হাইলাইটস:

  • বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় ধৃত তিন অভিযুক্তের মধ্যে একজনের পরিবার এলাকা ছেড়ে গা ঢাকা দিয়েছে বলে অভিযোগ
  • তৃতীয় ধৃত ব্যক্তির মা দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়, তাকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে
  • আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দার ও প্রভাস মণ্ডল— এই তিনজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ
  • ঘটনার জেরে জনরোষে এক নিরীহ যুবকের মৃত্যু হয়েছে, যাকে পুলিশ পরে নির্দোষ বলে জানিয়েছে
  • মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী তদন্তে ডিজিপির কাছ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট তলব করেছেন

 

বাংলাস্ফিয়ার: দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বারুইপুরে বারো বছরের এক নাবালিকাকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা যতই দিন গড়াচ্ছে, ততই তার স্তর জটিল হয়ে উঠছে। পুলিশি তদন্তে প্রধান তিন অভিযুক্ত— আনন্দ সর্দার, দিবাকর সর্দার এবং প্রভাস মণ্ডল— ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হয়েছেন। কিন্তু গ্রেফতারির পরেও ঘটনার আবহ শান্ত হয়নি। বরং অভিযুক্তদের পরিবারগুলিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন এক আখ্যান, যেখানে একদিকে একটি পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র সরে পড়েছে বলে অভিযোগ, অন্যদিকে তৃতীয় ধৃতের মা প্রকাশ্যে দাবি করছেন, তাঁর ছেলে সম্পূর্ণ নির্দোষ।

স্থানীয় সূত্রের বক্তব্য, ঘটনার পর থেকেই ধপধপি এবং সংলগ্ন এলাকায় উত্তেজনা তুঙ্গে ওঠে। রবিবার নাবালিকার দেহ পুকুর থেকে উদ্ধারের পরপরই বিক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় নেমে আসে, রেল অবরোধ করে, পুলিশের গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়েই মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দার প্রাথমিকভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন, যদিও পরে সোমবার তাঁকে বারুইপুর বাজার এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই স্থানীয় বিজেপি নেতা শান্তনু মণ্ডলকে অভিযুক্তদের পালাতে সাহায্য করার অভিযোগে আটক করা হয়, যদিও তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন যে তিনি কাউকে পালাতে সাহায্য করেননি।

এই গোটা ঘটনাক্রমে সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো অভিযুক্তদের পরিবারের প্রতিক্রিয়া। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, অভিযুক্তদের মধ্যে একজনের পরিবার ঘটনার পর থেকেই বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে, প্রতিবেশীদের প্রশ্নের মুখে পড়ার ভয়ে তারা এলাকাছাড়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এলাকাবাসীর ক্ষোভ এতটাই তীব্র যে বাড়িঘর ভাঙচুরের আশঙ্কাতেই পরিবারটি নিরাপদ দূরত্বে সরে গেছে বলে অনেকে মনে করছেন। পুলিশ অবশ্য এই বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি দেয়নি, তবে তদন্তকারীদের একাংশ জানিয়েছেন যে পরিবারের সদস্যদের গতিবিধির উপর নজর রাখা হচ্ছে, কারণ কোনো তথ্য গোপন করা হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

এই আবহেই সম্পূর্ণ বিপরীত এক ছবি দেখা যাচ্ছে তৃতীয় ধৃতের পরিবারে। তাঁর মা এলাকা ছেড়ে যাননি, বরং প্রকাশ্যে এসে বারবার বলছেন যে তাঁর ছেলে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। তাঁর বক্তব্য, ছেলেকে ভুল বোঝাবুঝির শিকার করে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, এবং প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মায়ের এই আকুতি অস্বাভাবিক নয়— সন্তান যত বড় অপরাধেই অভিযুক্ত হোক না কেন, মায়ের চোখে তার নির্দোষ হওয়ার সম্ভাবনা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তদন্তের অগ্রগতি এবং সিসিটিভি ফুটেজ-সহ যে প্রমাণ পুলিশের হাতে এসেছে, তার প্রেক্ষিতে এই দাবি কতটা ধোপে টেকে।

