ইজরায়েলের আসন্ন সংসদীয় নির্বাচনের আগে প্রধান আরব দলগুলিকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ২৩ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি রা’আম এবং জয়েন্ট লিস্টের প্রার্থিতালিকা বাতিলের পক্ষে ভোট দেয়। আগামী ২৭ অক্টোবর নেসেটের নির্বাচন। সিদ্ধান্তের সমর্থকেরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সাংবিধানিক পরিচয় রক্ষার কথা বলছেন। আরব দলগুলির অভিযোগ, বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরোধী সরকার গঠনের সম্ভাবনা ঠেকাতেই এই পদক্ষেপ। তবে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা এবং কোনও দলকে স্থায়ীভাবে বেআইনি ঘোষণা এক বিষয় নয়।

রা’আমের নেতৃত্বে রয়েছেন মনসুর আব্বাস। জয়েন্ট লিস্ট হল হাদাশ, তা’আল ও বালাদের নির্বাচনী জোট। দুই তালিকাই ১৮–৫ ভোটে বাতিল হয়েছে। পৃথকভাবে হাদাশের ইহুদি সাংসদ ওফের কাসিফ এবং বালাদ নেতা সামি আবু শেহাদেহকেও অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্তের অভিঘাত প্রধানত আরব প্রতিনিধিত্বের উপর পড়লেও তার আওতায় একজন ইহুদি রাজনীতিকও রয়েছেন। দলগুলির আইনজীবীরা সুপ্রিম কোর্টে সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছেন।

এই সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি নেসেট সংক্রান্ত মৌলিক আইনের ৭এ ধারা। এতে তিনটি কারণে দলীয় প্রার্থিতালিকা বা ব্যক্তিকে নির্বাচনে বাধা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে: ইজরায়েলের ইহুদি ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব অস্বীকার, বর্ণবিদ্বেষে প্ররোচনা, অথবা ইজরায়েলের বিরুদ্ধে শত্রুরাষ্ট্র বা সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের সশস্ত্র সংগ্রামকে সমর্থন। বিধানটির যুক্তি হল, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যবহার করেই গণতন্ত্র ধ্বংস করতে চাওয়া শক্তির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র আত্মরক্ষা করতে পারে। কিন্তু এই ক্ষমতার প্রয়োগে রাজনৈতিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কাও থাকে।

রা’আমের বিরুদ্ধে লিকুদ, ওৎজমা ইয়েহুদিত এবং সন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের একটি সংগঠন আবেদন করেছিল। অভিযোগে দলটির সঙ্গে ইসলামিক মুভমেন্টের দক্ষিণ শাখা ও কয়েকটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়; আবেদনকারীদের দাবি, ওই প্রতিষ্ঠানগুলি হামাসের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাকে সাহায্য দিয়েছে। জয়েন্ট লিস্টের বিরুদ্ধে লিকুদের আবেদনে বালাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি, বিভিন্ন বক্তব্য এবং কাসিফ সংক্রান্ত উপাদানকে ভিত্তি করা হয়। এগুলি আবেদনকারীদের অভিযোগ, আদালতে প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত নয়।

অ্যাটর্নি জেনারেলের দপ্তর দুই প্রার্থিতালিকা বাতিলের বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তিশালী প্রমাণ নেই। সংশ্লিষ্ট দাতব্য সংস্থার কাজের দায় রা’আমের উপর চাপানোর যথেষ্ট ভিত্তিও পাওয়া যায়নি। দলটির আইনজীবী মনে করিয়ে দিয়েছেন, আব্বাস ৭ অক্টোবরের হত্যাকাণ্ডের নিন্দা করেছেন এবং গাজায় আটক পণবন্দিদের মুক্তি চেয়েছেন। জয়েন্ট লিস্টের ক্ষেত্রে পুরনো কর্মসূচি ও আগে বিচার করা উপাদান নতুন করে ব্যবহারের প্রশ্ন উঠেছে।

বিতর্ক বোঝার জন্য নির্বাচন কমিটির গঠনও জরুরি। সুপ্রিম কোর্টের একজন বিচারপতি সভাপতিত্ব করলেও সিদ্ধান্তগ্রহণকারী কমিটিতে বিদায়ী সংসদের শক্তির অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিনিধি থাকেন। ইজরায়েল ডেমোক্র্যাসি ইনস্টিটিউটের হিসাবে, বর্তমান কমিটির ৩১ সদস্যের মধ্যে ১৮ জন শাসকজোটের প্রতিনিধি। অর্থাৎ প্রতিদ্বন্দ্বীকে নির্বাচনে থাকতে দেওয়া হবে কি না, সেই সিদ্ধান্তে ক্ষমতাসীনদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বিশ্লেষণে, এই ব্যবস্থায় আইনি বিচার ও নির্বাচনী স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি প্রবল।

