা তৈরি করা হচ্ছে।
তাঁদের দাবি, ট্রুথ এপিআই মার্কিন সংবিধানের প্রথম ও পঞ্চম সংশোধনী লঙ্ঘন করছে। প্রথম সংশোধনীর ক্ষেত্রে অভিযোগ, প্রেসিডেন্টের বক্তব্য এবং সরকারি তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের সমান সুযোগ খর্ব হচ্ছে। আর পঞ্চম সংশোধনীর ক্ষেত্রে অভিযোগ, সরকারি সুবিধার সঙ্গে অযৌক্তিক আর্থিক শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে।
আদালতের কাছে তাই ট্রাম্প মিডিয়াকে ট্রুথ এপিআই পরিষেবা বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়ার আবেদন করেছেন মামলাকারীরা।
ছ’ঘণ্টার একচেটিয়া অধিকারও কাঠগড়ায়
শুধু কয়েক মিলিসেকেন্ডের আগাম তথ্য নয়, ট্রাম্পের সঙ্গে করা আর একটি চুক্তিকেও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে মামলায়। সেই চুক্তি অনুযায়ী, ট্রাম্পের কোনও পোস্ট অন্যত্র প্রকাশের আগে ছ’ঘণ্টা শুধুমাত্র ট্রুথ সোশ্যালে থাকার কথা।
মামলাকারীদের অভিযোগ, এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সরকারি তথ্য নিজের ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে একচেটিয়াভাবে প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছেন। আদালতের কাছে তাঁদের দাবি, এই ব্যবস্থাও বন্ধ করা হোক।
কারণ, এই ব্যবসার সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যক্তিগত স্বার্থও সরাসরি জড়িত। একটি ট্রাস্টের মাধ্যমে ট্রাম্পের হাতে ট্রাম্প মিডিয়ার ৪০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার রয়েছে।
ট্রুথ সোশ্যাল থেকে ক্রিপ্টো—বিতর্কের তালিকা দীর্ঘ
ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ড নিয়ে অবশ্য এর আগেও নীতিশাস্ত্রের নজরদারি সংস্থাগুলি প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের অভিযোগ, প্রেসিডেন্টের পদ এবং সরকারি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক লাভের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ট্রাম্পের ক্রিপ্টো ব্যবসা নিয়েও একই ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। চলতি বছরের গোড়ায় প্রকাশিত বাধ্যতামূলক আর্থিক ঘোষণাপত্র অনুযায়ী, গত বছর তাঁর নতুন ক্রিপ্টো ব্যবসা থেকে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি আয় হয়েছিল। অথচ সেই ব্যবসার নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এছাড়াও ট্রাম্পের ডিজিটাল সম্পদ সংস্থা ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফিন্যান্সিয়াল সংযুক্ত আরব আমিরশাহির সরকারের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি সংস্থার কাছ থেকে ৫০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ পেয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তার সঙ্গে যোগ হয়েছে ট্রাম্পের নাম ও ছবি ব্যবহার করে বিক্রি হওয়া বিশেষ ‘মিম কয়েন’। সেখান থেকেও কয়েকশো কোটি ডলার তোলার অভিযোগ উঠেছে। মামলাকারীদের বক্তব্য, ক্রেতাদের মধ্যে ট্রাম্প-সমর্থকদের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের অনুগ্রহপ্রার্থী ব্যক্তিরাও ছিলেন।
ফলে প্রশ্নটা এখন শুধু ট্রাম্পের একটি সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট নিয়ে নয়—প্রেসিডেন্টের সরকারি ক্ষমতা আর ব্যক্তিগত ব্যবসার সীমারেখা ঠিক কোথায়, সেই পুরনো বিতর্কই নতুন করে আদালতের দরজায়।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