তদন্তকারীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে নাবালিকাকে একজন অভিযুক্তের সঙ্গে হাঁটতে দেখা গেছে সিসিটিভি ফুটেজে। এছাড়া প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, দুই অভিযুক্ত অন্য একজনকে দশ হাজার টাকা দিয়ে মেয়েটিকে একটি ঝুপড়িতে নিয়ে আসতে বলেছিল, যেখানে তারা মদ্যপ অবস্থায় উপস্থিত ছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে গঠিত ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) প্রতিটি অভিযুক্তের ভূমিকা পৃথকভাবে খতিয়ে দেখছে। ফলে তৃতীয় ধৃতের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল, তা এখনও সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট নয়, এবং তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে।

এই মামলার আরেকটি করুণ দিক হলো জনরোষের বলি হওয়া এক নিরীহ যুবকের মৃত্যু। ঘটনার পরপরই স্থানীয় বাসিন্দাদের সন্দেহের বশে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল নামে ছাব্বিশ বছরের এক যুবককে বেধড়ক মারধর করে জনতা, যাতে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে পুলিশি তদন্তে জানা যায়, ওই যুবক প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত ছিলেন না। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নিজেই সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে নিহত যুবক নির্দোষ ছিলেন, এবং যারা তাঁকে পিটিয়ে মেরেছে তাদের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করা হবে। এই ঘটনা প্রমাণ করে দিচ্ছে যে জনরোষের মধ্যে সত্য-মিথ্যার ফারাক করা কতটা কঠিন, এবং ভুল সন্দেহের বলি হয়ে একজন নিরপরাধ মানুষের প্রাণ চলে যাওয়ার পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

রাজনৈতিক অঙ্গনেও এই ঘটনা ঝড় তুলেছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ডিজিপির কাছে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে সম্পূর্ণ রিপোর্ট চেয়েছেন, বিশেষত পুলিশের প্রাথমিক পদক্ষেপে কোনো গাফিলতি ছিল কিনা তা নিয়ে। অন্যদিকে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্ব এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে। দলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় সামাজিক মাধ্যমে অভিযোগ করেছেন যে বিজেপি এমন এক পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে জঘন্য অপরাধের অভিযুক্তরাও রাজনৈতিক আশ্রয় পাচ্ছে বলে মনে করে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের বাইরে পুলিশি ব্যারিকেড নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তৃণমূলের দাবি এই ব্যারিকেড তাঁকে বারুইপুর যাওয়া থেকে আটকাতেই বসানো হয়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে অভিযুক্তদের পরিবারের দুই ভিন্ন প্রতিক্রিয়া— একজনের পলায়ন এবং অন্যজনের প্রকাশ্য নির্দোষ দাবি— গোটা মামলাকে আরও জটিল করে তুলেছে। যে পরিবার এলাকা ছেড়েছে, তাদের নীরবতা যেমন সন্দেহ বাড়াচ্ছে, তেমনই তৃতীয় ধৃতের মায়ের প্রকাশ্য প্রতিবাদ প্রশ্ন তুলছে তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়েও। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অবশ্য মনে করছেন, প্রতিটি অভিযুক্তের পরিবারের প্রতিক্রিয়াই স্বাভাবিক মানসিক প্রতিক্রিয়া, তবে চূড়ান্ত সত্য উদঘাটনের দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত পুলিশ ও আদালতের উপরেই বর্তায়।

আপাতত বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর ও সোনারপুর থানা এলাকায় জারি রয়েছে ১৬৩ ধারা, যার ফলে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ। সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী এলাকায় টহল দিচ্ছে, যদিও পরিস্থিতি আগের তুলনায় কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তিন অভিযুক্তকেই আদালতে তোলা হয়েছে এবং পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কে নির্দোষ, কে দোষী— তা নিশ্চিতভাবে বলার সময় এখনও আসেনি। কিন্তু এই মামলা ইতিমধ্যেই প্রমাণ করে দিয়েছে যে একটি জঘন্য অপরাধের ছায়া কীভাবে গোটা একটি এলাকার সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিতে পারে, এবং কীভাবে সেই ছায়ার মধ্যে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যায়।