Home খবর সৌদিকে ইরানের খোঁচা: ‘কাগুজে চুক্তিতে নিরাপত্তা নয়’

সৌদিকে ইরানের খোঁচা: ‘কাগুজে চুক্তিতে নিরাপত্তা নয়’

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
12 views 4 minutes read
A+A-
Reset

সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতা ঘিরে সরাসরি রিয়াধকে নিশানা করল ইরান। তেহরানের এক প্রভাবশালী সাংসদের কটাক্ষ, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ‘কাগুজে চুক্তি’ করে সৌদি আরব নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না। বরং অন্য দেশের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের নীতিই বদলানো উচিত রিয়াধের।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও বিদেশনীতি কমিশনের সদস্য ইব্রাহিম রেজাই সমাজমাধ্যম এক্স-এ এই মন্তব্য করেছেন। তাঁর বক্তব্য, আমেরিকার সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্কও যদি সৌদি আরবকে নিরাপদ রাখতে না পারে, তা হলে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিও সেই নিশ্চয়তা দিতে পারবে না।

রেজাইয়ের মন্তব্য এমন এক সময়ে এল, যখন পশ্চিম এশিয়ায় নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হচ্ছে এবং সৌদি আরব নিজের সামরিক অংশীদারিত্বকে নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে।

‘নিরাপত্তার জন্য ভিক্ষা নয়’

রেজাই তাঁর পোস্টে সৌদি আরবকে উদ্দেশ করে বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে করা কোনও ‘কাগুজে চুক্তি’ই দেশটির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারবে না। তাঁর দাবি, বছরের পর বছর আমেরিকাকে একতরফা সুবিধা দিয়েও সৌদি আরব কাঙ্ক্ষিত নিরাপত্তা পায়নি।

তাই রিয়াধকে নিজের নীতি বদলানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

সৌদি আরব যেন নিরাপত্তার জন্য অন্য দেশের কাছে ‘ভিক্ষা’ না চায়—এমনই কড়া বার্তা দিয়েছেন এই ইরানি সাংসদ। তাঁর পোস্টে ‘বেগ ফর সিকিউরিটি’ হ্যাশট্যাগও ছিল।

রেজাইয়ের মন্তব্য অবশ্য ইরান সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান কি না, তা স্পষ্ট নয়। তবে তেহরানের এক গুরুত্বপূর্ণ সাংসদের এই প্রকাশ্য আক্রমণ থেকে সৌদি-পাকিস্তান-তুরস্কের নতুন সমীকরণ নিয়ে ইরানের অস্বস্তির ইঙ্গিত মিলছে।

মক্কায় তিন দেশের প্রতিরক্ষা জোট

সৌদি আরবের মক্কায় স্বাক্ষরিত হয়েছে তিন দেশের নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি। সৌদি যুবরাজ মহম্মদ বিন সলমন, তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ চুক্তিতে সই করেন।

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল—তিন দেশের কোনও একটির উপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে বাকি দুই দেশের বিরুদ্ধেও হামলা হিসেবে গণ্য করা হবে।

অর্থাৎ, একটি দেশের নিরাপত্তা সঙ্কটকে তিন দেশের সম্মিলিত নিরাপত্তার বিষয় হিসেবে দেখার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

এর পাশাপাশি যৌথ সামরিক মহড়া, সেনা প্রশিক্ষণ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।

এই ব্যবস্থার ফলে সৌদি আরব ও পাকিস্তানের পুরনো প্রতিরক্ষা সম্পর্ক যেমন আরও গভীর হতে পারে, তেমনই তুরস্কের সঙ্গে রিয়াধের সামরিক সহযোগিতাও নতুন মাত্রা পেতে পারে।

কেন এখন এই জোট?

চুক্তির সময়টিও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।

ইরানকে ঘিরে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে সংঘাত, গাজায় চলা যুদ্ধ এবং পশ্চিম এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্তে নিরাপত্তা সঙ্কটের মধ্যে সৌদি আরব নিজের প্রতিরক্ষা কাঠামোকে আরও বহুমুখী করতে চাইছে।

রিয়াধ দীর্ঘদিন ধরেই আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা অংশীদার। কিন্তু অতীতের কয়েকটি হামলা সৌদি নেতৃত্বকে বুঝিয়েছে, শুধু মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার উপর নির্ভর করে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোয় হামলার ঘটনাগুলি সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

ফলে ওয়াশিংটনের পাশাপাশি আঙ্কারা ও ইসলামাবাদের সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক শক্তিশালী করার চেষ্টা রিয়াধের বৃহত্তর কৌশলের অংশ বলেই মনে করা হচ্ছে।

ইরানের আপত্তি কোথায়?

তেহরানের দৃষ্টিতে বিষয়টি শুধু সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা নয়।

তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। পাকিস্তান দীর্ঘদিনের সামরিক শক্তি এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী রাষ্ট্র। এই দুই দেশের সঙ্গে সৌদি আরবের এমন একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা কাঠামো তৈরি হলে পশ্চিম এশিয়ায় রিয়াধের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

আর সেই পরিবর্তন ইরানের আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশেষ করে তিন দেশের চুক্তিতে ‘এক দেশের উপর হামলা মানে তিন দেশের উপর হামলা’—এই নীতি থাকায় ভবিষ্যতে কোনও আঞ্চলিক সংঘাতের ক্ষেত্রে চুক্তিটির বাস্তব প্রয়োগ কতটা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

নজরে রাখছে ভারতও

নতুন সমীকরণের দিকে নজর রাখছে নয়াদিল্লিও।

শুক্রবার বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, ভারত গোটা ঘটনাপ্রবাহ ‘ঘনিষ্ঠ ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে’। প্রয়োজন অনুযায়ী পরবর্তী তথ্য জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এর আগে ২০২৫ সালে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি হওয়ার সময়ও ভারত জানিয়েছিল, ওই সমঝোতার সম্ভাব্য প্রভাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

নতুন ত্রিপাক্ষিক চুক্তির ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার পাশাপাশি তুরস্কও এই নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে গেল।

ভারতের জন্যও তাই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ—বিশেষ করে পাকিস্তানের সঙ্গে সৌদি আরবের ঘনিষ্ঠতা এবং তুরস্কের সঙ্গে ইসলামাবাদের কৌশলগত সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে।

এক চুক্তি, একাধিক বার্তা

সৌদি আরবের কাছে এই চুক্তি নিরাপত্তার পরিধি বাড়ানোর একটি কৌশল। পাকিস্তানের কাছে এটি সৌদির সঙ্গে পুরনো প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক করার সুযোগ। তুরস্কের কাছে এটি পশ্চিম এশিয়া ও মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা সমীকরণে নিজের ভূমিকা বাড়ানোর একটি নতুন দরজা।

আর ইরানের কাছে?

তেহরানের প্রথম বার্তাই বেশ স্পষ্ট—কাগজে প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না।

তবে এই চুক্তি শুধু কাগজে থাকে, নাকি পশ্চিম এশিয়ার বদলে যাওয়া শক্তির ভারসাম্যে সত্যিই নতুন কোনও সামরিক অক্ষ তৈরি করে—তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের আঞ্চলিক রাজনীতিতেই।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles