দুপুরে জেল, বিকেলে মুক্তি, আদালতে রুদ্ধশ্বাস নাটক

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: নীট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে গত ২৪ জুলাই কলকাতায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির ডাকা বিক্ষোভে হিংসার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৬ জনকে মঙ্গলবার জামিন দিল কলকাতার একটি…
- প্রথমে তাঁদের দু’দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হলেও পরে শুনানির সময় অভিযুক্তদের আইনজীবীদের যুক্তি এবং সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ বিবেচনা করে আদালত সকলকেই মুক্তির নির্দেশ…
- মুক্তি পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে রয়েছেন ফল বিক্রেতা, মাছের দোকানের কর্মী, চটি প্রস্তুতকারক, বেকার স্নাতক, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং তৃণমূল স্তরের…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: নীট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে গত ২৪ জুলাই কলকাতায় বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলির ডাকা বিক্ষোভে হিংসার অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া ১৬ জনকে মঙ্গলবার জামিন দিল কলকাতার একটি আদালত। প্রথমে তাঁদের দু’দিনের বিচারবিভাগীয় হেফাজতে পাঠানো হলেও পরে শুনানির সময় অভিযুক্তদের আইনজীবীদের যুক্তি এবং সাম্প্রতিক সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণ বিবেচনা করে আদালত সকলকেই মুক্তির নির্দেশ দেয়।
মুক্তি পাওয়া ১৬ জনের মধ্যে রয়েছেন ফল বিক্রেতা, মাছের দোকানের কর্মী, চটি প্রস্তুতকারক, বেকার স্নাতক, বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি এবং তৃণমূল স্তরের রাজনৈতিক কর্মী। তাঁদের পরিবারের দাবি, অধিকাংশ বিক্ষোভে উপস্থিত থাকলেও কোনও হিংসাত্মক ঘটনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।
ধৃতদের অন্যতম ৪৭ বছরের খালিদ রেজা ওরফে রিঙ্কু উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো এলাকার বাসিন্দা। ছোট পরিসরে চটি তৈরি ও বিক্রির কাজ করেন তিনি। তাঁর শাশুড়ি বলেন, “সেদিন কয়েকজন পরিচিতের সঙ্গে বাজারে গিয়েছিল। তারপর আর বাড়ি ফেরেনি। পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। ও কী করেছে, আজও আমরা জানি না।”
মঙ্গলবার বিকেলে অভিযুক্তদের আদালতে তোলা হলে অভিযুক্তদের আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক নির্দেশের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, নীট প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে আন্দোলনে অংশ নেওয়া ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে, যদি তাঁদের কোনও অপরাধমূলক অতীত না থাকে, তবে জোর করে ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। আইনজীবীরা আরও জানান, বিহার ও অসম সরকারও একই ধরনের মামলায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপ প্রত্যাহারের পথে হেঁটেছে। সেই নজিরও আদালতের সামনে তুলে ধরা হয়।
শুনানির সময় ম্যাজিস্ট্রেট তদন্তকারী আধিকারিকের কাছে জানতে চান, ধৃতদের বিরুদ্ধে আগে কোনও অপরাধমূলক মামলা রয়েছে কি না। তদন্তকারী জানান, ১৬ জনের মধ্যে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অতীতে কিছু অভিযোগ রয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে অপর পক্ষের প্রশ্ন ছিল, অভিযোগ থাকা আর আদালতে দোষী সব্যস্ত হওয়া এক জিনিস নয়। ওই পাঁচজনের বিরুদ্ধে কোনও মামলায় আদালত দণ্ড দিয়েছে কি না, তার স্পষ্ট উত্তর তদন্তকারী দিতে পারেননি। এরপরই আদালত ১৬ জনেরই জামিন মঞ্জুর করে।
ধৃতদের মধ্যে ছিলেন বড়বাজার ফল বাজারের ফল ব্যবসায়ী এবং দীর্ঘদিনের কংগ্রেস কর্মী ৪৮ বছরের মহম্মদ আলমগীর। আদালতে উপস্থিত তাঁর স্ত্রী রুকসার বলেন, “আমাদের বড় মেয়ে বিক্ষোভে গিয়েছিল। কিন্তু আমার স্বামী বাড়িতেই ছিলেন। ছোট মেয়ের জন্মদিনের প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশ বাড়িতে এসে তাঁকেই তুলে নিয়ে যায়, শুধু মেয়ে আন্দোলনে গিয়েছিল বলে।”
অন্যদের মধ্যে রয়েছেন অ্যামহার্স্ট স্ট্রিটের ফল বিক্রেতা আরশাদ আলি ওরফে সাজিদ, কড়েয়া এলাকার মাছের দোকানের কর্মী শাহবাজ খান, বেকবাগানের বাসিন্দা চাকরিপ্রার্থী মহসিন খান এবং কয়েকজন কলেজপড়ুয়া যুবক।
শাহবাজের মা রুকসানা বেগম বলেন, “এখনকার ছেলেমেয়েরা সব কথা বাবা-মাকে বলে না। আমরা গরিব মানুষ। দিল্লির আন্দোলনের সাফল্য দেখে ছেলে ধর্মতলায় গিয়েছিল। কিন্তু ও কোনও ভাঙচুর বা হিংসায় জড়িত ছিল বলে আমি বিশ্বাস করি না।”
অভিযুক্তদের পক্ষে সওয়াল করা আইনজীবী সৈয়দ নাফিরুল ইসলাম আদালতে বলেন, তাঁর মক্কেলদের বিরুদ্ধে পাথর ছোড়া বা ভাঙচুরের সঙ্গে যুক্ত থাকার কোনও ভিডিও, ফরেনসিক বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ তদন্তকারীদের হাতে নেই।
পরে তিনি বলেন, “সেখানে শুধু ছাত্রছাত্রীই ছিলেন না। তাঁদের পরিবার, সাধারণ মানুষ, ফল বিক্রেতা, সমাজকর্মী—অনেকেই সংহতি জানাতে এসেছিলেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেই কাউকে হিংসায় অভিযুক্ত করা যায় না। নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া তাঁদের গ্রেফতার ও আটক রাখা আইনের চোখে টেকে না।”
অন্যদিকে, তদন্তকারীদের দাবি, অভিযুক্ত মহম্মদ আজাদ ও মহম্মদ আফরোজকে অন্ডালের কাছে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে আটক করা হয়েছিল, যখন তাঁরা পশ্চিমবঙ্গ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছিলেন।
পুলিশের দাবি, ২৮ বছরের আফরোজের তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। সামাজিক মাধ্যমে তাঁর সঙ্গে মেটিয়াবুরুজের তৃণমূল বিধায়ক আবদুল খালেক মোল্লার একাধিক ছবি রয়েছে। যদিও বিধায়ক মোল্লা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি জনপ্রতিনিধি। অনেকেই আমার সঙ্গে ছবি তোলেন। তাই বলে তিনি দলের সক্রিয় কর্মী, এমন দাবি ঠিক নয়।”
তদন্তকারীদের আরও দাবি, আফরোজ সামাজিক মাধ্যমে একটি জনপ্রিয় পাতা পরিচালনা করতেন, যেখানে ‘মাফিয়া গ্যাং’ নামে ধারাবাহিক ভিডিও প্রকাশ করে খেলনা বন্দুক হাতে নিজেকে স্থানীয় দাপুটে হিসেবে তুলে ধরতেন।
ধৃতদের আইনজীবী ফজলে আহমেদ খান বলেন, “সরকারপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেনি। তাঁদের যুক্তি এবং সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আদালত অভিযুক্তদের জামিন দিয়েছে।”
এদিকে, ধৃতদের কয়েকজনের পাশে দাঁড়িয়ে আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বলেন, কোনও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে শুধু ছাত্রছাত্রী নন, সাধারণ নাগরিকও সংহতি জানাতে পারেন। সেই কারণেই তাঁদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে দেখানো যায় না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



