হাইলাইটস:
- নির্যাতিত ও নিহত কিশোরীর পরিবারের অভিযোগ, আগেই পুলিশের সক্রিয়তা থাকলে এই মর্মান্তিক ঘটনা এড়ানো যেত।
- পরিবারের দাবি, অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ ছিল, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
- অন্যদিকে, গণপিটুনিতে নিহত যুবকের পরিবার দাবি করেছে, তাঁদের ছেলে নির্দোষ ছিল এবং জনরোষের বলি হয়েছে।
- একই ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের শোক ও ক্ষোভে উত্তপ্ত বারুইপুর; পুলিশ তদন্তের পাশাপাশি আইন নিজের হাতে না নেওয়ার আবেদন জানিয়েছে।
বাংলাস্ফিয়ার: বারুইপুরে নাবালিকা কিশোরীর ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় উত্তেজনা এখনও প্রশমিত হয়নি। একদিকে নির্যাতিত কিশোরীর পরিবারের অসীম শোক, অন্যদিকে গণপিটুনিতে নিহত এক যুবকের পরিবারের কান্না—এই দুই বিপরীত ট্র্যাজেডি এখন একই ঘটনার দুই বেদনাদায়ক মুখ হয়ে উঠেছে। এলাকাজুড়ে এখনও থমথমে পরিবেশ, অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখছে প্রশাসন।
নিহত কিশোরীর পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, পুলিশ যদি প্রথম থেকেই দ্রুত ও কঠোর পদক্ষেপ নিত, তাহলে তাঁদের মেয়েকে হয়তো বাঁচানো যেত। পরিবারের এক সদস্য বলেন, “পুলিশ সময়মতো ব্যবস্থা নিলে আমার ছোট্ট মেয়েটা আজ বেঁচে থাকত। আমরা বারবার সাহায্য চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।” শোকের মধ্যেও তাঁদের প্রশ্ন, অভিযোগের পরেও কেন যথাসময়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হল না।
পরিবারের দাবি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এলাকায় আগেও নানা অভিযোগ ছিল। সেই অভিযোগগুলির যথাযথ তদন্ত ও নজরদারি হলে এমন নৃশংস অপরাধ ঘটার সুযোগ তৈরি হতো না। তাঁদের বক্তব্য, এখন গ্রেপ্তার ও তদন্তের আশ্বাস মিললেও, তাতে তাঁদের মেয়েকে আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়।
ঘটনার পর এলাকায় প্রবল ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সেই উত্তেজনার মধ্যেই গণপিটুনির ঘটনায় এক যুবকের মৃত্যু হয়। তাঁর পরিবারের দাবি, মৃত যুবকের অপরাধের কোনও প্রমাণ ছিল না এবং তিনি জনতার ক্ষোভের শিকার হয়েছেন। পরিবারের এক সদস্য বলেন, “আমাদের ছেলে নির্দোষ ছিল। কাউকে কিছু বোঝার সুযোগই দেওয়া হয়নি। ওকে মেরেই ফেলা হল।”
মৃত যুবকের বাবা-মা জানান, তাঁদের ছেলে প্রতিদিনের মতোই বাইরে গিয়েছিলেন। এরপরই খবর আসে, উত্তেজিত জনতার হাতে তিনি আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, গুজব এবং উত্তেজনার আবহেই তাঁদের ছেলেকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।
এই দুই পরিবারের বয়ান বারুইপুরের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে নৃশংস অপরাধের শিকার একটি পরিবার বিচার চাইছে, অন্যদিকে গণপিটুনিতে মৃত যুবকের পরিবারও নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের দাবি তুলেছে। ফলে ঘটনার তদন্ত এখন কেবল মূল অপরাধেই সীমাবদ্ধ নয়, গণপিটুনির ঘটনাও সমান গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে তিন অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে প্রাসঙ্গিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে এবং তদন্ত দ্রুত এগোচ্ছে। পাশাপাশি, গণপিটুনির ঘটনায় কারা জড়িত ছিলেন, তা-ও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। প্রয়োজনে ভিডিও ফুটেজ, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার আবেদন করা হয়েছে, কোনও পরিস্থিতিতেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া উচিত নয়। অপরাধ যতই গুরুতর হোক না কেন, বিচার করার দায়িত্ব আদালতের। গণপিটুনি বা প্রতিশোধমূলক হিংসা আরও একটি পরিবারকে শোকের মুখে ঠেলে দেয় এবং তদন্তকেও জটিল করে তোলে।
এদিকে মুখ্যমন্ত্রীর বারুইপুর সফরকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। তিনি নির্যাতিত কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করবেন এবং প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করবেন বলে জানা গিয়েছে। এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রয়েছে এবং যে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের মতে, এই ঘটনায় শুধু অপরাধীদের কঠোর শাস্তি দিলেই হবে না; একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে কোথায় ঘাটতি ছিল, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি। আবার অন্যদের মতে, জনরোষকে প্রশ্রয় দিলে ভবিষ্যতে আরও নিরপরাধ মানুষও তার শিকার হতে পারেন।
বারুইপুরের এই মর্মান্তিক ঘটনা তাই এখন শুধু একটি অপরাধের তদন্ত নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা, পুলিশের ভূমিকা, জনরোষ এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নও সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে কিশোরীকে হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো যুবকের পরিবারের আর্তনাদ—দুই ট্র্যাজেডিই মনে করিয়ে দিচ্ছে, অপরাধের বিচার যেমন জরুরি, তেমনই আইনের শাসন অটুট রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।