হাইলাইটস
- ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও শেষ ১১ মিনিটে তিন গোল করে ৩-২ ব্যবধানে জয় আর্জেন্টিনার।
- একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপে দেশের স্বপ্ন বাঁচালেন লিওনেল মেসি।
- একই ম্যাচে পেনাল্টি মিস করেও ইতিহাস গড়লেন মেসি; বিশ্বকাপে গোলসংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২১।
- শেষ মুহূর্তে এনজো ফার্নান্দেজ-এর হেডে জয়সূচক গোল, ক্ষোভে ফেটে পড়ল মিশর।
- বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবার কোনও দল শেষ ১১ মিনিটে দুই গোলের ঘাটতি পুষিয়ে জয় ছিনিয়ে নিল।
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্বকাপের মঞ্চে অনেক অলৌকিক প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখা হয়েছে। কিন্তু আটলান্টার রাতটি হয়তো সেই তালিকায় বিশেষ জায়গা করে নেবে। কারণ, এই ম্যাচ শুধু একটি ফুটবল ম্যাচ ছিল না; এটি ছিল এক মহাতারকার শেষ লড়াই, এক দলের অদম্য বিশ্বাস এবং আর এক দলের ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের কাহিনি। শেষ পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ৩-২ ব্যবধানে মিশরকে হারিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের অভিযান বাঁচিয়ে রাখল আর্জেন্টিনা। আর সেই প্রত্যাবর্তনের কেন্দ্রে আবারও সেই এক নাম—লিওনেল মেসি।
ম্যাচের ৭৯ মিনিট পর্যন্ত সবকিছুই যেন মিশরের পরিকল্পনামাফিক চলছিল। বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা হতাশ, ছন্নছাড়া এবং অসহায়। গ্যালারিতে বসে থাকা হাজার হাজার সমর্থকের মুখে তখন উদ্বেগের ছাপ। মনে হচ্ছিল, টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন বুঝি এখানেই শেষ হয়ে যাবে। অথচ শেষ বাঁশি বাজার পর দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। চোখে জল নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে মেসি, আর তাঁকে কাঁধে তুলে উল্লাস করছেন সতীর্থরা। যেন ফুটবল আবারও ঘোষণা করল—মেসিকে কখনও শেষ বলে ধরে নেওয়া যায় না।
শুরু থেকেই আর্জেন্টিনাকে চাপে রাখে মিশর। আগের রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়াকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আত্মবিশ্বাসে টইটম্বুর দলটি কোনও ভয় ছাড়াই খেলতে নামে। ম্যাচের ১৫ মিনিটে কর্নার থেকে মারওয়ান আত্তিয়া-র নিখুঁত ক্রসে শক্তিশালী হেডে গোল করেন ইয়াসির ইব্রাহিম। গোল করার পর তাঁর উচ্ছ্বাসই বলে দিচ্ছিল, কী বিশাল মুহূর্তের জন্ম দিয়েছেন তিনি। বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের বিরুদ্ধে এগিয়ে যাওয়ার আনন্দে ফেটে পড়ে মিশরের বেঞ্চ।
গোল হজম করার পর আক্রমণের ঝাঁজ বাড়ায় আর্জেন্টিনা। কিছুক্ষণ পরই বক্সের মধ্যে ফাউলের শিকার হন নিকোলাস তাগ্লিয়াফিকো। রেফারি সঙ্গে সঙ্গে পেনাল্টির নির্দেশ দেন। সবাই ধরে নিয়েছিলেন, এবার সমতা ফিরবে। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সেই সুযোগ নষ্ট করেন মেসি। তাঁর নেওয়া শট দুর্দান্ত দক্ষতায় রুখে দেন গোলরক্ষক মোস্তফা শোবেইর। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে একই আসরে দ্বিতীয়বার পেনাল্টি মিস করে অস্বস্তিকর এক রেকর্ডের মালিক হন মেসি।

সেখানেই শেষ নয়। প্রথমার্ধের বাকি সময়টা যেন একাই লড়াই করেন শোবেইর। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার-এর নিশ্চিত গোল বাঁচান তিনি। এরপর মেসির বাঁকানো ফ্রি-কিক পোস্ট ঘেঁষে বাইরে যায়। আবার হুলিয়ান আলভারেস-এর খুব কাছ থেকে নেওয়া শটও অবিশ্বাস্যভাবে ঠেকিয়ে দেন মিশরের গোলরক্ষক। একের পর এক সুযোগ নষ্ট হওয়ায় ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনা। ২০১০ সালের জার্মানির বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনও ম্যাচে বিরতিতে পিছিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেও ছবিটা বদলায়নি। বরং আরও বড় ধাক্কা খাওয়ার মুখে পড়েছিল আর্জেন্টিনা। দুরন্ত পাল্টা আক্রমণ থেকে মোস্তাফা জিকো বল জালে জড়িয়ে দেন। কিন্তু ভিএআর পরীক্ষায় দেখা যায়, আক্রমণ শুরুর অনেক আগে মারওয়ান আত্তিয়া লিসান্দ্রো মার্টিনেজ-এর জার্সি টেনেছিলেন। প্রায় ৩০ সেকেন্ড আগের সেই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোল বাতিল হয়। সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি মিশর। তাদের খেলোয়াড়েরা দীর্ঘক্ষণ রেফারির সঙ্গে তর্ক করেন।
তবে হতাশা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। কিছুক্ষণ পরই বাঁ দিক দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে আসেন হাইসেম হাসান। নাহুয়েল মোলিনা-কে অনায়াসে কাটিয়ে তাঁর বাড়ানো বল জালে জড়িয়ে দেন জিকো। ব্যবধান হয়ে যায় ২-০। তখন মনে হচ্ছিল, বিশ্বকাপের অন্যতম বড় অঘটনের সাক্ষী হতে চলেছে ফুটবল বিশ্ব।
কিন্তু মহান খেলোয়াড়দের পরিচয়ই হল, সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তে তাঁরা নিজেদের সেরাটা তুলে ধরেন। ঠিক সেটাই করলেন মেসি। ম্যাচের ৭৯ মিনিটে তাঁর নিখুঁত ক্রস থেকে দুর্দান্ত হেডে গোল করে ব্যবধান কমান ক্রিস্টিয়ান রোমেরো। সেই গোলের সঙ্গে সঙ্গেই যেন আর্জেন্টিনা নতুন জীবন ফিরে পায়। গ্যালারির পরিবেশও মুহূর্তে বদলে যায়।
মাত্র চার মিনিট পর আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত। মিশরের ডিফেন্ডাররা বল পুরোপুরি ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হন। বল এসে পড়ে মেসির সামনে। এত বড় মঞ্চে, এত বড় মুহূর্তে, এত অভিজ্ঞ একজন ফুটবলারের সামনে এমন সুযোগ মানেই প্রায় নিশ্চিত গোল। গোলরক্ষক শোবেইর দুই হাত লাগিয়েও বল আটকাতে পারেননি। বল জালে জড়াতেই বিস্ফোরিত হয় স্টেডিয়াম। বিশ্বকাপে নিজের ২১তম গোল করেন মেসি। চলতি আসরে এটি তাঁর অষ্টম গোল, ফলে গোলদাতার তালিকায় তিনি এগিয়ে যান কিলিয়ান এমবাপ্পে ও এরলিং হালান্ড-এর সামনে।
তবে নাটক তখনও শেষ হয়নি। ম্যাচ যখন অতিরিক্ত সময়ের দিকে এগোচ্ছে, তখন মাঝমাঠে বল হারান মিশরের অধিনায়ক মোহাম্মদ সালাহ। মুহূর্তের মধ্যে পাল্টা আক্রমণে ওঠে আর্জেন্টিনা। ডান দিক থেকে লতারো মার্তিনেস নিখুঁত ক্রস বাড়িয়ে দেন। সেই বল দারুণ হেডে জালে জড়িয়ে দেন এনজো ফার্নান্দেজ। ৩-২। কয়েক মিনিট আগেও যে দল বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে ছিল, তারাই তখন জয়ের আনন্দে আত্মহারা।
এই গোল নিয়ে তীব্র বিতর্কও তৈরি হয়। মিশরের খেলোয়াড়দের দাবি ছিল, আক্রমণ শুরুর আগে তাদের এক ফুটবলারের ওপর ফাউল হয়েছিল। তাঁরা রেফারির চারপাশে ভিড় করে প্রতিবাদ জানান। কিন্তু ভিএআর গোল বহাল রাখে। সেই সিদ্ধান্তে ক্ষোভে ফেটে পড়েন মিশরের ফুটবলার ও কোচিং স্টাফ।
শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি মেসি। চোখে জল নিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। সতীর্থরা তাঁকে কাঁধে তুলে নেন। কোচ লিওনেল স্কালোনি এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন যে, ম্যাচ-পরবর্তী সাক্ষাৎকার শেষ করতেই পারেননি। বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে টানা ষষ্ঠ ম্যাচে গোল করার বিরল কীর্তিও গড়লেন মেসি, যা তাঁর কিংবদন্তি অধ্যায়ে আরও একটি নতুন পৃষ্ঠা যোগ করল।
পরাজিত হলেও মাথা উঁচু করেই মাঠ ছাড়তে পারে মিশর। তিনটি বিশ্বকাপ খেলেও এর আগে কখনও ফাইনাল পর্বে ম্যাচ জেতেনি তারা। কিন্তু এই লড়াই প্রমাণ করে দিল, তারা আর শুধুই অংশগ্রহণকারী নয়। সাহস, শৃঙ্খলা এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিয়েছে। ইতিহাস গড়া থেকে তারা মাত্র কয়েক মিনিট দূরে ছিল।
আর আর্জেন্টিনা? তারা আবারও বেঁচে গেল একজন মানুষের অসাধারণ প্রতিভা, অদম্য মানসিকতা এবং শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার বিশ্বাসে। ফুটবলের ভাষায় যার নাম—লিওনেল মেসি। তাঁর বিশ্বকাপ-যাত্রা অন্তত আরও একটি ম্যাচের জন্য দীর্ঘ হল। আর সেই সঙ্গে অমর হয়ে রইল আটলান্টার এই অবিশ্বাস্য রাত।