লেটুসের পাতায় তৈরি হচ্ছে মায়োগ্লোবিন— মাংসের লাল রং, স্বাদ এবং হিম আয়রনের সঙ্গে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ এক প্রোটিন। শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও বিজ্ঞানীরা জিনপ্রযুক্তির সাহায্যে ঠিক সেটাই করে দেখিয়েছেন।
লেটুস ও তামাকগাছের পাতায় স্থায়ী ভাবে মায়োগ্লোবিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন গবেষকেরা। তাঁদের দাবি, কোনও খাদ্যযোগ্য ফসলে প্রাণীজ উৎসের এই ধরনের হিম-যুক্ত প্রোটিন স্থায়ী ভাবে উৎপাদনের ঘটনা এই প্রথম।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে Frontiers in Plant Science পত্রিকায়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, কেমব্রিজের জৈবপ্রযুক্তি সংস্থা কিয়োমেই লিমিটেড এবং আমেরিকা ও চিনের গবেষকেরা এই প্রকল্পে যুক্ত ছিলেন।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বাজারে এবার ‘মাংসের লেটুস’ চলে আসছে। আসল গল্পটা আরও মজার—গবেষকেরা গাছকে মাংস বানাননি, গাছকে মাংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরির কারখানা বানানোর চেষ্টা করেছেন।
মায়োগ্লোবিন এত গুরুত্বপূর্ণ কেন?
মায়োগ্লোবিন হল মেরুদণ্ডী প্রাণীর পেশিতে থাকা একটি ছোট প্রোটিন। পেশিতে অক্সিজেন ধরে রাখা এবং প্রয়োজনমতো তা সরবরাহ করা তার প্রধান কাজ।
কিন্তু খাবারের ক্ষেত্রে মায়োগ্লোবিনের গুরুত্ব অন্য জায়গায়।
মাংসের সেই পরিচিত লালচে রং তৈরিতে এর বড় ভূমিকা রয়েছে। মায়োগ্লোবিনের কেন্দ্রে থাকে হিম— লৌহযুক্ত একটি রাসায়নিক গঠন। এই হিমই অক্সিজেনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে এবং মাংসের রং ও রান্নার সময় তৈরি হওয়া নানা স্বাদ-গন্ধের রাসায়নিক পরিবর্তনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভাবে জড়িত।
আরও একটি কারণ রয়েছে।
প্রাণীজ খাদ্যের হিম আয়রন মানুষের শরীর সাধারণত উদ্ভিদজাত নন-হিম আয়রনের তুলনায় সহজে শোষণ করতে পারে। ফলে বিকল্প মাংস তৈরির গবেষণায় দীর্ঘদিন ধরেই মায়োগ্লোবিন ও হিম নিয়ে আগ্রহ রয়েছে।
বায়োরিঅ্যাক্টর নয়, গাছই কারখানা
এখন প্রশ্ন—মায়োগ্লোবিন তো প্রাণীর পেশিতে তৈরি হয়। গাছকে দিয়ে তা বানানো গেল কী ভাবে?
গবেষকদের কৌশলটি এখানেই।
তাঁরা মায়োগ্লোবিন তৈরির জিনটি উদ্ভিদের সাধারণ জিনোমে, অর্থাৎ নিউক্লিয়াসের ডিএনএ-তে ঢোকাননি। বরং সেটিকে বসিয়েছেন ক্লোরোপ্লাস্টে।
ক্লোরোপ্লাস্ট হল উদ্ভিদকোষের সেই অঙ্গাণু যেখানে সালোকসংশ্লেষ হয়। এর নিজস্ব ছোট জিনোমও রয়েছে।
এই বৈশিষ্ট্যের পেছনে রয়েছে বিবর্তনের দীর্ঘ ইতিহাস। বিজ্ঞানীদের মতে, ক্লোরোপ্লাস্টের পূর্বপুরুষ ছিল স্বাধীন ভাবে বেঁচে থাকা এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা বহু কোটি বছর আগে বৃহত্তর কোষের ভিতরে ঢুকে সহাবস্থানের মাধ্যমে ধীরে ধীরে ক্লোরোপ্লাস্টে পরিণত হয়।
আজও তার সেই প্রাচীন ব্যাকটেরীয় উত্তরাধিকার ক্লোরোপ্লাস্টের নিজস্ব ডিএনএ-তে রয়ে গিয়েছে।
জিনপ্রযুক্তির দিক থেকে সেটাই সুবিধা। একটি উদ্ভিদকোষে ক্লোরোপ্লাস্ট জিনোমের বহু প্রতিলিপি থাকতে পারে। ফলে সেখানে কোনও জিন ঢোকানো গেলে তুলনামূলক ভাবে বিপুল পরিমাণ প্রোটিন উৎপাদনের সম্ভাবনা থাকে।
আর শুধু তা-ই নয়।
হিম তৈরির বিপাকীয় প্রক্রিয়ার সঙ্গেও ক্লোরোপ্লাস্টের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ, মায়োগ্লোবিন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিম তৈরির ব্যবস্থার কাছাকাছিই নতুন জিনটিকে বসানো হয়েছে।
সহজ কথায়, কারখানার ভিতরেই কাঁচামাল তৈরির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
জিন ঢুকল ‘জিন-বন্দুক’-এ
পরিকল্পনা সহজ শোনালেও বাস্তবে কাজটি যথেষ্ট কঠিন। উদ্ভিদকোষের শক্ত কোষপ্রাচীর ভেদ করে ডিএনএ-কে ক্লোরোপ্লাস্টে পৌঁছে দিতে হয়েছে।
সেখানেই কাজে এসেছে ‘জিন গান’, বিজ্ঞানের ভাষায় biolistic delivery system।
প্রথমে মায়োগ্লোবিন তৈরির জিনের অসংখ্য কপি তৈরি করা হয়। সেই ডিএনএ বসানো হয় সোনার অতি ক্ষুদ্র কণার গায়ে। তারপর বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ওই কণাগুলি তামাক ও লেটুসের পাতার দিকে ছুড়ে দেওয়া হয়।
কিছু কণা কোষপ্রাচীর ভেদ করে কোষের ভিতরে ঢোকে এবং তাদের মধ্যে কিছু পৌঁছে যায় ক্লোরোপ্লাস্টে।
সেখানেই মায়োগ্লোবিন তৈরির নতুন জিন ক্লোরোপ্লাস্টের জিনোমে যুক্ত হয়।
অর্থাৎ, উদ্ভিদকোষের ভিতরে এবার একটি নতুন নির্দেশ পৌঁছে গেল—প্রাণীর পেশিতে তৈরি হওয়া মায়োগ্লোবিন বানাতে হবে।
একটি কোষ থেকে গোটা গাছ
কয়েকটি কোষ বদলে ফেললেই অবশ্য গবেষণা শেষ হয় না। সেই পরিবর্তিত কোষ থেকে সম্পূর্ণ গাছ তৈরি করতে হয়েছে।
এ জন্য গবেষকেরা ব্যবহার করেছেন টিস্যু কালচার। পরীক্ষাগারে পরিবর্তিত কোষগুলিকে ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করিয়ে সম্পূর্ণ গাছে পরিণত করা হয়।
আর এখানেই গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য।
পরিবর্তিত গাছগুলি শুধু বেড়েই ওঠেনি; ফুল ধরেছে, বীজ তৈরি করেছে এবং পরবর্তী প্রজন্মেও মায়োগ্লোবিন তৈরির বৈশিষ্ট্য বহন করেছে।
অর্থাৎ, এটি কোনও সাময়িক জিনগত পরিবর্তন নয়। বৈশিষ্ট্যটি স্থায়ী এবং বংশানুক্রমিক হয়েছে।
তামাক আগে, লেটুস পরে
মাংসের বিকল্প নিয়ে গবেষণায় তামাকগাছের নাম শুনে অবাক হওয়ার কারণ নেই।
তামাক মানুষের খাবার নয়। কিন্তু জিনপ্রযুক্তির গবেষণায় এটি অত্যন্ত পরিচিত ‘মডেল’ উদ্ভিদ। এর ক্লোরোপ্লাস্ট জিনোম সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের বিস্তর জ্ঞান রয়েছে এবং জিনগত পরিবর্তনের পদ্ধতিও বহু বছর ধরে পরীক্ষিত।
তাই প্রথমে তামাকের মাধ্যমে প্রযুক্তিটি কাজ করছে কি না পরীক্ষা করা হয়েছে।
খাওয়ার জন্য অবশ্যই নয়।
আসল লক্ষ্য ছিল লেটুস।
কারণ লেটুস সরাসরি মানুষের খাদ্য। তার পাতার মধ্যে স্থায়ী ভাবে মায়োগ্লোবিন তৈরি করানো গেলে ভবিষ্যৎ খাদ্যপ্রযুক্তিতে তার ব্যবহারিক সম্ভাবনা অনেক বেশি।
তামাক ২.৭%, লেটুস ১.৫%
গবেষকেরা দেখেছেন, তামাকের দ্রবণীয় মোট প্রোটিনের প্রায় ২.৭ শতাংশ পর্যন্ত মায়োগ্লোবিন পাওয়া গিয়েছে।
লেটুসে সেই হার ছিল প্রায় ১.৫ শতাংশ।
অর্থাৎ, খাদ্যযোগ্য লেটুসে উৎপাদন এখনও তামাকের তুলনায় কম।
আর এখানেই সামনে এসেছে গবেষণার সবচেয়ে বড় সমস্যা।
মায়োগ্লোবিন হল, হিম গেল কোথায়?
শুধু মায়োগ্লোবিন তৈরি করলেই হবে না। সেটির সঙ্গে হিম সঠিক ভাবে যুক্ত হতে হবে।
হিমকে মায়োগ্লোবিনের ‘কার্যকর অংশ’ ভাবা যায়। সেটি না থাকলে প্রোটিন তৈরি হলেও মাংসের রং ও স্বাদের সঙ্গে যুক্ত কাঙ্ক্ষিত কাজ পুরোপুরি হবে না।
গবেষকেরা দেখেছেন, তামাকপাতা থেকে পাওয়া মায়োগ্লোবিনের মাত্র প্রায় ৩৫ শতাংশে হিম সঠিক ভাবে যুক্ত ছিল।
অন্য দিকে, ব্যাকটেরিয়ার সাহায্যে একই মায়োগ্লোবিন তৈরি করলে প্রায় ৮০ শতাংশ প্রোটিনে হিম সঠিক ভাবে যুক্ত হয়।
অর্থাৎ, গাছ মায়োগ্লোবিন বানাতে পারছে ঠিকই, কিন্তু তাকে পুরোপুরি কার্যকর করে তুলতে এখনও পিছিয়ে।
গাছ হিম বাড়াল, তবু যথেষ্ট নয়
তবে উদ্ভিদ একেবারে হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি।
জিনগত ভাবে পরিবর্তিত তামাকগাছে মোট হিমের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছিল। অর্থাৎ, অতিরিক্ত হিমোপ্রোটিন তৈরির চাহিদা তৈরি হওয়ায় উদ্ভিদের নিজস্ব বিপাকীয় ব্যবস্থাও হিম উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
কিন্তু সেই বাড়তি উৎপাদন যথেষ্ট হয়নি।
কারণ হিম শুধু মায়োগ্লোবিনের জন্য নয়, উদ্ভিদের নিজস্ব গুরুত্বপূর্ণ জৈব রাসায়নিক কাজেরও অংশ।
ফলে গবেষকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ মায়োগ্লোবিন তৈরি করা নয়—পর্যাপ্ত হিম তৈরি করানো।
পরের লড়াই হিম নিয়ে
এই সমস্যা কাটানোর সম্ভাব্য দু’টি পথের কথা বলেছেন গবেষকেরা।
প্রথমত, জিনগত পরিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভিদের হিম তৈরির বিপাকীয় পথকে আরও শক্তিশালী করা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, এমন কিছু রাসায়নিক পূর্বসূরি দেওয়া যেতে পারে, যেগুলি ব্যবহার করে উদ্ভিদ বেশি পরিমাণে হিম তৈরি করতে পারে।
হিমের জোগান না বাড়ানো পর্যন্ত ‘পাতায় মাংসের প্রোটিন’ প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগানো কঠিন।
গরুর মাংসের থেকে এখনও দশ গুণ পিছনে
উৎপাদনের পরিমাণেও এখনও বড় ব্যবধান রয়েছে।
গবেষণায় জিনগত ভাবে পরিবর্তিত উদ্ভিদে প্রতি কিলোগ্রাম শুষ্ক ওজনে আনুমানিক ৮০০ মিলিগ্রাম মায়োগ্লোবিন পাওয়া গিয়েছে।
গরুর পেশিতে সেই পরিমাণ প্রায় ৮,১০০ থেকে ১১,২০০ মিলিগ্রাম প্রতি কিলোগ্রাম।
অর্থাৎ, সরাসরি ওজনের হিসাবে গাছ এখনও গরুর মাংসের তুলনায় প্রায় দশ গুণ পিছিয়ে।
তবে গবেষকদের যুক্তি, শুধু প্রতি কিলোগ্রামে উৎপাদন দেখলে পুরো ছবিটা ধরা পড়বে না। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হল—এক হেক্টর জমি থেকে শেষ পর্যন্ত কত মায়োগ্লোবিন পাওয়া সম্ভব?
গবাদি পশুর তুলনায় ফসল উৎপাদনে জমি ও জলের প্রয়োজন কম হতে পারে। পশুপালনের সঙ্গে যুক্ত গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণও এ ক্ষেত্রে এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
তাই উৎপাদন আরও বাড়ানো গেলে জমির হিসাবে উদ্ভিদ-উৎপাদিত মায়োগ্লোবিন ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠতে পারে।
তবে আপাতত সেটি সম্ভাবনা, প্রমাণিত ব্যবসায়িক মডেল নয়।
লক্ষ্য মাংসের স্বাদের লেটুস নয়
গবেষণার কথা শুনে সবচেয়ে সহজ ভুল ধারণা হতে পারে—এ বার হয়তো এমন লেটুস আসবে, যা কামড়ালে গরুর মাংসের স্বাদ দেবে।
না। অন্তত এখনই নয়।
বাস্তবসম্মত লক্ষ্য অনেক বেশি নির্দিষ্ট।
লেটুস বা অন্য কোনও ফসলকে মায়োগ্লোবিন তৈরির জীবন্ত কারখানা হিসেবে ব্যবহার করা, তারপর পাতা থেকে সেই প্রোটিন আলাদা ও পরিশোধিত করে বিকল্প মাংসের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা।
অর্থাৎ, লেটুসকে মাংস বানানো নয়; লেটুস দিয়ে মাংসের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বানানো।
বিকল্প মাংসে নতুন অস্ত্র
বিকল্প মাংস তৈরির প্রযুক্তি গত এক দশকে অনেক এগিয়েছে। সয়াবিন, মটরশুঁটি এবং অন্যান্য উদ্ভিদপ্রোটিন দিয়ে মাংসের মতো গঠন তৈরি করা এখন সম্ভব। চর্বির অনুভূতিও অনেকটাই নকল করা যায়।
কিন্তু একটি বড় সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে—মাংসের মতো রং, গন্ধ ও রান্নার সময় তৈরি হওয়া স্বাদ।
এখানেই মায়োগ্লোবিন ও হিম গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইম্পসিবল ফুডসের মতো সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই সয় লেগহিমোগ্লোবিন ব্যবহার করছে। এটি মায়োগ্লোবিন নয়, তবে হিম বহনকারী একটি সম্পর্কিত প্রোটিন। জিনগত ভাবে পরিবর্তিত অণুজীবকে শিল্প-ফারমেন্টেশনের মাধ্যমে ব্যবহার করে সেটি তৈরি করা হয়।
নতুন গবেষণার প্রশ্ন তাই বেশ সোজা—
বায়োরিঅ্যাক্টরের কাজ যদি কোনও দিন ফসলের মাঠ করতে পারে?
গাছ সূর্যালোক, জল, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং মাটির পুষ্টি ব্যবহার করে নিজেই বেড়ে ওঠে। সেই ব্যবস্থার মধ্যেই যদি প্রয়োজনীয় প্রোটিন তৈরি করা যায়, খাদ্যপ্রযুক্তিতে তার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
তবে মাঠে গাছ ফলালেই যে উৎপাদন সস্তা হবে, এমন নিশ্চয়তা এখনও নেই।
খরচের অঙ্ক এখনও মেলেনি
গবেষণার অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হল—এর পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এখনও হয়নি।
ফসল ফলানোই শেষ নয়। পাতা সংগ্রহ, পরিবহণ, প্রক্রিয়াকরণ, প্রোটিন নিষ্কাশন, বিশুদ্ধকরণ, সংরক্ষণ এবং খাদ্য-নিরাপত্তা যাচাই—সব কিছুর খরচ রয়েছে।
অন্য দিকে, শিল্প-ফারমেন্টেশন ব্যবস্থারও খরচ আছে। তবে সেই প্রযুক্তি বহু বছর ধরে উন্নত এবং নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে বিপুল পরিমাণ প্রোটিন উৎপাদনের জন্য ইতিমধ্যেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
তাই কোন পদ্ধতি সত্যিই সস্তা হবে, তা জানতে আরও অনেক গবেষণা দরকার।
মাংস নয়, ‘মাংসের উপাদান’
আর একটি সম্ভাবনা রয়েছে, যা বিকল্প মাংসের থেকেও সরাসরি মানুষের পুষ্টির সঙ্গে যুক্ত।
গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এমন লেটুস তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যার পাতায় বেশি পরিমাণে হিম আয়রন থাকবে।
এটি হলে লেটুস এক ধরনের বায়োফর্টিফায়েড খাদ্যে পরিণত হতে পারে—অর্থাৎ জিনপ্রযুক্তির মাধ্যমে কোনও ফসলের পুষ্টিগুণ বাড়ানো।
লৌহের ঘাটতি বিশ্বজুড়ে একটি বড় সমস্যা। তাই সহজে শোষণযোগ্য হিম আয়রনের উৎস হিসেবে এমন ফসলের সম্ভাবনা নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়।
কিন্তু এখানেও বিজ্ঞানকে একটু সময় দিতে হবে।
এই লেটুস মানুষের শরীরে বাস্তবে কতটা লৌহ সরবরাহ করবে, রান্না ও হজমের পর কতটা হিম অক্ষত থাকবে, শরীর কতটা শোষণ করবে—এসব এখনও পরীক্ষা করা হয়নি।
তাই ‘রক্তাল্পতার ওষুধ লেটুস’ বলার সময় এখনও আসেনি।
জিএম খাবার নিয়ে আসবে নতুন প্রশ্ন
এই প্রযুক্তির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল—এটি জিনগত পরিবর্তনের উপর নির্ভরশীল।
প্রাণীর মায়োগ্লোবিন তৈরির জিন ক্লোরোপ্লাস্ট জিনোমে ঢোকানো হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে এমন ফসল বাজারে আনতে হলে দেশভেদে জিএম খাদ্যের জন্য নির্ধারিত নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
খাদ্য-নিরাপত্তা, সম্ভাব্য অ্যালার্জি, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং পরিবেশে জিন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা—সবই খতিয়ে দেখতে হবে।
ক্লোরোপ্লাস্ট-ভিত্তিক জিনপ্রযুক্তির একটি সম্ভাব্য সুবিধা হল, বহু উদ্ভিদে ক্লোরোপ্লাস্ট মূলত মাতৃসূত্রে উত্তরাধিকারসূত্রে যায়। ফলে পরাগের মাধ্যমে জিন ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নিউক্লিয়ার জিনের তুলনায় কম হতে পারে।
তবে সব উদ্ভিদে একই নিয়ম প্রযোজ্য নয়। তাই নিয়ন্ত্রক পরীক্ষার প্রয়োজন থেকেই যায়।
এখনও অনেকটা পথ বাকি
এই গবেষণাকে আপাতত proof of concept হিসেবেই দেখা উচিত—অর্থাৎ ধারণাটি বাস্তবে কাজ করতে পারে, তার প্রাথমিক প্রমাণ।
এখন প্রয়োজন অন্য গবেষণাগারে ফলটি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা। একই সঙ্গে আরও বেশি মায়োগ্লোবিন উৎপাদন, হিমের সঙ্গে তার সংযোগ বাড়ানো, বিভিন্ন পরিবেশে গাছের বৃদ্ধি পরীক্ষা করা এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে বড় আকারে নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা যাচাই করতে হবে।
তার পর আসবে সবচেয়ে কঠিন তিনটি প্রশ্ন—
এটি নিরাপদ কি না।
এটি সস্তা কি না।
এবং মানুষ আদৌ এটি খেতে চাইবে কি না।
তাই বিজ্ঞানীরা লেটুসকে মাংস বানিয়ে ফেলেননি। বরং তাঁরা দেখিয়েছেন, একটি ভোজ্য উদ্ভিদের নিজস্ব কোষীয় যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে প্রাণীর মাংসের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রোটিন তৈরি করা সম্ভব।
আজকের দিনে সেটি একটি পরীক্ষাগার-সাফল্য। কিন্তু প্রযুক্তিটি যদি আরও উন্নত হয়, ভবিষ্যতের কৃষি শুধু চাল, গম, তেল বা উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
এক দিন হয়তো ফসলের মাঠই হয়ে উঠবে বিশেষ খাদ্যপ্রোটিনের জীবন্ত কারখানা।
আর সেই সম্ভাবনার ছোট্ট, অদ্ভুত সূচনা—এক টুকরো লেটুসপাতায় মাংসের প্রোটিন।