রাজনৈতিক গুরুত্বের কেন্দ্রে রয়েছে সরকার গঠনের অঙ্ক। ইজরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আরব। ১২০ আসনের নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ৬১ আসন। প্রধান দুই শিবিরের কেউ সেই সীমা অতিক্রম করতে না পারলে কয়েকটি আরব আসন নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। ২০২০ সালের মার্চে চার দলের ঐক্যবদ্ধ জয়েন্ট লিস্ট ১৫টি আসন পেয়েছিল। অতএব আরব প্রতিনিধিত্বের পরিমাণ শুধু একটি সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংসদীয় উপস্থিতি নয়; জাতীয় ক্ষমতার ভারসাম্যও বদলাতে পারে।

এর নজিরও রয়েছে। ২০২১ সালে আব্বাসের রা’আম নেতানিয়াহুকে সরিয়ে গঠিত জোট সরকারের শরিক হয়েছিল। আরব নাগরিকদের জন্য অর্থবরাদ্দ ও পরিষেবা আদায়ের লক্ষ্যে সরকারে অংশগ্রহণের পথ নিয়েছিল দলটি। এবার আব্বাসের অভিযোগ, তাঁকে নির্বাচনের বাইরে রেখে আর একটি বিকল্প সরকার তৈরির পথ বন্ধ করতে চাইছেন নেতানিয়াহু ও তাঁর সহযোগীরা। এই অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের একটি ব্যাখ্যা; নির্বাচন কমিটির ঘোষিত আইনি যুক্তির সঙ্গে তাকে আলাদা করে বিচার করতে হবে।

অন্যদিকে, একই প্রক্রিয়ায় অতি দক্ষিণপন্থী নেতা ইতামার বেন গভিরের ওৎজমা ইয়েহুদিত এবং বেজালেল স্মোট্রিচের রিলিজিয়াস জায়নিজম দলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার আবেদন খারিজ হয়েছে। বেন গভিরের দলের বিরুদ্ধে আবেদনে বর্ণবিদ্বেষ ও আরব নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার অস্বীকারের অভিযোগ ছিল। এই বৈপরীত্য সিদ্ধান্তের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বাড়িয়েছে। আরব দলগুলির প্রতিনিধিত্বকারী অধিকার সংগঠন আদালাহ গোটা প্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক মত দমনের উদ্যোগ বলে সমালোচনা করেছে।

এখানে আরব নাগরিকদের ভোটাধিকার বাতিল করা হয়নি। কিন্তু তাঁদের প্রধান রাজনৈতিক বিকল্পগুলি ব্যালট থেকে বাদ পড়লে পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দেওয়ার সুযোগ ক্ষুণ্ণ হবে। রাজনৈতিক প্রভাবের বিচারে, এমন পদক্ষেপ ভোটদানে অনীহা এবং সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি অবিশ্বাস বাড়াতে পারে। আবার প্রতিবাদে ভোটারদের সংগঠিত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কোন প্রতিক্রিয়া প্রাধান্য পাবে, তা এখনই নিশ্চিত বলা যায় না; আদালতের সিদ্ধান্তও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ।

আরব দলকে নির্বাচনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা নতুন নয়। অতীতে বালাদ ও একাধিক আরব প্রার্থীর বিরুদ্ধে কমিটির সিদ্ধান্ত সুপ্রিম কোর্ট বাতিল করেছে। আদালতের ধারাবাহিক অবস্থান, সংশ্লিষ্ট আইনের প্রয়োগ হতে হবে সংকীর্ণ এবং ব্যতিক্রমী। কোনও বিচ্ছিন্ন মন্তব্য যথেষ্ট নয়; নিষিদ্ধ উদ্দেশ্য সংশ্লিষ্ট দল বা প্রার্থীর কর্মকাণ্ডের প্রধান বৈশিষ্ট্য—এমন সুস্পষ্ট ও পর্যাপ্ত প্রমাণ প্রয়োজন। এই মানদণ্ডই এবারও বিচারিক পর্যালোচনার কেন্দ্রে থাকবে।

সুতরাং আইনি লড়াই এখনও বাকি। ব্যক্তিগত প্রার্থিতা বাতিলে সুপ্রিম কোর্টের অনুমোদন বাধ্যতামূলক; গোটা প্রার্থিতালিকা বাতিলের বিরুদ্ধে আদালতে আপিল করতে হয়। আদালত আগেও নিষেধাজ্ঞা সরিয়েছে বলে এবারও সরাবেই, এমন নিশ্চয়তা নেই। তবে বৃহত্তর প্রশ্নটি স্পষ্ট: রাষ্ট্ররক্ষার বিধান প্রয়োগ করতে গিয়ে সংখ্যালঘু নাগরিকদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার সুযোগ কতটা সংকুচিত করা যায়? সেই সীমার বিচারেই নির্বাচনের প্রতিযোগিতা এবং গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা, দুইয়ের ভবিষ্যৎ জড়িয়ে রয়েছে।