হাইলাইটস:

  • আমেরিকা-ইরান শান্তিচুক্তির ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বকাপে মাঠে নামে ইরান।
  • যুদ্ধ, ভিসা-সংকট ও রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যেও নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-২ ড্র করে তারা।
  • লস অ্যাঞ্জেলেসের ইরানি প্রবাসী সমাজের একাংশ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখায়।
  • ফিফার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও স্টেডিয়ামে দেখা যায় প্রাক-বিপ্লবী ইরানি পতাকা।
  • অধিনায়ক মেহদি তারেমি বলেন, বহু মাস পর সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দলকে নতুন শক্তি দিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্প তখন ফ্রান্সে, জি-৭ সম্মেলনের আগে ঘোষণা করেছেন—আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। আর সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর লস অ্যাঞ্জেলেসে বিশ্বকাপের মঞ্চে নামছে ইরান। প্রশ্নটা স্বাভাবিক—সেই মুহূর্তে ইরানি ফুটবলারদের মনে কী চলছিল?

প্রায় চার মাস ধরে যুদ্ধের অভিঘাতে বিপর্যস্ত একটি দেশের প্রতিনিধিরা মাঠে নামছেন। তাঁদের পরিবার, বন্ধু, স্বজনেরা এখনও যুদ্ধের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ফুটবল কি শুধুই ফুটবল থাকতে পারে?

নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-২ ড্র করা ম্যাচটি তাই নিছক গ্রুপ পর্বের খেলা ছিল না। এটি ছিল যুদ্ধ, রাজনীতি, নির্বাসন, পরিচয় এবং জাতীয় গৌরবের জটিল মিশ্রণ।

লস অ্যাঞ্জেলেসের অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামে, হলিউড পাহাড়ের ছায়ায়, ইরান যেন অন্তত ১০১ মিনিটের জন্য যুদ্ধ ভুলে থাকতে পেরেছিল। গোল করেন মোহাম্মদ মোহেবি ও রামিন রেজাইয়ান। নিউজিল্যান্ডের হয়ে জোড়া গোল করেন এলি জাস্ট। ফলাফল ড্র হলেও ইরানের কাছে এই ম্যাচের গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি।

কোচ আমির ঘালেনোয়ি ম্যাচের আগে বলেছিলেন, তাঁর দল শুধুই ফুটবলে মনোযোগ দিতে চায়। মাঠে সেই চেষ্টারই প্রতিফলন দেখা গেল।

কিন্তু এই ম্যাচের পেছনের গল্প আরও নাটকীয়।

যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ইরানের বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ অনিশ্চয়তায় ঘেরা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাননি ইরানি দলের ১১ জন কর্মকর্তা। ফলে নির্ধারিত ঘাঁটি অ্যারিজোনা ছেড়ে দলকে চলে যেতে হয় মেক্সিকোর তিহুয়ানায়। প্রশিক্ষণ সূচিও বিঘ্নিত হয়।

ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো কার্যত স্বীকার করেছিলেন যে পরিস্থিতির ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থাও ভূ-রাজনীতির সামনে অসহায়।

লস অ্যাঞ্জেলেসে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়গুলির একটি। শহরের একটি অংশকে অনেকে “তেহরাঞ্জেলেস” বলেও ডাকেন। কিন্তু সেই সম্প্রদায় একেবারেই ঐক্যবদ্ধ নয়।

স্টেডিয়ামের বাইরে অনেক বিক্ষোভকারী ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। তাঁদের হাতে ছিল ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের আগের সূর্য-সিংহ চিহ্নযুক্ত পতাকা এবং শেষ শাহের প্রতিকৃতি। কেউ কেউ ইরানি সরকারকে “সন্ত্রাসী” বলেও আখ্যা দেন। এক কর্মীর অভিযোগ, সরকার ক্রীড়াবিদদের নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

ম্যাচের দিন ওই প্রাক-বিপ্লবী পতাকা নিয়ে আইনি বিতর্কও তৈরি হয়। ফিফার আচরণবিধি রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও বাস্তবে বহু দর্শক সেই পতাকা স্টেডিয়ামে নিয়ে ঢুকতে সক্ষম হন। কারও কারও কাছ থেকে শুধু পতাকার দণ্ড সরিয়ে নিতে বলা হয়।

এর আগে ইরানের ক্রীড়ামন্ত্রী আহমদ দোনিয়ামালি সতর্ক করে বলেছিলেন, স্টেডিয়ামে রাজনৈতিক স্লোগান উঠলে খেলোয়াড়রা মাঠ ছেড়ে বেরিয়ে আসতেও পারেন।

কিন্তু বাস্তবে ভিন্ন দৃশ্য দেখা যায়।

স্টেডিয়ামের ভিতরে সমর্থন ছিল প্রবলভাবে ইরানের পক্ষেই। চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপে জাতীয় সঙ্গীত না গাওয়া নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, এবার তা দেখা যায়নি। খেলোয়াড়রা জাতীয় সঙ্গীত গেয়েছেন, যদিও সেটিও ইরানি সমাজে বিতর্কিত বিষয়।

ম্যাচের শুরুতেই ধাক্কা খায় ইরান। সপ্তম মিনিটে এলি জাস্ট অসাধারণ দক্ষতায় গোল করে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন। ক্রিস উডের সঙ্গে দারুণ বোঝাপড়া থেকে তৈরি হয় সেই আক্রমণ।

তবে ইরান দ্রুত ছন্দ ফিরে পায়। মেহদি তারেমি একবার পোস্টে শট মারেন। পরে রামিন রেজাইয়ান গোল করে সমতা ফেরান। ৩৬ বছর বয়সী এই ডিফেন্ডার নিজের অভিজ্ঞতার ছাপ রাখেন পুরো ম্যাচ জুড়ে।

খেলা ছিল খোলামেলা, আক্রমণ-প্রতি-আক্রমণে ভরা। যুদ্ধ ও রাজনীতির ভার যেন মাঠের ভেতরে ঢুকতে পারেনি।

আর সেটাই হয়তো এই ম্যাচের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য।

মাসের পর মাস ধরে ইরানের ফুটবলাররা ছিলেন অনিশ্চয়তা, শোক এবং আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। কিন্তু লস অ্যাঞ্জেলেসের সেই রাতে, হাজার হাজার সমর্থকের সামনে, তাঁরা অন্তত কিছু সময়ের জন্য আবার শুধুই ফুটবলার হতে পেরেছিলেন।

ড্রয়ের পর ইরানি সমর্থকদের উল্লাসে স্টেডিয়াম মুখর হয়ে ওঠে। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষের কাছে সেই উল্লাস হয়তো কোনও ট্রফির সমান মূল্যবান ছিল।

কারণ কখনও কখনও ফুটবল শুধু খেলা নয়। কখনও কখনও তা হয়ে ওঠে স্বস্তির নিঃশ্বাস, বেঁচে থাকার ঘোষণা এবং অন্ধকারের মধ্যে আলো খোঁজার এক ক্ষণস্থায়ী কিন্তু গভীর প্রচেষ্টা।