- সচিন পাইলটের রাজনৈতিক উত্থানে নিজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরলেন অশোক গেহলট।
- গেহলটের আক্ষেপ, পাইলট কখনও প্রকাশ্যে সেই অবদানের স্বীকৃতি দেননি।
- ২০২২ সালের ‘মানেসর পর্ব’ নিয়ে ফের মুখ খুলে কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের প্রসঙ্গ টানলেন তিনি।
- পাইলটের প্রতি ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই বলেই দাবি গেহলটের।
- আসন্ন নির্বাচনের আগে কংগ্রেসে ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করলেন প্রবীণ নেতা।
বাংলাস্ফিয়ার: রাজস্থানের রাজনীতিতে অশোক গেহলট এবং সচিন পাইলটের সম্পর্ক গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে কংগ্রেসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। কখনও সহযোগিতা, কখনও তীব্র সংঘাত—এই দুই নেতার সম্পর্ক বারবার শিরোনামে এসেছে। এবার সেই সম্পর্ক নিয়েই দীর্ঘ নীরবতা ভাঙলেন রাজস্থানের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অশোক গেহলট।
এক সাক্ষাৎকারে গেহলট দাবি করেছেন, সচিন পাইলটের রাজনৈতিক উত্থানের পেছনে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। শুধু তাই নয়, পাইলটকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও তিনি সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আক্ষেপ, পাইলট কখনও প্রকাশ্যে সেই সহযোগিতার কথা স্বীকার করেননি।
গেহলট বলেন, “আমি তাঁর উন্নতির জন্য যা করেছি, তার কোনও স্বীকৃতি আমি কখনও পাইনি। এটা আমাকে কষ্ট দিয়েছে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি এমন এক বিতর্ককে আবার সামনে নিয়ে এলেন, যা বহুদিন ধরেই রাজস্থান কংগ্রেসের অভ্যন্তরে চাপা আগুনের মতো জ্বলছিল। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গেহলটের এই বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের প্রকাশ নয়; এটি কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়ের ইতিহাসও তুলে ধরে।
সচিন পাইলট দীর্ঘদিন ধরেই কংগ্রেসের তরুণ মুখ হিসেবে পরিচিত। প্রয়াত কংগ্রেস নেতা রাজেশ পাইলটের ছেলে হিসেবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের জাতীয় নেতৃত্বের আস্থা অর্জন করেন। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী হন, পরে রাজস্থান প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি হন এবং রাজ্যের অন্যতম জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
কিন্তু সেই উত্থানই ধীরে ধীরে সংঘাতের কারণ হয়ে ওঠে।
২০১৮ সালে কংগ্রেস রাজস্থানে ক্ষমতায় ফেরার পর মুখ্যমন্ত্রী পদ নিয়ে গেহলট ও পাইলটের মধ্যে সূক্ষ্ম প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অভিজ্ঞতার উপর ভরসা রেখে গেহলটকে মুখ্যমন্ত্রী এবং পাইলটকে উপমুখ্যমন্ত্রী করে।
সেখান থেকেই দ্বন্দ্বের বীজ আরও গভীরে প্রোথিত হয়।
২০২০ সালে পরিস্থিতি বিস্ফোরক রূপ নেয়, যখন পাইলট এবং তাঁর অনুগত বিধায়কদের একটি অংশ গেহলট সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পথে হাঁটেন। যদিও শেষ পর্যন্ত সরকার টিকে যায়, কিন্তু দুই শিবিরের সম্পর্ক আর কখনও স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরেনি।
তারপর আসে ২০২২ সালের বহুচর্চিত ‘মানেসর পর্ব’।
সেই সময় কংগ্রেস নেতৃত্ব গেহলটকে সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি করার কথা ভাবছিল। পরিকল্পনা ছিল, তিনি দিল্লিতে গেলে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে সচিন পাইলটকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। কিন্তু গেহলট-ঘনিষ্ঠ বিধায়কদের বিদ্রোহের ফলে সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায়।
এই ঘটনাকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। অনেকেই একে কংগ্রেস হাইকমান্ডের বিরুদ্ধে পরোক্ষ বিদ্রোহ বলে অভিহিত করেছিলেন। তবে গেহলট এখনও সেই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি ছিল দলের অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যা, যা অনেক আগেই মিটে যাওয়া উচিৎ ছিল। তিনি বলেন, এটিকে হাইকমান্ড-বিরোধী বিদ্রোহ হিসেবে দেখানো ভুল।
গেহলট আরও অভিযোগ করেন, গণমাধ্যম বারবার সচিন পাইলটকে সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী বা ভবিষ্যতের বড় পদপ্রার্থী হিসেবে তুলে ধরে তাঁর রাজনৈতিক ক্ষতিই করেছে। তাঁর মতে, এই ধরনের জল্পনা বাস্তবতার চেয়ে প্রত্যাশা বাড়িয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত নেতার উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। তবে সমস্ত অভিযোগ এবং আক্ষেপের মধ্যেও গেহলট প্রকাশ্যে পাইলটের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ থেকে নিজেকে দূরে রেখেছেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁর মনে সচিন পাইলটের প্রতি কোনও ব্যক্তিগত বিদ্বেষ নেই। বরং তিনি মনে করেন, অতীতের দ্বন্দ্ব ভুলে কংগ্রেস নেতাদের এখন একসঙ্গে কাজ করা উচিত। কারণ বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গেলে দলের ঐক্যই সবচেয়ে বড় শক্তি।
এই মন্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ কারণ আগামী কয়েক বছরে রাজস্থান রাজনীতি আবারও গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছতে চলেছে। কংগ্রেস এখনও রাজ্যে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। সেই প্রেক্ষাপটে গেহলট-পাইলট সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শুধু দুই নেতার ব্যক্তিগত সমীকরণের প্রশ্ন নয়; এটি কংগ্রেসের রাজনৈতিক সম্ভাবনার সঙ্গেও জড়িত।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, গেহলটের এই সাক্ষাৎকার আসলে এক ধরনের রাজনৈতিক আত্মপক্ষসমর্থন। তিনি বোঝাতে চাইছেন যে, অতীতে যা কিছু ঘটেছে তার জন্য একমাত্র তাঁকেই দায়ী করা উচিত নয়। একই সঙ্গে তিনি নিজের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং দলীয় অবদানের কথাও স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছেন।
অন্যদিকে, সচিন পাইলট এখনও পর্যন্ত গেহলটের এই মন্তব্যের কোনও প্রকাশ্য জবাব দেননি।
তবে রাজস্থানের রাজনীতি জানে, গেহলট এবং পাইলটের গল্প এখনও শেষ হয়ে যায়নি। দুই নেতা আজও কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মুখ। একজন অভিজ্ঞ সংগঠক এবং প্রশাসক, অন্যজন তুলনামূলক তরুণ কিন্তু জনপ্রিয় গণনেতা। তাঁদের সম্পর্ক যতবার উত্তপ্ত হয়েছে, ততবারই কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার প্রভাব পড়েছে।
সেই কারণেই অশোক গেহলটের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে শুধুমাত্র অতীতের স্মৃতিচারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে না। বরং অনেকেই মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমীকরণেরও ইঙ্গিত বহন করছে যেখানে ব্যক্তিগত ক্ষোভ, রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং দলীয় ঐক্যের প্রশ্ন আবারও একসঙ্গে মিশে যাচ্ছে।