স্বাস্থ্য

ভুলে যাওয়া কতটা স্বাভাবিক, আর কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: ৭৪ বছর বয়সেও রোজ গারফিঙ্কেল তাঁর স্কুল অডিওলজিস্ট জীবনে পরীক্ষা করা প্রায় ৩০০ শিশুর অনেকের শ্রবণ পরীক্ষার ফল মনে করতে পারেন।
  • কিন্তু এখন একটি ঘরে ঢুকে কেন এসেছেন, সেটাই অনেক সময় মনে করতে পারেন না।
  • “জানি যে একটা কাজ ছিল, কিন্তু কী ছিল তা আর মনে পড়ে না।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: ৭৪ বছর বয়সেও রোজ গারফিঙ্কেল তাঁর স্কুল অডিওলজিস্ট জীবনে পরীক্ষা করা প্রায় ৩০০ শিশুর অনেকের শ্রবণ পরীক্ষার ফল মনে করতে পারেন। কিন্তু এখন একটি ঘরে ঢুকে কেন এসেছেন, সেটাই অনেক সময় মনে করতে পারেন না।

“জানি যে একটা কাজ ছিল, কিন্তু কী ছিল তা আর মনে পড়ে না। তখন নিজেকেই প্রশ্ন করি—আমি এখানে কেন এলাম?”—বলছিলেন তিনি।

প্রায় ৬০ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার পর থেকেই এই ধরনের ভুলে যাওয়া শুরু হয়েছিল। গত চার বছরে তা কিছুটা বেড়েছে। এখন তাই তিনি দৈনন্দিন কাজের তালিকা, ক্যালেন্ডার এবং ওষুধ রাখার বিশেষ বাক্সের উপর অনেক বেশি নির্ভর করেন।

তিনি বলেন, “আমি মনে করি এগুলো বয়স বাড়ার স্বাভাবিক লক্ষণ। তবু মাঝে মাঝে চিন্তা হয়।”

রোজ একা নন। চাবি কোথায় রেখেছেন ভুলে যাওয়া, পরিচিত কারও নাম মনে না পড়া, কথার মাঝখানে হঠাৎ চিন্তার সূত্র হারিয়ে ফেলা, কিংবা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে কেন এসেছেন তা ভুলে যাওয়া—মধ্যবয়সের পর এই অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই হয়। তবে আলঝাইমার্স বা ডিমেনশিয়া নিয়ে সচেতনতা বাড়ায় এসব ঘটনা অনেককেই উদ্বিগ্ন করে তোলে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই ধরনের স্মৃতিভ্রংশের পেছনে থাকে সাধারণ এবং অনেক সময় সম্পূর্ণ নিরাময়যোগ্য কারণ।

বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তির স্বাভাবিক পরিবর্তন

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে চিন্তার গতি কিছুটা কমে যাওয়া এবং তথ্য মনে করতে একটু বেশি সময় লাগা স্বাভাবিক।

উইসকনসিন আলঝাইমার্স ডিজিজ রিসার্চ সেন্টারের চিকিৎসক নাথানিয়েল চিন বলেন, “ষাট বা সত্তরের দশকে পৌঁছনো রোগীদের আমি বলি, দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, মস্তিষ্ক আর আগের মতো দ্রুত কাজ করবে না। যদি এই পরিবর্তন সামান্য হয় এবং দৈনন্দিন জীবন স্বাভাবিক থাকে, তাহলে সাধারণত এটি রোগের লক্ষণ নয়।”

আপনি যদি এখনও নিজের আর্থিক কাজ সামলাতে পারেন, সময়মতো বিভিন্ন অ্যাপয়েন্টমেন্টে যেতে পারেন এবং পরিচিত জায়গায় সহজে যাতায়াত করতে পারেন, তাহলে মাঝেমধ্যে কিছু ভুলে যাওয়া নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার প্রয়োজন নেই।

সত্যিই কি স্মৃতির সমস্যা, নাকি মনোযোগের অভাব?

অনেক সময় যেটাকে আমরা “ভুলে যাওয়া” বলি, আসলে সেটি স্মৃতিশক্তির সমস্যা নয়; বরং মনোযোগের ঘাটতি।

কাজের চাপ, পরিবার, সন্তানের দায়িত্ব, প্রবীণদের দেখাশোনা এবং মোবাইল ফোনের অবিরাম নোটিফিকেশন—সব মিলিয়ে আমাদের মন সবসময় নানা দিকে ছুটে বেড়ায়। ফলে কোনও তথ্য ঠিকমতো মস্তিষ্কে সংরক্ষিতই হয় না।

স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার অধ্যাপক নিনা ভাসান বলেন, “কোনও স্মৃতি মনে রাখার আগে সেটি মস্তিষ্কে সঠিকভাবে সংরক্ষিত হতে হয়। মনোযোগ না থাকলে সেই তথ্য কখনও ঠিকমতো সংরক্ষিতই হয় না। পরে সেটি খুঁজতে গিয়ে মনে হয় স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে গেছে।”

ঘুমের অভাবও স্মৃতিশক্তিকে দুর্বল করে

ভালো ঘুম স্মৃতি গঠনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘুমের সময়ই মস্তিষ্ক স্বল্পমেয়াদি স্মৃতিকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তরিত করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র এক রাত ছয় ঘণ্টার কম ঘুম হলেও নতুন তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়।

বয়স বাড়লে ঘুম ভেঙে যাওয়া বা রাতে বারবার উঠে পড়া স্বাভাবিক। তবে মধ্যবয়সীদের ক্ষেত্রেও কর্মব্যস্ততা, মানসিক চাপ বা পারিবারিক দায়িত্বের কারণে ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

দীর্ঘদিনের অনিদ্রা বা চিকিৎসাহীন স্লিপ অ্যাপনিয়ার মতো রোগও স্মৃতি, মনোযোগ এবং শেখার ক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বিভিন্ন শারীরিক সমস্যাও দায়ী হতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে নারীদের ক্ষেত্রে পেরিমেনোপজ এবং মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ায় চিন্তাশক্তি ধীর হয়ে যেতে পারে এবং কথার মধ্যে উপযুক্ত শব্দ মনে করতে সমস্যা হয়।

এ ছাড়া বিষণ্নতা, এডিএইচডি (ADHD), চিকিৎসাহীন শ্রবণশক্তি হ্রাস, থাইরয়েডের সমস্যা, ভিটামিন বি-১২-এর ঘাটতি এবং কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও স্মৃতিশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত?

নাথানিয়েল চিনের মতে, তিনটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করা জরুরি—

  • ভুলে যাওয়ার ঘটনা কি মাঝেমধ্যে নয়, দিনে বহুবার ঘটছে?
  • স্মরণ রাখার জন্য নানা ব্যবস্থা নেওয়ার পরও কি একই সমস্যা থেকে যাচ্ছে? যেমন, সবসময় একই জায়গায় চাবি রাখার পরও যদি তা বারবার হারিয়ে যায়।
  • এই সমস্যা কি দৈনন্দিন জীবন বা মানসিক স্বস্তিকে উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত করছে?

বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, কী ভুলে যাচ্ছেন সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

কথার মাঝখানে হঠাৎ কী বলতে চেয়েছিলেন তা ভুলে যাওয়া এক বিষয়। কিন্তু পুরো কথোপকথনই হয়েছে, সেটাই যদি মনে না থাকে, তাহলে তা অনেক বেশি উদ্বেগের।

এ ছাড়া স্মৃতির সমস্যার সঙ্গে যদি হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, ঘুমের বড় সমস্যা, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া বা জীবনে প্রথমবারের মতো তীব্র বিষণ্নতা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ডিমেনশিয়া নয়, মাঝামাঝি একটি অবস্থাও থাকতে পারে

চিকিৎসকেরা বিভিন্ন পরীক্ষা করে বুঝতে পারেন এটি স্বাভাবিক বার্ধক্য, ডিমেনশিয়া, নাকি মাইল্ড কগনিটিভ ইমপেয়ারমেন্ট (MCI)।

এমসিআই-তে স্মৃতিশক্তির কিছু সমস্যা থাকে, কিন্তু ব্যক্তি এখনও নিজের দৈনন্দিন কাজ করতে সক্ষম হন। থাইরয়েডের অসুখ, স্লিপ অ্যাপনিয়া-সহ নানা কারণেই এই অবস্থা হতে পারে।

কিছু ক্ষেত্রে এমসিআই থেকে পরে ডিমেনশিয়া হতে পারে, আবার অনেকের ক্ষেত্রেই তা হয় না। তাই এই পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য উপকার পাওয়া সম্ভব।

মস্তিষ্ক সুস্থ রাখতে যা করবেন

গবেষণায় দেখা গেছে, কয়েকটি সহজ অভ্যাস মস্তিষ্ককে দীর্ঘদিন সুস্থ রাখতে সাহায্য করে—

  • নিয়মিত শরীরচর্চা
  • মস্তিষ্কবান্ধব স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস (যেমন MIND ডায়েট)
  • রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা
  • ধাঁধা, শব্দখেলা, তাস বা নতুন কিছু শেখার মতো মানসিক অনুশীলন
  • সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা
  • পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম
  • বিষণ্নতা বা মানসিক সমস্যার চিকিৎসা
  • প্রয়োজনে শ্রবণযন্ত্র ব্যবহার করা

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব প্রবীণের শ্রবণশক্তি কমে গিয়েছিল, তাঁদের মধ্যে শ্রবণযন্ত্র ব্যবহারে জ্ঞানীয় ক্ষমতার অবনতির ঝুঁকি প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানসিক চাপ কমানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নতুন ভাষা বা বাদ্যযন্ত্র শেখা বাধ্যতামূলক নয়; শব্দছক, ধাঁধা বা বন্ধুদের সঙ্গে তাস খেলাও মস্তিষ্ককে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে।

বর্তমানে আলঝাইমার্সের কিছু নতুন ওষুধ এসেছে, তবে সেগুলির কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি রোগের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে। তাই স্মৃতিশক্তি নিয়ে সন্দেহ হলে দেরি না করে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।

রোজ গারফিঙ্কেল ইতিমধ্যেই নিয়মিত ব্যায়াম করেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান, প্রতিদিন বুননের নতুন কৌশল শেখেন এবং রাতে শব্দের খেলা খেলেন। প্রতি বছর তাঁর চিকিৎসক পাঁচটি শব্দ মনে রাখার একটি পরীক্ষা নেন। এ বছর প্রথমবার তিনি একটি শব্দ ভুলে গিয়েছেন।

তাঁর চিকিৎসক উদ্বিগ্ন নন। রোজও আপাতত উদ্বিগ্ন নন। তিনি জানেন, মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখার জন্য যা করার, তা তিনি করছেন। আর মাঝেমধ্যে কোনও ঘরে ঢুকে কেন এসেছেন তা ভুলে যাওয়া—হয়তো সেটাই বার্ধক্যের একেবারে স্বাভাবিক অংশ।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles