Home খবর মনিন্দর সিংহের নিরাপত্তায় কানাডাকে রাষ্ট্রপুঞ্জের কড়া বার্তা

মনিন্দর সিংহের নিরাপত্তায় কানাডাকে রাষ্ট্রপুঞ্জের কড়া বার্তা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
23 views 3 minutes read
A+A-
Reset

শিখ কর্মী মনিন্দর সিংহ ও তাঁর পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কানাডা সরকারকে সব ধরনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার বিষয়ক পাঁচ স্বাধীন বিশেষজ্ঞ। মনিন্দর সিংহের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য প্রাণনাশের হুমকি এবং বিদেশি রাষ্ট্রের কথিত ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন তাঁরা।

কানাডা সরকারকে পাঠানো এক চিঠিতে বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, ২০২২ সাল থেকে দেশটির আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলি মনিন্দর সিংহকে চার বার ‘ডিউটি টু ওয়ার্ন’ নোটিস দিয়েছে। সাধারণত কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য ও আসন্ন প্রাণনাশের আশঙ্কা থাকলেই এই ধরনের সতর্কবার্তা জারি করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের আবেদন, মনিন্দর, তাঁর পরিবার এবং একই ধরনের ঝুঁকিতে থাকা অন্য ব্যক্তিদের সুরক্ষায় কানাডা যেন সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেয়। পাশাপাশি হুমকির ঘটনাগুলির দ্রুত তদন্ত, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতিকার এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছে।

দু’মাস পর প্রকাশ্যে চিঠি

৩ জুন লেখা চিঠিটি প্রায় দু’মাস পর প্রকাশ্যে আসে। এতে স্বাক্ষর করেছেন সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় মানবাধিকার সুরক্ষা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা রাষ্ট্রপুঞ্জের পাঁচ বিশেষ প্রতিবেদক ও স্বাধীন বিশেষজ্ঞ।

তাঁরা রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার পরিষদের নিযুক্ত স্বাধীন বিশেষজ্ঞ। তাই তাঁদের মতামত রাষ্ট্রপুঞ্জের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হয় না।

চিঠিটির একটি অনুলিপি ভারত সরকারকেও পাঠানো হয়েছে।

জেনেভায় মনিন্দরের অভিযোগ

চলতি বছরের গোড়ায় জেনেভায় রাষ্ট্রপুঞ্জের দপ্তরে গিয়ে মনিন্দর সিংহ বিদেশে বসবাসকারী শিখ কর্মীদের বিরুদ্ধে ভারতের কথিত পদক্ষেপ এবং সীমান্ত পেরিয়ে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগ তুলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের আবেদন করেছিলেন।

খালিস্তানপন্থী শিখ সংগঠনগুলির দাবি, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী শিখ কর্মীদের নিশানা করছে ভারত এবং সংগঠিত অপরাধচক্রের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডও ঘটানো হয়েছে।

ভারত অবশ্য এই অভিযোগ বারবার অস্বীকার করেছে।

এই বিতর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ২০২৩ সালের জুনে কানাডার ব্রিটিশ কলম্বিয়ার সারের একটি গুরুদ্বারের বাইরে শিখ নেতা হরদীপ সিংহ নিজ্জরের হত্যাকাণ্ড। মনিন্দর সিংহ ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী।

তৎকালীন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো প্রকাশ্যে ওই হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় এজেন্টদের সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছিলেন। পরে কানাডার গোয়েন্দা সংস্থাও একই ধরনের অভিযোগ করে। ভারত তা প্রত্যাখ্যান করে।

এর জেরে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। ২০২৪ সালে দুই দেশই একাধিক কূটনীতিককে বহিষ্কার করে।

সম্পর্কে বরফ গললেও প্রশ্ন রয়ে গেছে

পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি ক্ষমতায় আসার পর ভারত-কানাডা সম্পর্কে কিছুটা উষ্ণতা ফেরে। গত মার্চে ভারত সফরে এসে তিনি একাধিক বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষর করেন। একই সময়ে কানাডার কর্তৃপক্ষ আগের নিরাপত্তা মূল্যায়নের গুরুত্বও কিছুটা কমিয়ে দেখায়।

তবে মনিন্দর সিংহকে ঘিরে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের নতুন উদ্বেগে সেই পুরনো নিরাপত্তা প্রশ্নই আবার সামনে এসেছে।

৪৪ বছর বয়সি মনিন্দর সিংহ খালিস্তান নামে স্বাধীন শিখ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবির সঙ্গে যুক্ত একটি সংগঠনের সক্রিয় কর্মী। ভারতের স্বাধীনতার পর থেকেই খালিস্তান আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড এবং এয়ার ইন্ডিয়ার একটি যাত্রীবাহী বিমানে বোমা হামলার মতো ঘটনাতেও খালিস্তানপন্থীদের নাম উঠে এসেছে।

ফলে ভারত এবং পশ্চিমের কয়েকটি দেশে বসবাসকারী শিখ প্রবাসীদের ঘিরে এই ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর।

‘সীমান্ত পেরিয়ে দমন-পীড়ন?’

রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, মনিন্দর সিংহের বিরুদ্ধে হুমকির ঘটনাগুলি বিদেশে থাকা শিখ কর্মীদের বিরুদ্ধে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কথিত সীমান্ত-পেরোনো দমন-পীড়নের বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হতে পারে।

এই অভিযোগের বিষয়ে ভারতীয় সরকারের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের চিঠিতে উত্থাপিত উদ্বেগ মূলত অভিযোগ ও নিরাপত্তা মূল্যায়নের ভিত্তিতে তৈরি; এগুলিকে আদালতে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

মনিন্দর সিংহ অবশ্য নিজের অবস্থান স্পষ্ট রেখেছেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের চিঠি দেখিয়ে দেয়, শিখদের আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিকে স্তব্ধ করতে ভারত কত দূর যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

তাঁর কথায়, “আমি ভয় পেয়ে চুপ করে থাকব না।”

খালিস্তানের পক্ষে তাঁর অবস্থান আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং তাঁর সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি বলেও দাবি করেছেন তিনি।

তবে এই বিতর্কের কেন্দ্রে এখন আরও বড় একটি প্রশ্ন—বিদেশের মাটিতে ভিন্নমতাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় কোথায় শেষ হয়, আর রাষ্ট্রের সীমান্ত-পেরোনো দায়বদ্ধতা কোথা থেকে শুরু হয়?

মনিন্দর সিংহকে ঘিরে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষজ্ঞদের হস্তক্ষেপ সেই প্রশ্নটিকেই ফের আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এল।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles